রূপকথাঃ জাদুর দৈত্যের প্রত্যাবর্তন

[ অনেকদিন আগে রূপকথা সিরিজের প্রথম গল্প লিখা। আজ বহুদিন পর দ্বিতীয়টি লিখতে বসলাম। মনে করিয়ে দিচ্ছি, আমার রূপকথার সময়কাল অতীত নয়, ভবিষ্যৎ। ]

আলাদিনের ইচ্ছাপূরণের অনেক অনেক দিন পর আবারও ইচ্ছা পূরণ করলাম। কিন্তু আপাতত আমি একটু অবাক হয়ে আছি। দৈত্যদের অবাক হওয়াটা অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক। আচ্ছা, কী হয়েছে বলেই ফেলি।

 

সময়ের সাথে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে, আবার অনেক কিছুই বদলায়নি।

আলাদিনের ইচ্ছা পূরণের অনেকদিন পর পৃথিবীতে যখন ইচ্ছা পূরণ করতে আসি, তখন দেখি মানুষ আর আগের মত পরাধীন নেই,অনেকেই স্বাধীন।

বিধাতা এবার আমাকেও স্বাধীনতা দিয়েছেন। ইচ্ছা ৩টাই পূরণ করব, কিন্তু সেটা ৩ ভিন্ন প্রজাতির মানুষের (আমার ইচ্ছামত) ১টা ১টা করে।

আমার পাপবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পৃথিবীর কোথায় কী পরিমাণ পাপ তা দেখা যায়। খোঁজ শুরু হল। বাংলাদেশের একটা জায়গায় পাপের ঘনত্ব অনেক বেশি দেখলাম।

এত জঘন্য পাপী কে বা কারা এবং তার বা তাদের ইচ্ছা কী হতে পারে জানার কৌতূহল দমাতে পারলাম না।

ছুটলাম।

 

কয়েকজন সর্বোচচ পাপীদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিলাম। আমাকে দেখে প্রথমে সে তার পরনের কাপড় নিজের শরীরের পানি দিয়েই ধুয়ে ফেলল, তারপর জ্ঞান হারাল।

জিজ্ঞেস করলাম, “নাম কী?”

-কাদের মোল্লা।

-আমি জাদুর দৈত্য! তোর একটা ইচ্ছা পূরণ করব। বল, কী চাস?

-(এবার একটু সতর্ক হয়ে বিনয়ের সাথে) জ্বি, আমার যাতে ফাঁসি না হয় জনাব।

–মঞ্জুর!

 

কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়নি

দ্বিতীয় প্রজাতি খোঁজা শুরু হল। এবার কষ্টবীক্ষণ যন্ত্রের পালা। কী বিপদ, এবারো বাংলাদেশ!

ছুটলাম।

বুড়ো মানুষটার কয়েকটা দাঁত নেই, চেহারার মধ্যে কাঠিন্য আর কষ্ট যেন খোদাই করা, দারিদ্র্য লোকটার সব কেড়ে নিয়েছে, জীবনীশক্তিটা ছাড়া।

কারণ হল, এই প্রথমবারের মত আমাকে প্রথম দেখে কোন মানুষ ভয় পেল না।

-আমাকে দেখে ভয় পাসনি, অবাক হোসনি?

-ভয় তো ৪২ বছর আগে ফেলে দিয়ে আসছি! আর অবাক হওয়ার মত জিনিস তো এদেশে কম নাই, তুমিও কম না যদিও!

-অবাক হওয়ার মত এমন কী আছে এ দেশে যা আমার চেয়েও অবাক করা?

-কী নাই! আমার আদরের মা আর পোয়াতি বোনটারে একরাতে শেষ করছিল যে রাজাকার, যাগো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ আনলাম, ওরা আজকে দেশের মাথা! আর আমি আজকের রাজাকার! হাহাহা! হ, আমিই রাজাকার!

আমার পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানার পর তার ইচ্ছাটা শুনলাম-

“আবার হোক মুক্তিযুদ্ধ!”

 

দাবি মঞ্জুর!

 

কাদের মোল্লার ফাঁসি বন্ধ করেছি, মুক্তিযুদ্ধও শুরু করিয়ে দিয়েছি আবার।

’৭১ এ ঢাকায় শুরু হওয়া যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

২০১৩ এ ঢাকার শাহবাগ মোড়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি প্রবাসীরাও সাহায্য করে ঠিক ’৭১ এর মত।

আর শত্রুও পরিবর্তন হয়নি। ১৯৭১ আর ২০১৩- একই শত্রু দুই সময়েই।

 

ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ বয়স নির্বিশেষে সব মানুষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল একাত্তরে “জয় বাংলা” শ্লোগানে। ২০১৩ তেও তাই হল। প্রেরণা আর সংবাদের যোগান দিয়েছে ফেসবুক আর ব্লগ। বেতারের জায়গাটা ভালোভাবেই এরা পূরণ করেছে। কীসের যেন নেশায় সবাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, সেই ৪২ বছর আগের মত।

জ্বলে উঠল শাহবাগ, ঢাকা শহর, তার থেকে পুরো বাংলাদেশ!

আবার মুক্তিযুদ্ধ

ইচ্ছেপূরণ ঠিকভাবে করতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে, যার যা আছে তাই নিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে,কেউ ময়দানে, কেউ সমর্থনে, প্রচারে, কেউবা প্রেরণা দিতে।

 

শক্তিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে খোঁজ লাগালাম, বিধি বাম।

এবারও বাংলাদেশ এবং এটা আমার পূরণ করা দ্বিতীয় ইচ্ছার ফসল, শাহবাগ থেকে আসছে। প্রচণ্ড শক্তি।ঠিক করলাম, সবচেয়ে তীব্রতর শক্তিকে খুঁজে বের করব। করলাম এবং দৈত্য হয়েও, অবাক হলাম কিছুটা।

 

হাড্ডিসার একটা ছোট্ট ছেলে, শাহবাগের ময়দানে থাকে এখন প্রতি মুহূর্ত, গলা ভেঙে গিয়েছে শ্লোগান দিতে দিতে। তাও তার বিকার নেই। থামানো যাচ্ছে না তাকে। লাল লাল নির্ঘুম চোখে আমাকে দেখছিল।

 

পরিচয় দিয়ে অভয় দেওয়ার আগেই দেখলাম আমাকে চিনে ফেলেছে! বুঝলাম, কেউ তাকে গল্প শুনিয়েছে।

ইচ্ছা কেবল ১টা পূরণ করতে পারবে শুনে কিছুটা আশাহত মনে হলেও, চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল পরমুহূর্তে।

-১টাই পূরণ হইব তো?কসম?

-হ্যা,বল, কী ইচ্ছা তোর!

-কাদের মোল্লা আর সবকয়টা রাজাকাররে শাহবাগে আইনা দেন।

পরের কাহিনী সংক্ষিপ্ত। বাংলাদেশের ইন্টেলিজেন্সে মাথামোটা কিছু স্পাই(!) কে সরিয়ে কিছু দেশপ্রেমিক আর যোগ্য লোক ঢুকিয়ে দিই। এরাই গোপন মিশনে রাজাকারদের বের করে এক এক করে শাহবাগে নিয়ে আসে।

 

ইচ্ছাপূরণ তো হল, আমার কাজ শেষ। চলে যাবার আগে একটা জিনিস আবারও অবাক করল আমাকে। এই কাদের মোল্লা লোকটা কি রমনা পার্কের কুকুরদের খুব ভালোবাসত?নাহলে ও ওই ইচ্ছাটা করল কেন?ওর ফাঁসি না দেওয়াতেই তো ওর মাংস আর হাড়গুলো আলাদা আলাদা করে শাহবাগ থেকে রমনা পার্কের কুকুরদের বিলিয়ে দেওয়ার কাজটা করতে পেরেছিল এদেশের মানুষ।

 

এবার বুঝলেন তো অবাক হওয়ার কাহিনী?

ঘুম দেওয়ার আগে দেশপ্রেমবীক্ষণ যন্ত্রটা একটু যাচাই করে দেখি এবার।

পৃথিবীটা সম্ভবত অনেক বদলে গিয়েছে, নাহলে আমিই হয়ত স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ।

আবারও বাংলাদেশ!!

😯 😯 😯

নাহ, আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

“জয় বাংলা” শুনতে ভালোই লাগে!

জয় বাংলা

-ই.বি.

৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, রাত ৩:৩০

 

ইতস্তত বিপ্লবী সম্পর্কে

যদি কখনো আমায় মনে পড়ে যায়,খোলো দুয়ার আকাশের-আমি তারাময়!
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প, সাহিত্য-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

8 Responses to রূপকথাঃ জাদুর দৈত্যের প্রত্যাবর্তন

  1. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    শাহবাগের ছবিটা দারুণ আসছে! 😀

    শেষটা যদি এরকম সত্যি সত্যি হতো! :thinking:

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    ফরম্যাটিং এ মনোযোগী হতে হবে।
    স্বপ্নটা এখন আমাদের সবার

  3. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    দারুণ গল্প। তৃতীয় ইচ্ছাটা চরম আবেগী করে দেয়। তবে আমার মনে হয়, মানুষের দরকার নেই, রমনার সারমেয় গুলোই ঐ কাজ সারবে ভালভাবে।

    প্রথম ইচ্ছাটার ক্ষেত্রে এই প্রদীপের দৈত্যের পরিচয় নিয়ে বেশ চিন্তিত। এদের কাছ থেকে জাতি নিষ্কৃতি চায়।

    আর দ্বিতীয়টা দৈত্যের অবদান বলে স্বীকার করবো না। চরম বাস্তবতার মুখোমুখি এক জাতি যেভাবে রুখে দিয়েছিল জগতের সেরা সেনাবাহিনীকে, আজ জাতি তেমনই এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। সময়ের প্রয়োজনে এ জাতি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। দ্বিতীয় দৈত্য, এ জাতি নিজেই।

জ্ঞানচোর শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।