গার্মেন্টসে আগুন-অবহেলার উপাখ্যান

সকালে ফেসবুক খুলে দেখলাম সাভারে পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গেছে ১২৪ জন। শোকে ভেসে যাচ্ছে ফেসবুকের হোমপেজ। তদন্ত কমিটি আর শোকার্ত মানুষের মুখ-যেন একই নাটক মঞ্চস্থ হয় বারবার, তারপর আবার।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী দুর্ঘটনা এড়াতে প্রত্যেক কারখানায় নিচের জিনিসগুলো থাকার কথা:

১. সুবিধাজনক দূরত্বের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ও  বিকল্প সিঁড়ি।

২. প্রত্যেক ফ্লোর থেকে বিকল্প সিঁড়িতে যাওয়ার জন্য সোজা এবং বাধামুক্ত পথ।

৩. কোন গেট তালা দিইয়ে আটকে রাখা যাবে না।

৪. বহির্গমন পথ লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা, যেন দুর্ঘটনার সময়ও চোখে পড়ে।

৫. অগ্নিকাণ্ড শুরু হবার সাথে সাথে শ্রবণযোগ্য সতর্ক সংকেত বাজানোর উপায়।

৬. প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ড এর মহড়া করা।

এই কাজগুলো হচ্ছে কি না সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিদর্শকের।

“শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তোবা গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনে আগুন লাগে। অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর ১০টি ইউনিট প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত পৌনে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এই অগ্নিকাণ্ডে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১২৪ জন মারা গেছেন।”

মানুষ কেন মারা গেলো ভেবে দেখা যাক:

১. আগুন লাগার সাথে সাথে আগুন নেভানোর যন্ত্র পাওয়া যায় নি। যদি আগুন নেভাবার যন্ত্র পাওয়া যেত তাহলে এভাবে আগুন ছড়াতে পারতো না।

২. বিকল্প সিঁড়ির পৌঁছানোর কোন উপায় পাওয়া যায় নি। বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকলে নিশ্চয়ই কারখানার উপর থেকে লাফ দিয়ে মানুষ নিচে পড়তো না। তাছাড়া, অনেক পোশাক শিল্প কারখানাতেই বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা থাকে না।

৩. যথাযথ সময়ে সতর্ক সংকেত পায় নি শ্রমিকেরা। ঠিক সময়ে সতর্ক সংকেত পেলে এতোগুলো মানুষ আটকে পড়ে কিভাবে?

৪. বেশিরভাগ কারখানায় দেখা যায় গেট তালা দিয়ে রাখা না হলেও, নির্গমন পথের আকার এমনই থাকে যে দুর্ঘটনায় মানুষ বের হয়ে আসতে গেলেও চাপা পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

৫. ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নিজের বাসার পাশে একটা গার্মেন্টস আছে যেখানে গত সাত বছরে একবার অগ্নিকাণ্ডের মহড়া হতে দেখেছি। প্রতি বছরের মহড়া হবার আইনটা কতটুকু মানা হয়-সেটা নিয়ে বিশাল প্রশ্ন থাকে।

৬. অধিকাংশ কারখানায় চলার পথের মাঝে কাপড়ের স্তূপ পড়ে থাকে, যা এই রকম দুর্ঘটনায় বের হয়ে যাওয়াকে অসম্ভব করে তোলে।

৭. আগুন নেভাতে এতো দেরি হবার কারণ সম্পর্কে দমকল বাহিনী থেকে বলা হয়েছে, আশপাশে যথেষ্ট পরিমাণ পানি না পাওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি হয়েছে।

একটা কারখানার আশেপাশে আগুন নেভানোরও পানি পাওয়া যাবে না-এর চেয়ে বেশি আর কিভাবে শ্রমিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা যায়?!

এতোগুলো মানুষের মৃত্যুকে কি দুর্ঘটনা বলবো নাকি হত্যা?

বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানায় প্রথম আগুন লাগে ১৯৯০ সালে রাজধানী ঢাকার মিরপুরে। সারাকা গার্মেন্টসে ৩২জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা যায়। এরপর ১৯৯৭ সালে ঢাকায় সাংহাই অ্যাপারেল নামে একটি গার্মেন্টস ২৪ জন শ্রমিক আগুনে পুড়ে মারা যায়। এরপর ২০০০ সালে বনানীর গ্লোব নিটিংয়ে আগুন লেগে মারা যায় আরও ১২ জন শ্রমিক। ২০০৪ সালে ৪টি পৃথক দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে ও পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যায় মোট ২১ জন শ্রমিক। ২০০৫ সালে স্পোকট্রাস কারখানার ভবন ধসে পড়ে মারা যায় ৭৩ জন শ্রমিক। ২০০৬ সালে কেটিএস গার্মেন্টসে আগুন লেগে মারা যায় ২৩ জন শ্রমিক। বিজিএমইএ’র হিসাব মতে এখন পর্যন্ত ছোট-বড় তৈরি পোশাক গার্মেন্টস সেক্টরে ১৬৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে মারা গেছে ২২২ জন শ্রমিক। তবে দেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোর হিসাবে মারা যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০০ জন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ন্যাশনাল লেবার কমিটির হিসাব অনুযায়ী আমাদের বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ৫০০ জন শ্রমিক, যার বেশিরভাগই হচ্ছে নারী শ্রমিক। এই সময়ে আহত শ্রমিকের সংখ্যা ১৯৫৬ জন।

গার্মেন্টস শিল্পে ১০-১১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৯’শ ১৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার পরিমাণ রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতির বিরাট একটা অংশকে এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিলে গার্মেন্টস শিল্পে ধ্বস আমতে বেশি সময় লাগবে না।

বাংলাদেশের শ্রম আইন করার পর এটা পালন হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব অনেকের। মালিক নিরাপত্তার পূর্ণ ব্যবস্থা নেবে, পরিদর্শক খোঁজ নেবে ব্যবস্থাগুলো ঠিক আছে কি না, মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করবে পরিদর্শক তার দায়িত্ব পালন করছে কি না।

বারবার মৃত্যু দেখতে ভালো লাগে না, আগুনে পোড়া লাশের পোড়া শরীর আর তার স্বজনের কান্না কি দায়িত্বশীলদের টনক নড়াবে না কোনদিন? শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ চায় না, শ্রমিকের পরিবার কোটি টাকা চায় না, শ্রমিকের পরিবার জাতীয় শোক চায় না, শুধু চায় কাছের মানুষটাকে নিয়ে কোনরকমে বেঁচে থাকতে।

মালিক, বিজিএমইএ, মন্ত্রণালয়, সরকার-আপনারা একটু চোখ মেলবেন কি? মানুষ পোড়া গন্ধ কি আপনাদের নাকে যাচ্ছে না?

স্বপ্ন বিলাস সম্পর্কে

বাস্তবে মানুষ হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। জীবনের নানা পথ ঘুরে ইদানীং মনে হচ্ছে গোলকধাঁধায় হারিয়েছি আমি। পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি আর দেখে যাই চারপাশ। ক্লান্ত হয়ে হারাই যখন স্বপ্নে, তখন আমার পৃথিবীর আমার মতো......ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা। আর তাই, স্বপ্ন দেখি..........স্বপ্নে বাস করি.....
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে চিন্তাভাবনা, সচেতনতা-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

3 Responses to গার্মেন্টসে আগুন-অবহেলার উপাখ্যান

  1. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    অবস্থাটা এখন এমন যে প্রতি বছর এখন একাধিকবার এইরকম ঘটনার কথা দেখতে আর শুনতে হয়।

    যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় তা হল, বিশ্ববাজারে না হয় বাংলাদেশি শ্রমশক্তির মূল্য অনেক কম কিন্তু তাই বলে নিজের দেশেও এতটাই সস্তা হবে?

    মানুষ পোড়া গন্ধ কি কখনোই কর্তৃপক্ষের মস্তিষ্কে পৌঁছুবে না?

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    যদি সম্ভব হয় পরিসংখ্যান গ্রাফ আকারে দেয়া উচিৎ

    ফেইসবুক থেকে হাসিব মাহমুদ এর স্ট্যাটাস কপি করলাম

    মৃত্যু ১২৪ জনের। খুনপ্রতি ১০০,০০০ ক্ষতিপূরণ বিজেএমইর পক্ষ থেকে।
    – খুন হয়ে যাওয়া ১২৪ জনের গড় ন্যুনতম মজুরি ৪৬৩৫ টাকা। অর্থাত পুরো জীবন হারিয়ে ফেলা প্রতিজন ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেলেন ২১ মাসের বেতন।
    – বিজেএমইর সদস্যসংখ্যা ৩২৬০। তারা সবাই মিলে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ১কোটি ২৪লাখ টাকা। অর্থাত, কোম্পানীপিছু অবদান ৩হাজার ৮শত টাকা।
    অগ্নিনির্বাপনের সরজ্ঞাম, ট্রেনিং, প্রশস্ত নির্গমনপথ বানানোর থেকে ৩৮০০ টাকা দিয়ে আপদ বিদেয় করাই উত্তম।

    এই জাতীয় ঘটনা সিম্পল দুর্ঘটনা না! গণহত্যা!

  3. রাইয়্যান বলেছেনঃ

    এতোগুলো মানুষের মৃত্যুকে কি দুর্ঘটনা বলবো নাকি হত্যা?

    হায়, পরিবর্তনের সদিচ্ছা আদৌ কারও আছে বলেই তো মনে হয় না

রাইয়্যান শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।