বর্ণমালার দেশে

ছোটবেলায় ২১শে ফেব্রুয়ারীর আগের রাতে আমাদের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা রাত জেগে জেগে আলপনা আঁকছে ফুলার রোডের উপরে। ওরা আঁকতো, গান গাইতো, কথা বলতো । আমরা উঁকিঝুকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম কেমন হচ্ছে আলপনা। মাঝে মাঝে ছোটমামা অথবা আমার খালাতো ভাই বারান্দা থেকেই কথা বলতো ওদের সাথে। ওরাও জবাব দিত। যেন সম্পুর্ণ অচেনা কিছু মানুষের ছিটেফোঁটা কথার টুকরো নয়, বরং অনেক অনেক আগে থেকে একটা চলমান কথোপকথনের অংশ। ওই বিশেষ রাতে আমাদের বারান্দাটা সারা রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে যেত। ভীষণ আপন লাগতো সবাইকে। ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভোরবেলায় ঘুম ঘুম চোখে বারান্দায় দাঁড়াতাম – বাতাসে তখন ধুলা, কুয়াশা আর নতুন রোদ মিলেমিশে একটা সকাল সকাল গন্ধ। গতরাতের এঁকে যাওয়া আল্পনার উপর দিয়ে খালি পায়ে এগিয়ে যেত প্রভাত ফেরী। মেয়েরা সব সাদা শাড়ী, কালো পাড়, কখনো গান – আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী…আর কখনো চুপচাপ ধীর পায়ে পথ হাঁটা। তখন ইতিহাস জানা ছিলনা, তবুও দিনটা আমাদের উদ্দীপিত করতো। আমরা তিনবোন ভোর হওয়ার অনেক আগেই একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে জেগে উঠতাম – অনেকটা ঈদের দিনের মতো। এক অপরকে জিজ্ঞাসা করতাম ‘মনে আছে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী!’ এই নাটকটা সম্ভবত ২০০২/২০০৩ এর দিকে লেখা। মেলবোর্ণে একবার সারাদিনব্যাপী একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল ২১শে ফেব্রুয়ারীতে, এই নাটকটায় বাচ্চারা অভিনয় করেছিল। পুরানো লেখা খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম।


চরিত্র

লতা: বয়স ৫ – ৭। ঢাকার একটা ফ্ল্যাট বাড়ীতে বাবা মা আর বড় দুই ভাই বোনের সাথে থাকে।

লাবনী: লতার বড় বোন। ক্লাস ৮/৯ এর ছাত্রী।

নঈম: লতা ও লাবনীর বড় ভাই। কলেজে পড়ে।

রহমান সাহেব: লতার বাবা

লতিফা বানু: লতার মা

এবং বর্ণমালা দেশের অধিবাসিগন


দৃশ্য ১:

ছোটখাটো সাজানো বসার ঘর। সোফায় বসে টেবিলের ওপর হারমোনিয়াম রেখে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটা তোলার চেষ্টা করছে লাবণী। তার চোখে মুখে গভীর মনোযোগ। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় প্রথম লাইনটা তুলতে পেরে পাশে বসে থাকা নঈমকে চোখের ইশারায় গাইতে বলবে। তারপর হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে দুইজন মিলে গাইতে থাকবে, খানিকটা বেসুরো। বারে বারে বাজনা থামিয়ে সুর ঠিক করবে। এমন সময় লতা ঘরে ঢুকবে। কিছুটা অবাক হয়ে আস্তে আস্তে লাবনীর পাশে এসে দাঁড়াবে।

লতা: তোমরা কি করো?

লাবনী: গাধারাম! দেখছিস না গান তুলছি? সব সময় পিছে পিছে ঘুরিস কেন? যা আম্মার কাছে যা।

নঈম: আহা, বকিস কেন? আপু তুমি আমাদের কাছে আস। গান গাইবে?

লতা: (খুশী হয়ে ঘাড় কাত করবে) হুমমমমম! কিন্তু এই গান পারিনাতো! আপু ‘ডোলা রে ডোলা’ গানটা গাও। ওইটা আমি পারি। নাচ ও পারি! একদম ঐশ্বরিয়ার মত।

লাবনী: (ভীষন রাগ করে) ভাইয়া এইটাকে কোলের থেকে নামা তো! ২১শে ফেব্রুয়ারীর দিন ‘ডোলা রে ডোলা’ নাচ দেখাতে গেলে মানুষজন মাইর লাগাবেনা ধরে?

লতা: কেন? এইটাত ভালো গান। তুমিই না টিভির সামনে দাঁড়িয়ে মাধুরীর নাচ প্র্যাকটিস কর?

লাবনী: (মুখ ভেংচিয়ে) একটা থাপ্পড় খাবি কিন্তু এখন। ২১শে ফেব্রুয়ারী আর অন্য ফাংশান এক হলো নাকি? এটা হলো গিয়ে ভাষা আন্দোলন দিবস। খালি বাংলা ছাড়া আর কিছু গাওয়া যাবে না। এখন অতো বকর বকর না করে গান গাইতে চাইলে গা। ঠিক মতো গাইতে পারলে তোকেও কোরাসে চান্স দিব। ওকে ওয়ান টু থ্রি…’আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’…(নঈমও শুরু করবে সাথে সাথে। লতা গাইতে গিয়ে মুখ খুলেও খুব চিন্তিত মুখে চুপ করে থাকবে।

লতা: কিন্তু আপু। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কেন? নঈম ভাইয়ার কোথায় কেটেছে? আর ভাইয়া তুমি সেভলন না লাগিয়ে গান গাও কেন? আম্মা শুনলে খুবই বকা দিবে। আর আমার যে ওইদিন দাঁত পড়লো, তোমরা তো কেউ ফাংশান করলা না!

(নঈম জোরে হেসে উঠবে। লাবনী রাগ করতে গিয়েও হাসি সামলানোর চেষ্টা করবে। )

লাবনী: নারে বেকুব। অনেক অনেক দিন আগে যখন আব্বা আম্মাও জন্মায় নাই, তখন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলা নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে মারা গেছে। এইজন্য এখন এই দিনে ফাংশান হয়। আর খালি বাংলা বলতে হয়। বুঝলি কিছু?

লতা: (কিছুটা বোকা বোকা চেহারায়) মানে……মানুষজন সব মরে গেছে বলে আমরা গান গাই?

নঈম: (হাসতে হাসতে লতার মাথার চুল এলোমেলো করে দেবে) নারে লতাপাতা। মানুষ মরে গেছে বলে গান গাই না। আমরা গান গাই ওদেরকে সম্মান দেখানোর জন্য। সেলিমদাদু আসে না আমাদের বাসায়? ওইযে তোর জন্য কত চকলেট নিয়ে আসে সবসময়? উনিও তো এই আন্দোলনে ছিলেন ১৯৫২ সালে।

লতা: (প্রবল বেগে ঘাড় নাড়তে নাড়তে, যেন এতক্ষণে সব রহস্য পরিষ্কার হলো) ওহ তাই বলো! তাহলে তো তোমরা দুইজন ভুল ভাল গান গাচ্ছিলা এতক্ষণ। গানটা আসলে হবে ‘আমার দাদুর রক্তে রাঙানো..’

(লাবনী এবার চেয়ার থেকে উঠে তেড়ে যাবে লতাকে মারতে।) স্টুপিডের চুড়ান্ত! গেলি এইখান থেকে? সবকিছুতে একটা ঝামেলা করতেই হবে।

লতা দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাবে। লাবনী আবার হারমোনিয়াম বাজাতে থাকবে। স্টেজ খালি করে আবার নতুন করে সাজানোর সময় এই বাজনাই বাজতে থাকবে।

দৃশ্য ২ :

খানিকটা অগোছালো পড়ার ঘর। একপাশে একটা বুক শেলফ। আর অগোছালো টেবিলের ওপাশে চিন্তিত রহমান সাহেব বসে। পাঞ্জাবী পায়জামা পরনে। একপাশে চায়ের কাপ থেকে ঘন ঘন চুমুক দিচ্ছেন। কখনো মাথা তুলে চিন্তিত চোখে দর্শকদের দিকে তাকাচ্ছেন। নিজের মনেই বিড় বিড় করে দুই একটা শব্দ উচ্চারণ করছেন আর খসখস করে সামনের কাগজে লিখছেন। কাটছেন। কাগজ ফেলে দিচ্ছেন।

(এইবার গলা তুলে লতিফা বানুকে ডাকবেন)

: কি হলো? এইদিকে একটু শোন।

লতিফা বানু: (সালোয়ার কামিজ পড়া। ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে। তাঁর পেছন পেছন লেজুড় হয়ে লতাও ঢুকে পড়েছে চুপচাপ। টেবিলের পাশে দাঁড়াবে আর মা বাবার কথা শুনতে থাকবে)

: কি ব্যাপার? চিল্লায়ে তো বাড়ি মাথায় তুলে ফেললা! যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমার অনেক কাজ।

(রহমান সাহেব কিছু বলার আগেই লতা হাসতে শুরু করবে)

: হি হি! আম্মা, আব্বা এই বাড়ি মাথায় নিলে তো ফ্ল্যট হয়ে যাবে! আব্বা কি ইনক্রেডিবল হাল্ক?

লতিফা বানু : (মেয়ের মাথায় হালকা চাঁটি মেরে) উফ চুপ কর্ তো! যা বস্ ওইখানে।

(লতা একটা চেয়ারে বসবে। মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাবা মায়ের আলাপ শুনবে।)

রহমান সাহেব: (উৎসাহের সাথে) হুম এখন শোন। বক্তৃতা টা লিখে ফেললাম। একটু পড়ি। কমেন্ট করো।

লতিফা বানু: (অনিচ্ছুক ভাবে) শোনাও, তবে তাড়াতাড়ি পড়। আমার আবার বিজুরি ভাবিকে ফোন করতে হবে। এই পাড়ার থেকে একটা প্রভাত ফেরি করবো ভাবতেছি। কিভাবে শাড়ি টাড়ি পড়া হবে। আর সাজসজ্জা নিয়েও আলোচনা করতে হবে। মিছিল যেহেতু করবোই খানিকটা ধুমধামই করা দরকার। এমন একটা করা দরকার যেইটা মানুষ তাকায়ে দেখবে। কি বলো?

রহমান সাহেব: তাতো ঠিকই। তবে ওইগুলা তোমাদের ব্যপার। ভালই হবে। তুমি যখন আছো। এখন এইটা শোন দেখি। ব্যাটারা আবার ঘড়ি ধরে দুই মিনিট সময় দিলো। আরে এত আবেগের ব্যাপার কত কিছু বলা লাগে! দুই মিনিটে হয় নাকি?

লতিফা বানু: আরে তবুও তো তুমি একটা বক্তৃতা দেয়ার চান্স পাইছো। আব্দুল করিম সাহেব তো প্রতি বছর বক্তৃতা দিতে চায়। উনারে চান্স দেয়া হয় না।

রহমান সাহেব: (খুশী হয়ে) আরে সবার তো আর এক স্টেটাস না সমাজে। তবে আমাকে ছাড়াও এই পাড়ার থেকে হরিপদ বিশ্বাসকে বক্তৃতা দিতে বলেছে । তবে উনার কেস অন্য, সংখ্যা লঘু তো, সুযোগ দিতেই হয়।

লতিফা বানু: (তাড়া লাগবে) পড়তো জলদি। আবার স্টার টিভিতে ‘কাল হো না হো’ দেখাবে।

রহমান সাহেব: (গলা খাঁকারি দিয়ে, গলা কাঁপাতে কাঁপাতে) বন্ধুরা ২১শে ফেব্রুয়ারীর কথা মনে হলেই আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। সালাম, জব্বার, বরকত, রফিক নাম গুলি আমার ধমনিতে রক্তস্রোতের মতন অনুভব করি। এখনো মুজিবের সেই আ–ও–ভা–ন শুনে শিহরিত হই – ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম! এবারের…’

লতিফা বানু: (মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে) : কি বলো? ৭১এর সাথে ৫২ জোড়া দিছ কেন? মানুষ কি মদন?

লতা: হিহি। আম্মা মদন কি?

লতিফা বানু: তোমার জানতে হবে না, চুপ থাকো।

(লতা মাথা নিচু করে হাতের নখ খুঁটবে)

রহমান সাহেব: (একটু বোকা হেসে) আরে তাইতো! এই দেখো। বক্তৃতাটা আসলে গত বছর বিজয় দিবসে লিখেছিলাম। পরে তো আর পড়ার চান্স পেলাম না। বোমা মারা শুরু হয়ে গেল, তাই ওটাই ঝালাই করে নিতেছি। এই লাইনটা যে রয়ে গেছে টের পাই নাই।

লতা: (অবাক হয়ে) আব্বা তুমি এক বক্তৃতা সব সময় দাও, মানুষ তবু শোনে?

রহমান সাহেব: (হঠাৎ রেগে গিয়ে) এই মেয়েটা এইখানে কি করে লতিফা? সব সময় বড়দের ব্যপারে নাক গলাতে হবে। বই কই? যাও বর্ণমালার বই কিনে দিলাম না? সব মুখস্থ করো বসে বসে। লতিফা , একে কান ধরে পড়তে বসাও।

লতিফা বানু: (লতার হাত ধরে টানতে টানতে): আসলেই খুব লাই দেয়া হয় তোমাকে। চল পড়তে বস।

লতা: (কান্না কান্না মুখে) বই পড়বো না আম্মা। বর্ণমালা আমার ভালো লাগে না। বোরিং!

(হাত ধরে টানতে টানতে স্টেজের বাইরে নিয়ে যাবে)

দৃশ্য : ৩

(সেট বদলাতে হবে না। একই চেয়ার টেবিল ব্যবহার করা যায়। তবে স্টেজের একপাশে সরানো থাকবে। শেলফে বইয়ের বদলে কিছু স্টাফড এনিমেলস থাকলে ভালো হয়। লতা দুলে দুলে বই পড়বে। ঘন ঘন হাই তুলবে।)

স্বরে অ — তে অ জ গ র
স্বরে আ – তে আম ….

‘ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে……’

(হাই তুলতে তুলতে বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়বে)

দৃশ্য ৪:

(একটা বড় বোর্ডে ‘বর্ণমালার দেশ’ লিখে টেবিলটা ঢেকে দিতে হবে। যাতে ঘুমন্ত লতাকে দর্শকের সারি থেকে না দেখা যায়। স্টেজের অন্য প্রান্তে একটা বিশাল গাছের ছবিওয়ালা বোর্ড বা আসল বড় গাছ থাকলেও হয়, যার তলায় গোল হয়ে বসা যায়। বর্ণমালার অধিবাসীরা স্টেজের মাঝখানে জড়ো হবে, ঘুরে ঘুরে খেলবে, হাসবে, লাফালাফি করবে। লতা বোর্ডের সামনে দিয়ে আসবে। দলটার কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়াবে। আর সবাই ওর কাছে এগিয়ে আসবে। একজনের পর একজন লতাকে স্বাগত জানাবে। এটা খেয়াল রাখতে হবে যেন সবার কথা মিলেমিশে একটা বাক্যের মত শোনায়। )

স্বাগতম!
সুস্বাগতম!
ভালো আছো?
কাইফা হালুক?
কিয়োরা!
বনজুর!
আইয়ে জনাব।
সালাম আলাইকুম!
নামাস্তে।
ওয়েলকাম!
সাত স্রিয়া কাল।
খোশ আমদিদ।

লতা: (হকচকিয়ে যাবে): আরে আরে কি মুশকিল! কে তোমরা?

(এক এক জন এগিয়ে এসে পরিচয় দেবে। যে বলবে সে সব সময় দর্শকের দিকে ফিরে থাকবে।)

– আমি কবি কবুতর

– আমি কোনঠাসা কাকাতুয়া

– আমি ক্লান্ত কাক

– আমি কর্মী কাঠবেড়ালী

– খেয়ালী খরগোশ

– খাদক খচ্চর

– গায়ক গাধা

(কবি কবুতর কথা বলবে) : এহ হলো না। বোলো না। গাধা আর গায়কে যে মেলেনা! অন্য কিছু বলো না!

গাধা : তবে তাই হোক। আমি জ্ঞানী গর্দ্ধভ।

গন্ডার: ওহ! গায়কের পোষ্টটা যখন খালি। আমি তাহলে গায়ক গন্ডার।

– আমি গাণিতিক গরু।

– চামচা চামচিকা

– জবরদস্ত জিরাফ

– দয়ালু দোয়েল

– টগবগ টাট্টু

– উন্মাদ উট

– তেলানী তেলাপোকা

– হাঁপানী হাতি

-ব্প্লিবী বেড়াল

– বিদ্রোহী বাঘ

-ভাবালু ভাল্লুক

– প্রামান্য পেঁচা

-মেঘলা ময়ূর

-স্বতেজ সিংহ

– স্বাধীন শুয়োর

লতা : (অবাক হয়ে) সেকি ! এত গর্ব নিয়ে শুয়োর বলছো কেন? এইটা না গালি?

স্বাধীন শুয়োর: তাই নাকি? আমাদের দেশে অবশ্য কেউ খারাপ কাজ করলে আমরা গালি দেই ‘মানুষের বাচ্চা’ বলে।

লতা: হায় হায়! কেন?

স্বাধীন শুয়োর: কে জানে। এই রকমই করে সবাই।

জ্ঞানী গর্দ্ধভ: আমি বলি – আসলে তুমি যা, তার চেয়ে অন্যরকম কিছু যদি দেখাতে চাও, সেইটাই গালি। মানুষ কি আর শুয়োর? আর শুয়োর কি মানুষ?

লতা: (একটু ভেবে নিয়ে) বাহ! ঠিকই তো বলেছ গর্দ্ধভ। আসলেই তুমি জ্ঞানী।

তেলানী তেলাপোকা: (বিগলিত হেসে): গর্দ্ধভ ভাই সবসময় খাঁটি কথা বলেন।

চামচা চামচিকা: এই জন্যই তো আমি উনার সাথে উঠা বসা করি!

প্রামান্য পেঁচা: লতা, তবে একটা ব্যপার নিয়ে কি ভেবেছ?

ভাবালু ভাল্লুক: আরে আরে! বলো কি প্রামান্য পেঁচা! আসলে বুড়া হয়ে তুমি সব ভুলে যাইতেছ! আমি ভাবালু ভাল্লুক বসে আছি। আর তুমি ওই পিচ্চি মেয়েটার মাথা খাইতেছ?

খাদক খচ্চর: কে কি খায়? আমারে রেখে? আমি খাবো! আমি খাবো!

মেঘলা ময়ূর: উফ! কি আনরোমান্টিক! সব সময় খাওয়ার কথা। দেখো কি সুন্দর মেঘ আকাশে, কবি কবুতর! আজ কিছু শোনাবে না?

কবি কবুতর: (মাথা চুলকাতে চুলকাতে): আসলে আমি তো তারই তৈয়ারী করছিলাম, তবে তোমরা সবাই মিলে এমন হৈ চৈ শুরু করলে –

কোনঠাসা কাকাতুয়া : আমার একটা কথা ছিল…..

সবাই মিলে: (শুধু বিপ্লবী বেড়াল আর দয়ালু দোয়েল বাদে): এই চুপ চুপ!

চামচা চামচিকা: তোমার নাম দেখসো? কোনঠাসা! এক কোনে চুপ চাপ ঠেসে থাকো। তোমার কোন কথা কেউ শুনবো না।

দয়ালু দোয়েল: আহা! এমন করো কেন? (কাকাতুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে) আসো আমি তোমার কথা শুনবো।

ব্প্লিবী বেড়াল: না না! কাউকে কোনঠাসা করে রাখা যাবে না। বিপ্লবের ডাক দিতে হবে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!

বিদ্রোহী বাঘ: বলো বীর! চীর উন্নত মম শির!

উন্মাদ ঊট: হা! হা! আমি উন্মাদ! আমি উন্মাদ! আমি চিনেছি আমারে সহসা, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।

খেয়ালী খরগোশ: আমি ভাই চলি আমার আপন খেয়ালে। আমি বিপ্লব বিদ্রোহে নাই। তার চেয়ে দেখ ওই প্রান্তে একটা কি সুন্দর গর্ত! চলো সবাই দৌড়াতে দৌড়াতে ওইখানে যাই।

টগবগ টাট্টু: (টগবগিয়ে) কি দারুণ ! চলো চলো!

হাঁপানী হাতি: (হাঁপাতে হাঁপাতে) থামো থামো! খরগোশ। তুমি আর মানুষ হলা না। আর এই দিকে এই টাট্টুটাও খালি টগবগ করে সারাক্ষন। ওইখানে দৌড়াইয়া যাইতে হলে তো আমি হাঁপাতে হাঁপাতে মরে যাবো।

গায়ক গন্ডার: (গান গাবে: ওরে ভোলামন এর সুরে, বিবেকের মত) : ওরে…হাতি মন…জ্ঞানী গর্দ্ধভ কি বল্লো একটু আগে? শোন নাই? খরগোশ কেন মানুষ হবে? লতা হলো মানুষ। আমাদের বর্ণমালার দেশে, দুইটা এক জিনিষ কোথাও নাই। আমরা সবাই নিজের নিজের মত।

ক্লান্ত কাক: (হাই তুলতে তুলতে): কত রকম প্যঁচাল যে পাড়তে পারো তোমরা। কোন জানালার কার্ণিশে একটু ঝিমাইতে পারলে বাঁচি।

লতা: (এতক্ষন সবাইকে অবাক হয়ে দেখছিল)..কিন্তু

সমস্বরে: কিন্তু?

সতেজ সিংহ: (গর্জন) সব চুপ! একটা বিষয়ে ভাবা হচ্ছিল। সবাই মিলে হাঙ্গামা করে সব মাটি করে দিলা।

কর্মী কাঠবিড়ালী: সিংহ মামা রাগী হলেও, খাঁটি কথা বলছে। আসো সবাই কাজে নেমে পড়ি।

আবার সমস্বরে: কাজ টা কি?

খাদক খচ্চর: আসো খই ভাজি! কতদিন খাই না!

মেঘলা ময়ূর: আবার!

লতা: আমি বলি কাজ কি .. আসলে আমি একটা কথা ভাবতে ভাবতে কুল কিনারা পাইতেছি না।

ভবালু ভাল্লুক: তাহলে তো তুমি বিলকুল ঠিক জায়গায় এসে পড়ছো! আমরাও তোমার সাথে ভাবি।

কবি কবুতর: এক মিনিট এক মিনিট। আমি ভাল্লুক ভাই কে নিয়ে একটা কবিতা লিখছি। একটু পড়ে শোনাই সবাই কে – ‘রতনে রতন চেনে ভাল্লুক চেনে শাকালু। তিনি বড় ভাবালু। ‘

সমস্বরে: ওয়াহ! ওয়াহ! ওয়াহ!

কর্মী কাঠবেড়ালি: খালি কথা, খালি কথা! লতা তোমার প্রবলেম টা কি বলো।

লতা: কালকে ২১শে ফেব্রুয়ারী। বাসার সবাই দেখি খুব ফুর্তিতে আছে। কিন্তু হিসাব মিলতেছে না।

গানিতিক গরু: হিসাব! বলো বলো আমাকে। আমি মিলায়ে দেই।

লতা: না না গাণিতিক গরু। অংকের হিসাব না। এইটা আলাদা ব্যপার। সবার কাছে যা শুনলাম, অনেকদিন আগে মানে সেই ১৯৫২র ২১শে ফেব্রুয়ারীতে নাকি অনেক মানুষ আন্দোলন করতে করতে মারা গেছে। এই জন্য সবাই গান গায় আর বক্তৃতা দেয়। কেউ মারা গেলে গান গাইতে হয় নাকি?

ভাবালু ভাল্লুক: হুম, কঠিন সমস্যা। তো আন্দোলনটা কি ছিল?

লতা: ওইটাই তো ঠিক মতন বুঝলাম না। ‘ভাষা আন্দোলন’ বলে সবাই।

প্রামান্য পেঁচা: তুমি ৫২র ভাষা আন্দোলনের কথা বলছো? আমি তো ছিলাম ওই সময়ে। তখন কত তরুন ছিলাম, আহা!

লতা: ওমা! তুমি জানো? আমাকে বলো না শুনি!

অন্যরাও একসাথে: আমাদেরও বলো । আমরাও তো জানি না।

প্রামাণ্য পেঁচা: তাইলে বলি, আসো, ওই গাছটার তলায় বসি। (সবাই গাছের ছায়ায় গোল হয়ে বসবে)

প্রামাণ্য পেঁচা: সে অনেক অনেক দিন আগের কথা…

কোনঠাসা কাকাতুয়া: এমন ভাবে বলছো, যেন রূপকথার গল্প এটা।

ভাবালু ভাল্লুক: তা এক দিকে ভাবো যদি, রূপকথার মতই তো বলতে গেলে। এখন তো আর সেই রকম মানুষ কেউ নাই।

প্রামাণ্য পেঁচা: তখন বাংলাদেশ নামে কোন দেশ ছিল না..

লতা: (বিস্মিত হয়ে) কি বলো? বাংলাদেশ তো সব সময় ছিল।

প্রামাণ্য পেঁচা: তা ছিল। তবে তার পরিচয় লুকায়ে ছিল। সেই সময় ভারত থেকে নতুন নতুন আলাদা হয়ে পাকিস্তান নামে একটা দেশ হলো। তার আবার দুই ভাগ। পশ্চিম আর পূর্ব। পশ্চিম পাকিস্তানের লোক কথা বলতো উর্দু ভাষায় আর পূর্ব পাকিস্তানের লোক বাংলা।

লতা: জানি তো! আব্বা বলে উর্দু খুব খারাপ ভাষা। এই জন্য আমার আপাকে গজল শুনতে দেয় না।

কবি কবুতর: কিন্তু সেইটা কি করে হয়? কোন ভাষা তো খারাপ নয়।

ক্লান্ত কাক: এই ভাষা নিয়ে মানুষের লেকচার শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত।

জবরদস্ত জিরাফ: ঠিকই। লতা, তোমার আব্বা ঠিক বলেন নাই। ভাষা খারাপ না, গজল ও খারাপ না। তবে কিনা, এই ব্যপারটা ছিল অন্য।

ভাবালু ভাল্লুক: এইটা একটা জবরদস্ত ভাবের কথা বলছো জিরাফ। ভাবের মধ্যে কি যে ‘অ’ ভাব!

প্রামাণ্য পেঁচা: আহা বাকিটা শোনই না। এই দুই পাকিস্তানের মধ্যে বাংলায় কথা বলা মানুষ ছিল অনেক বেশী। কিন্তু দেশ শাসন করতো উর্দু কথা বলা লোকরা। একদিন ঘোষনা হলো, পাকিস্তানের ভাষা হিসাবে শুধু উর্দু চলবে। বাংলা না।

লতা: কিন্তু এইটা তো unfair। তাইলে বাংলা কথা বলা লোকদের তো খুব অসুবিধা হওয়ার কথা। ওরা যা না, সেই মতো থাকতে হতো তাহলে। তোমরা তো বললা সেটাই গালি।

প্রামাণ্য পেঁচা: Exactly! এটাই মনে হলো তখন অনেক ছেলেমেয়েদের, এর জন্যই তো আন্দোলন।

গায়ক গন্ডার: (গান গেয়ে উঠবে): মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রান হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে।

লতা: তখন কি হলো?

প্রামাণ্য পেঁচা: কি আর হবে। অনেক ছেলে মেয়ে মারা গেল । কারণ তারা চাইছিল, যাতে অনেক দিন পর যারা আসবে, তারা নিজেদের মত বাঁচতে পারে।

লতা: আমার খুব কান্না পাচ্ছে জানো? ওরা এত কিছু করলো, কিন্তু বেঁচেই তো নাই। আবার ভালোও লাগতেছে। ওরা এত ভালো ছিল তাই। আবার ওদের মতন হতেও ইচ্ছা হয়। আমার যা ভালো মনে হবে তাকে বাঁচাবো। যা খারাপ, তাকে বাঁধা দেব।

স্বাধীন শুয়োর: এই তো লতা বুঝেছে। এরকমই লাগার কথা এই দিনে। এইটুকুই যদি সবাই করতো, কি ভালো হতো না?

লতা: হতো তো! কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারীর কথা তো আমি কোনদিন শুনি না তেমন। শুধু একদিনই সবার ছুটি থাকে, আর সবাই এত কিছু করে। অন্যদিন কিছু করে না।

ভাবালু ভাল্লুক: তবে লতা, একটা জিনিষ ভেবে দেখলাম। এই দিনটা পালন করাও খারাপ না। কি বলো? যেমন তুমি লতা। তুমি সব সময়েই লতা থাকবা, তবে তোমার জন্মদিনটা তবুও একটা বিশেষ দিন, না? ওই রকমই ২১শে ফেব্রুয়ারী ও বলতে পারো, আমাদের নিজের মত করে বাঁচতে শেখার জন্মদিন।

সতেজ সিংহ: বাহ! সাবাশ ভাবালু ভাল্লুক। এত ভাবের কথা তো তুমি আগে বলো নাই!

প্রামাণ্য পেঁচা: একটা কথা কিন্তু এখনো বাকি রয়ে গেল লতা।

লতা: কি?

প্রামাণ্য পেঁচা: বলতো কেন আমরা তোমার কাছে এসেছি?

লতা: কেন?

বিদ্রোহী বাঘ: কারণ তুমি আমাদের বর্ণমালাকে বোরিং বলেছো! মানি না মানি না!

কবি কবুতর: বর্ণমালা, আমার দুঃখিণী বর্ণমালা

খেয়ালী খরগোশ: এই দেখ আমাদের দেশ। কি সুন্দর। আর কি রঙীন। আমাদের নিজেদের খেয়াল মতো আমরা জীবন সাজাই।

জ্ঞানী গর্দ্ধভ: আজ তোমাকেও আমাদের দেশের অংশ করে নিলাম। এবার তোমার কাছে ও বর্ণমালা আছে। একে নিজের মতন করে সাজাবে।

বিপ্লবী বেড়াল। কমরেড! সময় হয়েছে, নতুন সূর্য আনার…

কর্মী কাঠবেড়ালী: আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।

ক্লান্ত কাক: সব ক্লান্তি মুছে ফেল। এই এরকম ডানা ঝাপটিয়ে । (ডানা ঝাপটাবে) কোনঠাসা কাকাতুয়া! আসো ভাই তুমিও। সবাইকে জাগিয়ে দাও এবার..জাগো জাগো, ওঠো ওঠো….

(বলতে বলতেই সবাই স্টেজ ছাড়বে। লতা বোর্ডের পেছনে গিয়ে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাবে আবার। সেট বদল হয়ে, আবার লতার ঘর। লতিফা বানু ভেতরে আসবেন। দেখবেন লতা ঘুমিয়ে আছে চেয়ারে বসে। )

লতিফা বানু: (নিজের মনে): ইস! মেয়েটাতো বসে বসে ঘুমিয়েছে দেখি! (লতার পাশে এসে আস্তে আস্তে ঠেলা দেবে) লতা.. ওঠো ..ওঠো..

লতা: (ঘুম ঘুম চোখে) : ওঠো ওঠো , জাগো জাগো…(তারপর অবাক হয়ে চারদিকে দেখবে) ওমা! আমি তো আমার ঘরে।

লতিফা বানু: (হেসে) স্বপ্ন দেখছিলি না ? ওই দেখ প্রভাত ফেরী শুরু হয়ে গেছে, আয় দেখি।

(স্টেজের সামনে দিয়ে মিছিল যাবে। নঈম, লাবনী, রহমান সাহেব ও এসে দাঁড়াবে লতার সাথে, ব্যকগ্রাউন্ডে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ বাজবে। )

লতা: বর্ণমালা খুব ভালো!

(নঈম ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেবে, লাবনী হাত ধরবে, লতিফা বানু আর রহমান সাহেব হাসবেন। মিছিলটা স্টেজ এর সামনে দিয়ে ঘুরে উপরে উঠে আসবে, দর্শকদের সামনে দাঁড়াবে)

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বিবিধ-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

7 Responses to বর্ণমালার দেশে

  1. সামিরা বলেছেনঃ

    “অনেক অনেক দিন আগে যখন আব্বা আম্মাও জন্মায় নাই, তখন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলা নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে মারা গেছে। এইজন্য এখন এই দিনে ফাংশান হয়। আর খালি বাংলা বলতে হয়। বুঝলি কিছু?”

    ল-ম্বা নাটক! প্রথম অর্ধেক বেশি ভালো লাগলো। 😀

  2. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    পুরো থিমটা চমৎকার লাগলো আপু।
    বুকের মাঝে একটু একটু ব্যথাও বাজলো।

    আমাদের ইতিহাস নিয়ে এইরকম করে কেন আর নাটক হয় না? যেখানে বাচ্চারা নিজেরা জানতে পারবে, বুঝতে পারবে?

    চরিত্রগুলোর নাম দারুণ লেগেছে আপু।
    এত অদ্ভুত মিল প্রতিটা নামের সাথে!
    আমি রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি নামগুলো পড়তে পড়তে! 😐

  3. হাসান বলেছেনঃ

    নাটকটি অনেক ভাল লাগল।
    প্রথম দিকের দৃশ্যের ঘটনাগুলো আজকাল অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব।
    সবচেয়ে মজা লাগল স্বপ্নের পশুপাখির নামগুলো… 😀

ফিনিক্স শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।