কালের দেয়ালে…

তখন আজিমপুরে থাকি। ছেলেবেলা ভালই কাটছিল যখন আমি হঠাৎ করেই বাবাকে হারাই। আমি তখন এতটুকুই ছোট যে বাবার ভালবাসা ও স্নেহ তো বুঝি কিন্তু তা হারানোর কষ্ট ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। মা যখন প্রথমবার আমাকে কোলে তুলে বাবা মারা যাবার কথা বলেন তখন যে আমি কিছুই বুঝিনি সে কথা এখন চিন্তা করলেও ভিতরতা খাঁ খাঁ করে উঠে। বাবা চলে যাবার পর মা-ই আমার সবকিছু হয়ে আমার পাশে দাঁড়ান, মায়ের আঁচল তখন শুধুই ধরে থাকতাম যাতে কিছু হারানোর অনুভুতি আমাকে কখনই জানতে না হয়। আমি আমার ছেলেবেলার দিনগুলোর সাথে একাকী খেলতে খেলতেই এক পা দু’পা করে চলতে থাকি।

যতদিন আজিমপুরে ছিলাম প্রায় প্রতি মাসেই বাবাকে দেখতে যাওয়া হত। খুব দূরও তো নয়, এই আজিমপুর গোরস্থান। এস,এস,সি ও এইচ,এস,সি পর্যন্ত ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে আমি একাই বাবার সাথে কথা বলতে চলে যেতাম। প্রায় সময় এ সম্পর্কে মাকে কিছু বলা হত না। বাবার কবরের পাশেই একটা বড় আমগাছ ছিল ঠিক গোরস্থানের সীমানা ঘেঁষে দুটো সেগুন গাছের পরে উঁচু দেয়ালের পাশে। সেখানে বসে বাবার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনেক কথাই বলা হত তখন, বাবা আমার পাশেই আছেন, থাকবেন। মা যদি কখনো আমার কাছে আমি কোথায় যাচ্ছি বা কী করছি জানতে চাইতেন তাহলে বলতাম, “বাবার অনুমতি নিয়ে আসচি” মা কিছুই বলতেন না। এই চুপ থাকার কারণ তখন অনেক সাধারণ মনে হত কিন্তু এখন বুঝি, বাবার পর আমার কাছে মা ছিলেন কিন্তু মা-এর কাছে আমার বাবা ছিলেন না। সময়তে আমিও না। নতুন করে মা কিছুই হারাতে চাইতেন না।

যত সময় যেতে থাকে আমাদের আর্থিক অবস্থাও কিছুটা কঠিন হতে থাকে। আমার ইচ্ছা ইঙ্গিনিয়ারিং পড়তে দেশের বাইরে যাব। আর্থিক টানাপোড়েনে সে ইচ্ছা প্রায় মৃতপ্রায়। এমন সময় মা সব দিক চিন্তা করে বললেন আমাদের আজিমপুরের বাড়িটা বিক্রি করতে হবে। আমি বার বার না করলাম কারণ বাড়িটা বাবার শখের ছিল। মা মানলেন না। মামাদের সাথে কথা বলে বাড়ি বিক্রি করা হল আর আমরা চলে আসলাম মিরপুর। এখানে নতুন পরিবেশের সাথে মিল করে নিতে কিছু সময় লাগছিল। মা আর আমি বাস্ততার মাঝে ডুবে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি কিন্তু কিছুই কাজে দেয় না। বাবাকে আজিমপুরে ফেলে আসার এক কঠিন-নিস্তব্ধ কান্না আমাদের মনে জেগে থাকে যা শত বাস্ততাও মুছে দিতে পারে না।

আমি অনেক চেষ্টা করতে থাকি কোন ভালো ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপ পাবার জন্য। আমি আশাবাদী ছিলাম পাবো এবং পেয়েও গেলাম। কিন্তু অনেক সময় অপেক্ষার পর। আমি অনেক খুশি তবে মায়ের চেয়ে বেশি বোধ হয় না। আমি প্রায় হাফ ছেড়ে বাঁচলাম এই ভেবে যে কমপক্ষে আমাদের বাড়ি বিক্রি করার কষ্টটা মা কিছুটা হলেও এখন মানতে পারবেন। হংকং সিটি ইউনিভার্সিটিতে আমি রোবটিক্স পড়ার সুযোগ পাই। মনে হচ্ছিলো আমাদের হয়তো কোন একটা গতি হতে চলেছে। এর ঠিক সাড়ে তিন মাস পর আমি মাকে রেখে হংকং চলে যাই।

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প, সাহিত্য-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , , , , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

2 Responses to কালের দেয়ালে…

  1. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    ভাইয়া এটা কি আপনার নিজের কথাই বললেন ? আপনার উদ্দেশ্য সফল হোক অনেক দোয়া করলাম। আপনি যেন আপনার মাকে এবং মরহুম বাবার আনন্দের কারণ হতে পারেন। জীবনের টানাপোড়েনের কষ্টগুলো বুঝি এরকমই হয়। ভাইয়া আপনি অবশ্যই পারবেন, মনে সাহস রাখেন আর সৃষ্টিকর্তার উপর আস্থা রাখুন। 🙂

    • Chronose বলেছেনঃ

      আপু,
      লেখাটা আমাকে নিয়ে না। আসলে আমি এ গল্পের শেষ খণ্ডের জন্য সম্পূর্ণ গল্পটা লিখছি…
      তবে কাহিনীটা যার, তাঁর কাছে আপনার দোয়া পৌঁছে যাবে…। 🙂

Chronose শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।