জীবন যেন কুংফু পান্ডা

লেখাটার নামটা একটু অদ্ভুত, কাছের মানুষেরা জানে আমি কুংফু পান্ডার একজন একনিষ্ঠ প্রেমিক। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে, আমি আর কুংফু পান্ডা এক মায়ের পেটের ভাই, সেই ভুঁড়ি, সেই রসিকতা। এক্কেবারে সিরাম। আমি বলি কি, আমি নিজেই একজন পো, একজন কুংফু পান্ডা, একজন ড্রাগন ওয়ারিয়র।

হয় কি, পো হলো একটা পান্ডা, সে কুংফু’র বড় ভক্ত। টাইলং নামের এক বাঘ, যে কি না প্রচন্ড শক্তিধর, ড্রাগন ওয়ারিওর হবার জন্য সে কালো শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু, কুংফুর স্রষ্টা উগওয়ে তাকে ড্রাগন ওয়ারিওর হতে দেয় না। টাইলংকে পরে এক বিশেষ কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়, যেখান থেকে সে পালিয়ে আসবে এবং সেটা উগওয়ে আগেই টের পায়। টাইলঙ্গকে আটকানোর জন্য প্রয়োজন একজন ড্রাগন ওয়ারিওর, সহস্রের সেরা যোদ্ধা। মাস্টার শিফু বছরের পর বছর ধরে ফিউরিয়াস ফাইভ খ্যাত টাইগ্রেস, মাংকি, ভাইপার, ক্রেন আর ম্যান্টেসকে কুংফু শেখাতে থাকে। ধারণা করা হয়, এদের মাঝে থেকেই একজন হবে ড্রাগন ওয়ারিওর। প্রচন্ড হাসি তামাশার ভেতর দিয়ে সম্পুর্ন অযাচিত ভাবেই পো’কে নির্বাচন করা হয় ড্রাগন ওয়ারিওর হিসেবে। কোন রকম কুংফু ট্রেনিং ছাড়াই এতো বড় দায়ীত্ব, পো বিশ্বাস করতে পারে না। শিফু থেকে শুরু করে ফিউরিয়াস ফাইভের কেউই ব্যাপারটাকে গ্রহন করতে পারেনি, তারা এর বিরোধীতা করে। চলে মানসিক ভাবে অপদস্ত করা, অপমান করা। পো কিছুটা দমে যায়, কিন্তু উগওয়ে তাকে আবারও অনুপ্রানিত করে। শিফু বিশ্বাস করতে শুরু করে, পো’ই পারবে টাইলঙ্গকে ঠেকাতে, মনে প্রচন্ড বিশ্বাস রেখে শুরু করে পো’র ট্রেনিং। একদিন ট্রেনিং শেষ হয়, পো’র হাতে তুলে দেয়া হয় ড্রাগন ওয়ারিওরের হাতে যে স্ক্রল শোভা পায়, ড্রাগন স্ক্রল। কিন্তু সেটি খুলে দেখা যায়, সেখানে কিছুই নেই !

এরপরে কাহিনী খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। টাইলং গ্রামের দিকে আসতে থাকে, শিফু মনঃস্থির করে যে সেই টাইলং এর সাথে ফাইট করবে। এক সময়ের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যের সাথেই সে যুদ্ধে অবতীর্ন হবে। পো এবং ফিউরিয়াস ফাইভের সবাই গ্রামবাসীকে নিরাপদ দুরত্বে নিয়ে যেতে থাকে। এমন সময় পো’র বাবা, যিনি কি না গোপন স্বাদের স্যুপ বিক্রী করার কারণে বেশ নামকরা, তার কিছু কথায় পো খুব বেশী অনুপ্রানিত হয়। সে কথা গুলো, পৃথিবীর সবার জন্য, সব সময়ের জন্য।

“ There is no secret ingredients, To make something special, you just have to believe that is special”

পো বিশ্বাস করতে শুরু করে, সেই ড্রাগন ওয়ারিওর। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করে সে ফিরে যায় টাইলং এর সাথে ফাইট করতে। এরপরে প্রচন্ড মজার ও ধ্বংসাত্মক কুংফু ফাইটের শেষে জয়ী হয় পো, দা ড্রাগন ওয়ারিওর।

আমার দেখা জীবনের সেরা একটি মুভি এটি, এ পর্যন্ত হলে ঠিক ছিলো, কিন্তু এই সিনেমাটি আমার জন্য আরেকটু বেশী কিছু। কোন রকম মেডিকেল কোচিং না করে, বায়োলজি না পড়ে, আমি যখন প্রথম ঢাকা মেডিকেল কলেজে ক্লাস করতে আসি, আমি তখনও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে আমি ডাক্তার হবো।

আমার চোখ ফেটে পানি আসছিলো। আমার অবস্থা ঠিক পো’র মতো তখন, বুঝে উঠতে পারছিলাম না জীবনের সাথে কি ঘটছে এসব ।

আমি ক্লাস শুরু করলাম, আমার চারিদিকে যাকেই দেখি, সবাই জিনিয়াস ! নিজেকে অচ্ছুত লাগে এদের মাঝে, দিন দিন আমি মাটির সাথে মিইয়ে যেতে লাগলাম। তখনও আমি তপন স্যারের লাল-নীল ফিজিক্স বই, বলবিদ্যার বই খুলি ঘরে এসে। আইটেম দিতে গেলে ফেরত আসি, বন্ধুদের দেখি বেশ ভালো নাম্বার পেয়ে পাশ করছে।

পো’র মতো আমিও দমে যাই। কোন কুল খুজে পাই না, কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারি না। আমি নিশ্চিত হয়ে যাই, হয়তো আমার দ্বারা সম্ভব না।

এমন সময় আমি দেখা পেলাম, আমার শিক্ষা জীবনের সেরা শিক্ষকের, এনাটমির ড. ফারহানা সায়ীদকে। শিফু’র মতোই তিনি বিশ্বাস করতে লাগলেন, আমাকে দিয়ে হবে। বারবার বলতেন, “তোমার মাথা শার্প, চেষ্টা করো, পারবা”, উনি আধা ঘন্টা খুটিয়ে খুটিয়ে ভাইবা নিতেন, সেখানেই শেখাতেন। আবার পাঠিয়ে দিতেন পড়ার জন্য, পড়ে এসে আবার পরীক্ষা দিতাম।

ফারহানা ম্যাডাম না থাকলে জানি না কোনদিন আমার পক্ষে মেডিকেলে সারভাইব করা সম্ভব হতো কি না, তিনি আমাকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, মেডিকেল মানে মুখস্ত নয়, মেডিকেল মানে প্রচুর ক্যালকুলেশন, মেডিকেল মানে প্রচুর প্রচুর পারমুটেশন-কম্বিনেশন, মেডিকেল মানে প্রচুর যুক্তি।

ম্যাডাম ট্রান্সফার হয়েছেন, এখন তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেলের মেডিসিন এর ডাক্তার, সৃষ্টিকর্তা তাকে তাঁর অগাধ জ্ঞানের সমান অবাধ সুখ দান করুন।

এখন আমি চেষ্টা করি, বুঝে পড়ার চেষ্টা করি। ফিউরিয়াস ফাইভের মতো আমার “এফ ব্যাচের” ও ব্যাচের বাইরের বন্ধু-বান্ধবীরাও আমাকে অনেক সাহায্য করে। কয়েক জনের সাহায্য ছাড়া আজকের আমি, একেবারে সত্য কথা, অসম্ভব ছিলো !


এখন জীবন অনেক দুর্বিষহ বলা যায়, সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাস, ৮টা আইটেম থাকেই। ক্লান্ত আমি, পারি না আম্মুর সাথে বাসায় থাকতে। তবুও, I am trying for fighting back !

চেষ্টা, চেষ্টা আর চেষ্টা – এছাড়া আর কোনভাবেই এই অতল সাগর থেকে পার হওয়া সম্ভব নয়, আমি চেষ্টা করে যাবো। আমি এখন বিশ্বাস করি, “ There is no secret ingredients, To make something special, you just have to believe that is special”, খুব করে বিশ্বাস করি, আমি পারবো, আর তাই হয়তো একদিন ঠিক পেরে যাবো ইনশাল্লাহ।

আমার সহপাঠীনি, দীবা, প্রায়ই একটা কথা বলে, “নিশম, তুমি একদিন অনেক বড় হবা, এই কথাটা মনে রাইখো আমার”। দীবা, আমি তোমার কথাটা কেনো যেনো বিশ্বাস করি, আমি যে কতো অমানসিক পীড়ার মাঝে আছি, একেবারে অল্প কয়েকজন মানুষ জানে, তবুও ভাবতে ইচ্ছা করে, একদিন অনেক বড় হবো, I will be the Dragon Warrior !

কুংফু পান্ডার প্রতি এরকম অন্ধ টাইপের ভালোবাসা ও শারীরিক বিশাল মিলের কারণে, বন্ধু মহলে আমি কুংফু পান্ডা বলে বেশ পরিচিত। একেকবার যখন কেউ আমাকে ডাকে, “ ঐপ কুংফু পান্ডা”, আমার খুব ভালো লাগে, খুব অনুভব করি।
সব শেষে,
Yesterday is history, tomorrow is mystery and today is a gift. That’s why we call it present !
            – Woogway

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অনুপ্রেরণা, ইতিবাচক, কার্টুন, বিবিধ-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

21 Responses to জীবন যেন কুংফু পান্ডা

  1. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    ইন্সপায়ারিং আসলেই তোর মতো পিচ্চিরা না শুধু বুড়োরাও দেখে মজা পায়! 😀

    তোর লেখাটা ব্যক্তিগত সুরে লেখা বলে বেশ ভালো লাগছে

  2. সামিরা বলেছেনঃ

    ভাল লাগলো। শেষ অর্ধেকের আইডিয়াটা ভাল তো! 😀
    মুভিটা আমারও অনেক প্রিয়। :love:

  3. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    উরিব্বাস! কুংফু পাণ্ডারে আমি ভয়ানক ভালু পাই। এই লেখাটা পড়তে পড়তে বুঝলাম, আমার জীবনটাও অনেকটা কুংফু পাণ্ডিত। :yahooo:

    খুব ভালো লাগল লেখাটা নিশম। 😀

  4. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    সাব্বাস নিশম। মানব-শরীরবিদ্যার প্রতি প্রচন্ড সাধনা আর বিশ্লেষণ-বিদ্যার প্রতি ভালবাসা থেকেই আপনি একদিন “ওয়োশি ফিঙ্গার হোল্ড”-এর মত বিশাল একটা কিছু পাবে নগরবাসী।
    তখন, নিন্দুকেরা জিজ্ঞাস করবে, “এটা কি করে করলেন, নিশম?” 😯

    চোখ টিপে উত্তর দেবেন, “আ’ ফিগারড ইট আউট” :dhisya:

    • নিশম বলেছেনঃ

      মন্তব্যটা ঠিক কতোটা পছন্দ হইসে, জানেন ভাই? কমেন্ট পরেই স্ট্যাটাস দিলাম –

      ‎”জীবন যেন কুংফু পান্ডা” লেখাটাতে ব্লগার জ্ঞানচোর এর একটা মন্তব্য এত্তো ভালো লাগতেছে, এত্তো যে ক্যান ভাল্লাগতেছে বুঝতেসি না !!!!

      “সাব্বাস নিশম। মানব-শরীরবিদ্যার প্রতি প্রচন্ড সাধনা আর বিশ্লেষণ-বিদ্যার প্রতি ভালবাসা থেকেই আপনি একদিন “ওয়োশি ফিঙ্গার হোল্ড”-এর মত বিশাল একটা কিছু পাবে নগরবাসী।

      তখন, নিন্দুকেরা জিজ্ঞাস করবে, “এটা কি করে করলেন, নিশম?”

      চোখ টিপে উত্তর দেবেন, “আ’ ফিগারড ইট আউট”

      খুব ভাব নিয়ে বলতে ইচ্ছা করে, ” আম নট আ বিগ ফ্যাট পান্ডা ! আম এ ভি বিগ ফ্যাট পান্ডা ” তারপরেই সেই ঐতিহাসিক স্ক্যাডুশশশশ !!!!!!!!!!!!!!!!! 😀 😀

      আপনার শুভ কামনা আমার জন্য অনেক শুভ হয়ে আসবে, আমি বিশ্বাস করলাম ভাইয়া 🙂

  5. বৈরাগী বলেছেনঃ

    আহ্ ফারহানা ম্যাম কে কোনো ভাবে বদলি করে বুয়েটে নিয়ে আসা যায় না? তাহলে যদি আমি ও ওরকম একটু-আধটু পড়াশোনায় মনযোগী হতাম…… :'(

    • নিশম বলেছেনঃ

      সে সুযোগ থাকলে উনাকে সারা জীবন ঢামেকেই রেখে দিতাম। যেদিন ম্যাডাম চলে যান,গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হয়নি। অভিভাবক হারাবার ব্যাথা, সংশয় টের পাচ্ছিলাম সেদিন।

  6. নূসরাত রহমান বলেছেনঃ

    লেখাটা সুন্দর ত অনেক! বেশ দেরি করে পড়লাম।

  7. মাসরুর বলেছেনঃ

    এই মুভিটা আমার অতি পছন্দের একটা মুভি। কতবার দেখলাম তার ঠিক নাই, দেখতে দেখতে আমার ডায়লগ সব প্রায় মুখস্থ। উগওয়ের গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কথা, সব মিলিয়ে পুরা মুভিটা আমাকে সবসময়েই অনুপ্রানিত করে, তাই সুযোগ পেলেই মুভিটা দেখি। এখন হয়ত এই কমেন্টটা করেই আবার এই মুভিটা দেখতে বসব!! 😛

    একটা ছোট্ট সংশোধন: শেষের দিকে “That’s why we call it gift”এর পরিবর্তে “That is why it is called present” হবে। :love:

    • নিশম বলেছেনঃ

      এই এক ভুল সব জায়গায় করছি 🙁

      আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়, পড়াশুনা করতে ইছা করছে না। কিংবা, কাজে আগ্রহ পাচ্ছি না, আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি না। সাথে সাথে কথা নেই, কুংফু পান্ডা !!! ডায়ালগ গুলো প্রায় মুখস্ত আমারো 🙂

  8. অবন্তিকা বলেছেনঃ

    Yesterday is history, tomorrow is mystery and today is a gift. That’s why we call it present !
    – Woogway
    এই কথাটা এত্ত ভালো লাগে! লেখাটাও ভালো লাগছে অনেক!

  9. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    ওরে হবু ড্রাগন ওয়ারিয়র, কাছে আয়, তোরে দেখতে মন চায়! :love:

  10. অনাবিল বলেছেনঃ

    লেখাটা একদম নিজেকে জড়িয়ে লেখা বলেই এতোটা ছুঁয়ে গেল…… ইন্সপিরেশনটা টিকে থাকুক সবসময়, ফারহানা ম্যাডামের মতো টিচার থাকুক সবজায়গায়………
    আর অনেক অনেক শুভকামনা…………

  11. খেয়া মেজবা বলেছেনঃ

    লেখাটার প্রথম অর্ধেকটা পড়ে ভাবছিলাম লেখাটার কারন কি হতে পারে,পরে যখন পূরোটা পড়লাম অসম্ভব ভালো লাগলো তোর চিন্তা,তোর ধ্যান ধারনার উপর নিজের কন্ট্রোল টা দেখে।দারূণ!অনেক ভালবাসা তোর জন্যে।তুই একজন স্ত্যিকারের মানুষ হ!ভালো মানুষ হবার গুনগুলো তোর মাঝে আছে,ভাল থাক… আমি আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে যা ভালো লাগলো বললাম…
    :happy:

  12. নিবিড় বলেছেনঃ

    সামনে অ্যাবডোমেন কার্ড???? আপনি তো তাইলে বয়সে আমার চেয়ে ছোট্ট হবেন, অথচ কী পরিণত লেখা!!! আজব!!! কীভাবে পারেন??? :-O :-O

  13. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    তোর জীবন তোর তোর লেখার মতোই চমৎকার হোক ……… 😀

বৈরাগী শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।