“যখন সে পৌঁছল ২৩ বছর বয়সে”: মহাকবি জন মিল্টন

“On His Being Arrived to the Age of Twenty-Three” কবিতাটি মহাকবি মিল্টনের লেখা সপ্তম সনেট, যেখানে কবি তুলে এনেছেন ২৩ বছর বয়সের মানসিক দ্বিধা, সমস্যা, দ্রুত সময় চলে যাওয়ার হতাশা, সাথে প্রচন্ড কর্মব্যস্ততা, তবু সবকিছুতে সমন্বয়হীনতা এবং অবশেষে সম্ভাবনা ও স্রষ্টার ওপর নির্ভর্শীলতার কথা। কবিতার থিম অনেকটাই মিলে যায় এই বয়সের অধিকাংশ তরুনের সাথে। এজন্যই এই অনুবাদ-প্রচেষ্টা।

জন মিল্টন (John Milton) ইংরেজী সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী কবি; যিনি একাধারে লিখেছেন- গদ্য ও কবিতা; কবিতার মধ্যে আছে- শোকগাথা, মহাকাব্য, ছন্দনাটক, সনেট, পল্লীগাথা ও আরো নানারকম পদ্য।  তার সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালোত্তীর্ণ  ‍সৃষ্টি হল “Paradise Lost”  মহাকাব্যটি, যেটি সেই মিল্টনের সময় থেকে আজ অবধি ইংরেজ সাহিত্য-সমালোচনার কেন্দ্রেই রয়ে গেছে।

মিল্টনের “On His Being Arrived to the Age of Twenty-Three”  কবিতাটির রচনাকাল ১৬৩১ সাল। ১৫৭৬ থেকে ১৬৪২ সালকে বলা হয় ইংরেজ কবিতা, নাটক ও থিয়েটারের স্বর্ণযুগ; যদিও ইতিহাস থেকে জানা যায় সেই যুগের মানুষগুলোর জন্য সময়টা মোটেই সোনালী ছিলনা!!

এই সনেটটি লেখা হয়েছে চিরাচরিত ১৪ লাইনের গন্ডিতেই; প্রধান দু’টি অংশে বিভক্ত,  আট লাইনের অষ্টক এবং ছয় লাইনের ষষ্ঠক। অষ্টকের ছন্দরূপ- কখ খক কখখক; ষষ্ঠকের ছন্দ- গঘ গঘ ঙঙ। কবিতার ভাষান্তর বা অনুবাদ এমনিই অনেক দুরূহ কাজ, তার ওপর সেটা যদি হয় এমন বিখ্যাত কবির বিখ্যাত কবিতা তাহলে সেটা দুঃসাহস কিংবা ধৃষ্টতার পর্যায়েও পড়ে! তাই আমি কবিতার মানহানির অভিযোগ আসার পূর্বেই পরলোকগত কবি ও বর্তমান পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

কবিতার অনুবাদ:

“যখন সে পৌঁছল ২৩ বছর বয়সে”

যৌবনের ধূর্ত চোরের মত সময় যেন কত দ্রুতই
তার ডানায় করে নিয়ে গেছে আমার জীবনের ২৩ টি বছর।

প্রচন্ড ব্যস্ততার দিনগুলো আমার কেটে যাচ্ছে পূর্ণ কর্মদ্দীপনায়
কিন্তু আমার শেষ বসন্তে দেখা যাচ্ছে না কোন কুঁড়ি কিংবা পুষ্প।

সম্ভবত আমার বাহ্যিকতাই সত্যটিকে আড়াল করে রেখেছে যে
আমি (মানসিকভাবে) পূর্ণ-পৌরুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি
এবং ভেতরের পরিপক্কতা (বা প্রতিভা) তবু যেন প্রকাশ পাচ্ছে ধীরে।
যা হয়ত (এই বয়সেই) পেয়ে গিয়েছে কিছু বেশি সময়োপযোগী-সুখী আত্মার।

                      কিন্তু (সেই প্রতিভা) কম হোক বেশী হোক, দ্রুত কিংবা ধীরে হোক
তা সবচেয়ে যথার্থভাবেই সঠিক পরিমাপে প্রকাশ পাবে একদিন।

মাঝারি কিংবা উঁচু মানের যেমনই হোক, সেই ভাগ্য ফলবেই একদিন।
সময় আমাকে যেদিকেই নিয়ে যাক, সবই যেন স্বর্গের ইচ্ছা ।

যতটুকু করুনা করা হয় সবকিছু যেন ঠিক ততটুকুই ঘটে,
এবং তা চিরদিন-ই ঘটে আমার মহান কর্ম বিধায়কের চোখের সামনে।

পাঠকের সুবিধার্থে কবিতাটির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা না করে পারছিনা।

সনেটটি মিল্টনের ২৩ বছর বয়সের অনুভূতি ও ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবেই লেখা। এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে- জীবনের এই বয়সের সময়গুলো চলে যায় সবচেয়ে দ্রুত, তখন তাড়া থাকে প্রচলিত রীতিতে ভাল ক্যরিয়ার তৈরীতে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবার, যেখানে অবহেলিত হয় মনের মত বা সৃজনশীল কিছু করার স্বপ্ন। ব্যক্তিগত জীবনে সেই বয়সে বাবার নির্ধারণ করে দেয়া জীবনের প্ল্যানকে নিজের প্রতিভার বিকাশের পথে বাঁধা হিসেবে দেখেন মিল্টন। তিনি পড়াশুনা করছেন ক্যামব্রীজ-এ, কিন্তু তিনি কোনভাবেই সময় দিতে পারছেন না নিজের মনে লুকায়িত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে। মিল্টন ততদিনে ভাল করেই বুঝতে পেরেছে যে সে একজন গুণী কবি, কিন্তু কবিতা লেখার পরিবর্তে সে করছে পড়াশোনা! ফলে কবির মনে তৈরী হয় দ্বিধা ও বেড়ে যায় দুশ্চিন্তা। তার মনে হতে থাকে সে অত্যন্ত মূল্যবাণ সময় নষ্ট করছে অযথাই।

কবিতার প্রথম দুই লাইনে কবি সময়কে তুলনা করেছেন উড়ন্ত পাখির সাথে যে তার ডানায় করে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে কবির যৌবনের সময়গুলো।
তৃতীয় লাইনে দেখিয়েছেন কিভাবে দ্রুত চলে যাচ্ছে সে সময়- ‘ব্যস্ততা’ ও ‘কর্মদ্দীপনায়’ ভরপুর।

চতুর্থ লাইনে আমরা দেখতে পাই কিছুটা হতাশা। তার ২৩ বছর বয়সটিকে তিনি তুলনা করেছেন ‘শেষ বসন্তের’ সাথে, অথচ যেখানে এখনও মেলেনি কোন ‘কুঁড়ি কিংবা পুষ্পের’ দেখা। অর্থাৎ জীবনের এতগুলো বছর চলে গেল অথচ তিনি তেমন কোন অর্জন বা সাফল্যের মুখ দেখলেন না এখনও !

পঞ্চম ও ষষ্ঠ লাইনে আমরা দেখতে পাই কবির অভিযোগ কিংবা আফসোস। তার বয়স যেন তার মানসিক উৎকর্ষতাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বাস্তবিক পক্ষে সে কতটা পরিপূর্ণ পুরুষ হতে পেরেছে সে ব্যাপারে তার চেহারা বা বাহ্যিকতা সত্যকে ধোঁকা দিচ্ছে।
সপ্তম-অষ্টম লাইনে কবির ভাবনা- তার বাহ্যিক অবয়ব ও বয়স তাকে আরো যেভাবে ধোঁকা দিচ্ছে তা হল তার মানসিক তথা তার ভেতরের পরিপক্কতা যেন প্রয়োজনের তুলনায় ধীরে হচ্ছে, যা হয়ত এই বয়সেরই কারো কারো মাঝে চলে এসছে ইতোমধ্যে। তার সবকিছু জয় করার বয়স এইটাই, তবু যেন কোথায় আটকে আছে সব!!
অষ্টকের সারমর্ম হিসেবে আমরা দেখতে পাই- কবির অভিযোগ যে বাহ্যিকভাবে সে পরিপক্ক (matured) হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আত্নিক উৎকর্ষতা যেন তার সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠেনি।
তবু যত যাই হোক, কবির প্রতিভা “কম হোক বেশি হোক” সে তার জীবনের লক্ষ্যের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
জয় আসবেই।
অতপর একটি ‘কিন্তু’-র মাধ্যমে কবি প্রবেশ করেন অষ্টক থেকে ষষ্ঠকে।

সনেটের ষষ্ঠকে কবি স্বীকার করে নেন “ধীরে কিংবা দ্রুত” যেভাবেই হোক সময় তাকে স্রষ্টার কাছেই পৌঁছে দেবে। ফলে সময়ের এমন নির্দয়ভাবে চলে যাওয়া যদিও বেদনার তবু প্রকৃতি তথা স্রষ্টার পরিকল্পনার কাছে আমরা সবাই বন্দি। এজন্যই কবি তার বেদনা ও দুশ্চিন্তার একটা সমাধান হিসেবে তার ভবিষ্যৎকে স্রষ্টার ইচ্ছার কাছে সমর্পন করেই যেন সস্তি পেতে চান।

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

মূল ইংরেজী (তথা ল্যাটিন) কবিতাটি নিম্নরূপ-

On His Being Arrived to the Age of Twenty-Three
John Milton. (1608–1674).  

HOW soon hath Time, the subtle thief of youth,

  Stolen on his wing my three and twentieth year!

  My hasting days fly on with full career,

  But my late spring no bud or blossom shew’th.

Perhaps my semblance might deceive the truth,

That I to manhood am arrived so near,

  And inward ripeness doth much less appear,

  That some more timely-happy spirits indu’th.

Yet be it less or more, or soon or slow,

  It shall be still in strictest measure even

  To that same lot, however mean or high,

Toward which Time leads me, and the will of Heaven,

  All is, if I have grace to use it so,

  As ever in my great Task-master’s eye.

 

 

হাসান আল বান্না সম্পর্কে

নিজের সম্পর্কে এখনো উল্লেখযোগ্য কিছু জানতে পারিনি। তবে চেষ্টা চলছে জানার। চেষ্টা চলছে সবরকম বিলাসিতার সাথে; কর্মবিলাস, ভ্রান্তিবিলাস, দুঃখবিলাস, স্বপ্নবিলাস . . . https://www.facebook.com/hasan.bmbdu
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অনুপ্রেরণা, অনুবাদ, কবিতা-এ এবং ট্যাগ হয়েছে স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

7 Responses to “যখন সে পৌঁছল ২৩ বছর বয়সে”: মহাকবি জন মিল্টন

  1. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    আয় হায়। এই অনুবাদ চোখ এড়িয়ে গেল।
    পরে বড় মন্তব্য করবো। ভাল লাগলো।

  2. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    অনুবাদ খারাপ হয় নাই কিন্তু!! কবিতাটা বেশ…ভেবে দেখার মত অনেক বিষয় আছে সবার জন্যই।

    আরও লিখবেন আশা করি। 🙂

    • হাসান বলেছেনঃ

      অনুবাদ কেমন হয়েছে তা নিয়ে আমি সত্যি চিন্তিত ছিলাম, :thinking:
      যথাসম্ভব মূলভাব ঠিক রাখার চেষ্টা করেছি।
      মূল্যায়নের জন্য অনেক ধন্যবাদ 😀

  3. ইমাদ বলেছেনঃ

    আমার নিজের সাথে অনেক বেশী মিলে গেলো।
    কেমন জানি একটু বিষাদ এর মত লাগছে।

    🙁

  4. ইম বলেছেনঃ

    সুন্দর প্রচেষ্টা

জ্ঞানচোর শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।