আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি…

সকাল বেলায় আকাশ কালো ছিল। বিকালেও। সন্ধ্যার আগে আগে ঘুম ভেঙে দেখলাম কমলা রঙের সূর্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম সকাল লিখব, বিকালও লিখবো। মেঘ দেখে আমার খালি খালি লাগা আর ওই কমলা সূর্যটা যে খুব দুঃখী। এর মাঝে কাঁপাকাঁপা কথাগুলো থাকে…নাকি?

ডোরাকাটা যে তেজী বেড়ালটা দুপুরবেলায় দৃপ্ত লাফিয়ে আসে, যার চোখ দেখলে মনে হয় একটুখানি সূর্য ঢুকে গেছে, তাকানো যায় না, আবার জ্বলজ্বল করে গহীনে কোথাও – তাকে দেখলাম চুপচাপ ঘাসের উপর গোল। সামনের বাড়ির বটল-ব্রাশ ফুলের ডালটা আমাদের বেড়ার এপাশে ঝুঁকে আছে। লাল ফুলে ভর্তি।এক রবিবার কড়ি আর ওর বন্ধুরা টুল নিয়ে ওই ফুল পাড়ছিল বলে আমি মানা করেছিলাম। ওরা আম্মার গাছের লেবুর শরবত বানিয়ে আম্মার কাছেই বিক্রি করলো আর হাসলাম আমরা। রবিবারতো শেষ হয়ে যায়।

তুমি বলেছিলে ‘ভালোবাসা না…অভ্যস্থতা’। হবে…

আমি এখন অনভ্যস্থ। তবু তোমার এক লাইনের চিঠিতে যখন লেখ ‘আমি মদ খেয়ে কান্নাকাটি করেছি আর শাহবাগ মোড় দুই ফিট পানির তলায় ডুবে গেছিল…’

আমি জানতে চাই ‘সাঁতড়ায়ে ফিরলা বাড়ি?’

উত্তর তো তুমি দাও না! হয়তো কোনদিন মাঝরাতে ফোন করে বলতেও পারো ‘আমি তো হারায়ে গেছি আর এখন খুব বৃষ্টি’…

ভোরবেলা্র ইয়ারা নদী আগের মতন। তখনো আকাশ কালো ছিল। ওই ব্রিজটা পার হয়ে যেতাম আমি। এখন যাই না। একদিন ওই বেঞ্চটায় বসেছিলাম সারা দুপুর। এক জটাধারী বলে গেল পৃথিবী ডুবে যাচ্ছে আর তখনই বাজলো সন্তুর। সুরটা কেমন টলটল করতে করতে ঢুকে গেল আমার পেটের মধ্যে। মনে করলাম, বসেই থাকি, ডুবেই যাব যখন।

কলিন স্ট্রিটের অফিসটা এত্ত বিশাল! উঁচু সিলিং, আকাশের চেয়েও দূরের মনে হয়। একপাশে কি যেন স্কাল্পচার একটা, খাঁজ কাটা আরো কি সব ভিতরে। ইচ্ছা হচ্ছিল ভালো করে দেখি, দেখলাম না। ওদের পানির বোতলটা খুব সুন্দর, স্বচ্ছ কাঁচের উপরে রূপালী ঢাকনা। ‘বাকিংহাম প্যালেস কি এত বিশাল? মানুষ তো পাইপেও থাকে’…ভাবলাম আমি।

পার হচ্ছিলাম স্টেশনের পরে স্টেশন। এখন বসন্তকাল। গাছের পাতাগুলি নতুন আর ফুলেরা রঙিন। এরকম একটা শহরকে চিনতাম, এই শহরটা অন্য।

একটা প্লাটফর্মে স্কুল ফেরতা একজোড়া ছেলেমেয়ে বসেছিল, সিমেন্টের উপরে। দুইজনের দুইপাশে মেরুন রঙের ভারি ব্যাকপ্যাক গড়াচ্ছে। কালো জুতা, সাদা মোজা। সামনে মেলে দেয়া পা। কি অনায়াস! মেয়েটার কালো চুল, রেশমী। কোলের উপর একটা হাত আরেক হাত মেঝেতে ঠেকানো। ওরা ঝুঁকে আছে একে অপরের দিকে, চোখে চোখ। মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছিল হালকা, মুখটা হাসি হাসি…পার হয়ে এলাম। ক্লাস টেনে উলরিখ একবার আমাকে ‘এঞ্জেল’ ডেকেছিল।

ঘরের জানালা। কিছু দেখছিলাম না আমি। ঘুম পাচ্ছিল। কোন কারণ ছাড়াই মান্না দে’র গানের লাইন মনে আসলো –

‘আমি কি আর ভালো হবো না ডক্টর রয়?
আমাকে আপনি বাঁচিয়ে দিন…
বড্ড ঘুম পাচ্ছে, ভিজিটিং আওয়ার্সে মমতা এলে
প্লিজ ডেকে দেবেন…’

আকাশে তখনো কালো মেঘ। বৃষ্টি হলো না।

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বিবিধ-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

6 Responses to আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি…

  1. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    মেঘের কাছাকাছি গেলে বোধহয় হঠাৎ করেই সব ইচ্ছে উবে যায়। ডুবে যাব বলেই উঠতে ইচ্ছে করে না তখন, ভালোবাসার মুহূর্তে চোখ পড়ে গেলেও সরিয়ে নেয়া যায় কত সহজেই। বৃষ্টির খোঁজে দেখা হয় না সূর্যটাকেও। শুধু মেঘের কাছাকাছি গেলেই এমন হয়, তাই না?

    খুব ভালো লাগল আপু।
    মেঘের কাছাকাছি ঘুরছি আমিও। আজ কেন যেন সবকিছু বড্ড বেশি এলোমেলো লাগছে।
    এক আকাশ ভাঙা বৃষ্টি দরকার ছিল আমারও।
    তবু ছাই, আকাশটা কালো হয়েই বসে আছে।
    বৃষ্টি আজ আর হল না।

  2. অনাবিল বলেছেনঃ

    আজ কি সবারই তাহলে বিষন্ন দিন……

    🙁 🙁

  3. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    ঘোর লাগা লেখা…লাইব্রেরিতে ছিলাম জার্নাল ঘাঁটাঘাঁটির কাজে। সরবে ঢুকে আপনার পোস্ট দেখে আর তর সইল না। পড়ে ফেললাম একটানে। এখন ঘরে ফিরে কমেন্ট করি। 😀

    মেঘ আমার খুব প্রিয় একটা নাম, প্রিয় একটা শব্দ। প্রিয় এক সৃষ্টি…
    ভালোবাসি সাদা মেঘ, কালো মেঘ, বৃষ্টি আনা মেঘ, বৃষ্টি না আনা গোমড়ামুখো এলোমেলো মেঘ…একবার মনে আছে রাইন নদীর কোল ঘেঁষে হাঁটছি, মেঘের রঙ কী অদ্ভূতভাবে বদলাচ্ছিল, ক্ষণে ক্ষণে…আর তার সাথে সাথে নদীর রঙরূপও…পাগল হয়ে গিলেছিলাম সেই ঘোরলাগা বিকেলের সৌন্দর্য…

    “মেঘ হলে মন বিকেল বেলা একলা যেতাম মেঘের বাড়ি…” গানটা আমি প্রায় প্রতিদিনই গুণগুণাই…

    বৃষ্টি চলে আসবে আপু চিন্তা নিয়েন না। বৃষ্টি তো মেঘেরই কন্যা… 😀

  4. সামিরা বলেছেনঃ

    উড়ো উড়ো লেখাগুলি এরকম…ভাল লাগে বেশ! 🙂

  5. নোঙ্গর ছেঁড়া বলেছেনঃ

    এত সুন্দর একটা লেখা। শব্দগুলো পড়ে ঘোর ঘোর লাগে যেন। ফেবুতে শেয়ার দিলাম সাগ্রহে : )

  6. Ornob বলেছেনঃ

    সকাল বেলায় আকাশ কালো ছিল। বিকালেও। সন্ধ্যার আগে আগে ঘুম ভেঙে দেখলাম কমলা রঙের সূর্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম সকাল লিখব, বিকালও লিখবো। মেঘ দেখে আমার খালি খালি লাগা আর ওই কমলা সূর্যটা যে খুব দুঃখী। এর মাঝে কাঁপাকাঁপা কথাগুলো থাকে…নাকি?

মাধবীলতা শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।