আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়…

আমার মন খারাপ করা অনুভূতিগুলো বোধ হয় রোজ আটকে থাকে কোন হলদে খামে। আমি রোজ সারাদিনের কাজ শেষ করে মন খারাপের হলদে খামটা ব্যাগে পুরে বাড়ি ফেরার পথ ধরি। অফিস থেকে অল্প কিছু হাঁটাপথ, একটা লম্বা বাঁকানো রেল লাইন, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছ আর আমার একলা থাকা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমার বাড়ি ফেরার পথটুকু সব সময়ই আমার ভীষণ আপন মনে হয়। আমার বাড়ি ফিরতে ফিরতে রোজ রাত নেমে আসে।

“রাত নেমে আসে” কথাটার মাঝে কেমন যেন এক ধরণের ছোট্ট বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে। যখনি রাত নেমে আসে আমার মনের ভেতরের একটা দুটো কষ্ট জোনাকপোকার মত জেগে ওঠে। জোনাকপোকার মতই সেই কষ্টগুলো মিটমিট করে জ্বলে, নেভে আবার কখনো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এই পৃথিবীতে মনে হয় দুঃখবিলাসি মানুষদের মাঝে কোন না মিল আছে, আছে কোন এক নাম না জানা অদ্ভুত সম্পর্ক তাই তো যখন প্রথম শুনেছিলাম “জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!” তখন ভীষণরকম চমকে গিয়েছিলাম। স্তব্ধ হয়ে ভেবেছিলাম
কীভাবে কেউ ঠিক ঠিক এমন একটি লাইন লিখে গেছে যে লাইনটি পড়ে আমার মনে হয়েছে যেন বা আমার মনের কথাটিই লেখা। যেন আমার মত করেই কেউ আমাকে বলছে, হ্যাঁ তুমি একা… ভীষণ একা। এ জীবনে আমার অজস্রবার মনে হয়েছে একা থাকার মাঝে কেমন যেন একটা রাজ্য জয় করার মত ব্যাপার আছে। ওই বিশাল উদার আকাশ, সেও যে একা। আকাশের চাঁদটা বড্ড একা, একা মূলত আমরা সবাই। সবার মাঝে থেকেও কেউ একা, কেউবা আবার একা থেকেও একা নয়। কিছুদিন আগে কোথায় যেন পড়েছিলাম একজন মানুষ যত বেশী সফল সে তত বেশী একা, মুখবইতে যে মানুষটির বন্ধুলিস্ট যত লম্বা তার জীবনে বন্ধু ততই কম। যাই হোক একা থাকার হিসেবখাতা আসলে খুলে বসি নি। শুধু আজ ভাবতে বসেছি আমার জীবনের আনাচে কানাচে কতটা মিশে আছে কিছু কবিতা। যে কবিতাগুলো ছাড়াই কিশোরীবেলা কাটিয়েছি, জীবন বাবুর কবিতায় দিন রাত ভুলে বুঁদ হয়ে থাকা সেই আমিই একদিন আচমকা আবিস্কার করেছি অন্য মাদকতার নাম হচ্ছে “আবুল হাসান”। মজার

মজার ব্যাপার হল, আবুল হাসানের কবিতার লাইন প্রথম পড়েছিলাম সামহোয়ারইনে ব্লগিং করার সময়। সুষম নামের এক বন্ধুর প্রোফাইলে লেখা ছিলো “সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র, মায়াবী করুণ” লাইনদুটো ভালো লেগেছিলো বেশ। তারপরও কেন যেন আবুল হাসানের খোঁজ পুরোপুরি পাই নি। গত বছর প্রায় এই সময়ের কাছাকাছি এক দুর্দান্ত কবিতাপ্রেমী বন্ধুর কাছ থেকে একটু একটু করে চিনে নিলাম আবুল হাসানকে। তারপর…তারপর শুধুই মুগ্ধতা। একটু একটু করে বুঁদ হয়ে যাওয়া তাঁর কবিতায়।

এ একটা আশ্চর্য বোধ! আমি আবুল হাসানের কবিতা পড়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছি। আমি কারণে অকারণে আবুল হাসানের কবিতার লাইন বিড়বিড় করেছি। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বলেছি- ‘আমার, আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়’ সাত সকালে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি, “শিমুল ফুলের কাছে শিশির আনতে গেছে সমস্ত সকাল” নিজেকে বলেছি, “প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে, মনেও রাখবে না, আমি কে ছিলাম, কী ছিলাম –কেন আমি?” কিংবা প্রিয় মানুষকে উপহার দিয়ে তাতে লিখে দিয়েছি-

‘চলে গেলে- তবু কিছু থাকবে আমার,
আমি রেখে যাবো আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি।
ফিরে যাবো সংগোপনে, জানবে না, চিনবে না কেউ’

আবুল হাসানের কবিতাগুলো আমার সাদামাটা জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। শরৎকালের পেঁজা তুলোর মত মেঘ হয়ে আমার মনের আকাশকে ঢেকে দিয়েছে। এখন অনুভব করতে পারি যে, বাংলা কবিতা পাঠকের ‘আবুল হাসান’কে এড়িয়ে যাবার পথ নেই। সত্যিই উপায় নেই। আবুল হাসান শুধু আবুল হাসানই!

আবুল হাসানকে নিয়ে কিছু কথাঃ

কবি ও সাংবাদিক আবুল হাসান ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। তাঁর পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা আলতাফ হোসেন মিয়া ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। তাঁর প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, আর সাহিত্যক নাম আবুল হাসান।

আবুল হাসান ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বি.এ শ্রেণীতে ভর্তি হন, কিন্তু পরীক্ষা শেষ না করেই ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তাবিভাগে যোগদান করেন। পরে তিনি গণবাংলা (১৯৭২-১৯৭৩) এবং দৈনিক জনপদ-এ (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আবুল হাসান অল্প বয়সেই একজন সৃজনশীল কবি হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন। মাত্র এক দশকের কাব্যসাধনায় তিনি আধুনিক বাংলার ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। আত্মত্যাগ, দুঃখবোধ, মৃত্যুচেতনা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবুল হাসানের কবিতায় সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে: রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪) ও পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫)৷ মৃত্যুর পর কাব্যনাট্য ওরা কয়েকজন (১৯৮৮) ও আবুল হাসান গল্প- সংগ্রহ (১৯৯০) প্রকাশিত হয়। তিনি কবিতার জন্য মরণোত্তর ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ (১৯৭৫) এবং বাংলাদেশ সরকারের ‘একুশে পদক’ (১৯৮২) লাভ করেন।
১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

আবুল হাসানের কিছু অসাধারণ কবিতাঃ


একসময় ইচ্ছে জাগে, এভাবেই

একসময় ইচ্ছে জাগে, মেষপালকের বেশে ঘুরিফিরি;
অরণ্যের অন্ধকার আদিম সর্দার সেজে মহুয়ার মাটির বোতল
ভেঙ্গে উপজাতি রমণীর বল্কল বসন খুলে জ্যোৎস্নায় হাঁটু গেড়ে বসি-
আর তারস্বরে বলে উঠি নারী, আমি মহুয়া বনের এই
সুন্দর সন্ধ্যায় পাপী, তোমার নিকটে নত, আজ কোথাও লুকানো কোনো
কোমলতা নেই, তাই তোমার চোখের নীচে তোমার ভ্রুর নীচে
তোমার তৃষ্ণার নীচে
এই ভাবে লুকিয়েছি পিপাসায় আকণ্ঠ উন্মাদ আমি
ক্ষোভে ও ঈর্ষায় সেই নগরীর গুপ্তঘাতক আজ পলাতক, খুনী
আমি প্রেমিককে পরাজিত করে হীন দস্যুর মতোন
খুনীকে খুনীর পাশে রেখে এখানে এসেছি, তুমি
আমাকে বলো না আর ফিরে যেতে, যেখানে কেবলি পাপ, পরাজয়
পণ্যের চাহিদা, লোভ, তিরীক্ষু-মানুষ- যারা কোজাগরী ছুরি
বৃষ্টির হল্লায় ধুয়ে প্রতি শনিবারে যায় মদ্যশালায়, যারা
তমসায় একফোঁটা আলোও এখন আর উত্তোলন করতে জানে না।
আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে কেবলি যাদের রক্ত, রাত্রিবেলা আমি আজ
তোমার তৃষ্ণার নীচে নিভৃতের জ্যোৎস্নায় হাঁটু গেড়ে বসেছি আদিম আজ
এখন আমার কোন পাপ নেই, পরাজয় নেই।
একসময় ইচ্ছে জাগে, এভাবেই অরণ্যে অরণ্যে ঘুরে যদি দিন যেতো।


এখন আমার

আমার এখন নিজের কাছে নিজের ছায়া খারাপ লাগে
…রাত্রিবেলা ট্রেনের বাঁশি শুনতে আমার খারাপ লাগে
জামার বোতাম আটকাতে কি লাগে, কষ্ট লাগে
তুমি আমার জামার বোতাম অমন কেনো যত্ন করে
লাগিয়ে দিতে?
অমন কেন শরীর থেকে অস্তে আমার
ক্লান্তিগুলি উঠিয়ে নিতে?
তোমার বুকের নিশীথ কুসুম আমার মুখে ছড়িয়ে দিতে?
জুতোর ফিতে প্রজাপতির মতোন তুমি উড়িয়ে দিতে?
বেলজিয়ামের আয়নাখানি কেন তুমি ঘরে না রেখে
অমন কারুকাজের সাথে তোমার দুটি চোখের মধ্যে
রেখে দিতে?
আমার এখন চাঁদ দেখলে খারাপ লাগে
পাখির জুলুম, মেঘের জুলুম, খারাপ লাগে
কথাবর্তায় দয়ালু আর পোশাকে বেশ ভদ্র মানুষ
খারাপ লাগে,
এই যে মানুষ মুখে একটা মনে একটা. . .
খারাপ লাগে
খারাপ লাগে
মোটের উপর, আমি অনেক কষ্টে আছি.. কষ্টে আছি বুজলে যুথী
আমার দাঁতে, আমার নাকে, আমার চোখে কষ্ট ভীসন
চতুর দিকে দাবি আদায় করার মত মিছিল তাদের কষ্ট ভীষণ বুজলে যুথী
হাসি খুসি উড়নচন্ডি মানুষ এখন তাইতো এখন খারাপ লাগে, খারাপ লাগে
আরে তাছাড়া, আমি কি আরে যিশু নাকি- হাবিজাবী ওদের মতন সবসহিষ্ণু
আমি অনেক কষ্টে আছি
কষ্টে আছি, কষ্টে আছি
আমি অনেক কষ্টে আছি
কষ্টে আছি, কষ্টে আছি |


একলা বাতাস

নোখের ভিতর নষ্ট ময়লা,
চোখের ভিতর প্রেম,
চুলের কাছে ফেরার বাতাস
দেখেই শুধালেম,
এখন তুমি কোথায় যাবে?
কোন আঘাটার জল ঘোলাবে?
কোন আগুনের স্পর্শ নেবে
রক্তে কি প্রব্লেম?
হঠাৎ তাহার ছায়ায় আমি যেদিকে তাকালেম
তাহার শরীর মাড়িয়ে দিয়ে
দিগন্তে দুইচক্ষু নিয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে আমি আমাকে শুধালেম
এখন তুমি কোথায় যাবে?
কোন আঘাটার জল ঘোলাবে?
কোন আগুনের স্পর্শ নেবে
রক্তে কি প্রব্লেম?


অপরূপ বাগান

চলে গেলে- তবু কিছু থাকবে আমার : আমি রেখে যাবো
আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি।
জল নেমে গেলে ডাঙ্গা ধরে রাখে খড়কুটো, শালুকের ফুল :
নদীর প্রবাহপলি, হয়তো জন্মের বীজ, অলঙ্কার- অনড় শামুক !
তুমি নেমে গেলে এই বক্ষতলে সমস্ত কি সত্যিই ফুরোবে ?
মুখের ভিতরে এই মলিন দাঁতের পংক্তি- তা হলে এ চোখ
মাথার খুলির নীচে নরোম নির্জন এক অবিনাশী ফুল :
আমার আঙ্গুলগুলি, আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি, অভিলাষগুলি ?
জানি কিছু চিরকাল ভাস্বর উজ্জ্বল থাকে, চির অমলিন !
তুমি চলে গেলে তবু থাকবে আমার তুমি, চিরায়ত তুমি !
অনুপস্থিতি হবে আমার একলা ঘর, আমার বসতি !
ফিরে যাবো সংগোপনে, জানবে না, চিনবে না কেউ;
উঠানে জন্মাবো কিছু হাহাকার, অনিদ্রার গান-
আর লোকে দেখে ভাববে- বিরহবাগান ঐ উঠানে তো বেশ মানিয়েছে !


তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাবো, তোমার ভিতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন,
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ’ শুদ্ধ হবো
কালিমা রাখবো না!
এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাবো; তোমার পায়ের নীচে পাহাড় আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই স্নান কর
পাথর সরিয়ে আমি ঝর্ণার প্রথম জলে স্নান করবো
কালিমা রাখবো না!
এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
এখন তোমার কাছে যাবো
তোমার ভিতরে এক সাবলীল শুশ্রূষা আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই ক্ষত মোছ আকাশে তাকা–
আমি ক্ষত মুছে ফেলবো আকাশে তাকাবো
আমি আঁধার রাখবো না!
এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
যে সকল মৌমাছি, নেবুফুল গাভীর দুধের সাদা
হেলেঞ্চা শাকের ক্ষেত
যে রাখাল আমি আজ কোথাও দেখি না– তোমার চিবুকে
তারা নিশ্চয়ই আছেন!
তোমার চিবুকে সেই গাভীর দুধের শাদা, সুবর্ণ রাখাল
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই কাছে আয় তৃণভূমি
কাছে আয় পুরনো রাখাল!
আমি কাছে যাবো আমি তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না!


বৃষ্টি চিহ্নিত ভালোবাসা

মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল ?
একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল
আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো
উৎপাত শুরু করে দিয়েছিল তারা;
ছোট-খাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায়-পাড়ায়
জুড়ে দিয়েছিল অথই শ্লোগান।
তবু কেউ আমাদের কাদা ভেঙে যাইনি মিটিং-এ
থিয়েটার পণ্ড হলো, এ বৃষ্টিতে সভা আর
তাসের আড্ডার লোক ফিরে এলো ঘরে;
ব্যবসার হলো ক্ষতি দারুণ দুর্দশা,
সারাদিন অমুক নিপাত যাক, অমুক জিন্দাবাদ
অমুকের ধ্বংস চাই বলে আর হাবিজাবি হলোনা পাড়াটা।
ভদ্রশান্ত কেবল কয়েকটি গাছ বেফাঁস নারীর মতো
চুল ঝাড়ানো আঙ্গিনায় হঠাৎ বাতাসে আর
পাশের বাড়ীতে কোনো হারমোনিয়ামে শুধু উঠতি এক আগ্রহী গায়িকা
স্বরচিত মেঘমালা গাইলো তিনবার !
আর ক’টি চা’খোর মানুষ এলো
রেনকোট গায়ে চেপে চায়ের দোকানে;
তাদের স্বভাবসিদ্ধ গলা থেকে শোনা গেল :
কী করি বলুন দেখি, দাঁত পড়ে যাচ্ছে তবু মাইনেটা বাড়ছেনা,
ডাক্তারের কাছে যাই তবু শুধু বাড়ছেই ক্রমাগত বাড়ছেই
হৃদরোগ, চোখের অসুখ !
একজন বেরসিক রোগী গলা কাশলো :
ওহে ছোকরা, নুন চায়ে এক টুকরো বেশী লেবু দিও।
তাদের বিভিন্ন সব জীবনের খুঁটিনাটি দুঃখবোধ সমস্যায় তবু
সেদিন বৃষ্টিতে কিছু আসে যায়নি আমাদের
কেননা সেদিন সারাদিন বৃষ্টি পড়েছিল,
সারাদিন আকাশের অন্ধকার বর্ষণের সানুনয় অনুরোধে
আমাদের পাশাপাশি শুয়ে থাকতে হয়েছিল সারাদিন
আমাদের হৃদয়ে অক্ষরভরা উপন্যাস পড়তে হয়েছিল !


বনভূমিকে বলো

বনভূমিকে বলো, বনভূমি, অইখানে একটি মানুষ
লম্বালম্বি শুয়ে আছে, অসুস্থ মানুষ
হেমন্তে হলুদ পাতা যেরকম ঝরে যায়,
ও এখন সে রকম ঝরে যাবে, ওর চুল, ওর চোখ
ওর নখ, অমল আঙুল সব ঝরে যাবে,
বনভূমিকে বলো, বনভূমি অইখানে একটি মানুষ
লম্বালম্বি শুয়ে আছে, অসুস্থ মানুষ
ও এখন নদীর জলের স্রোতে ভেসে যেতে চায়
ও এখন মাটি হতে চায়, শুধু মাটি
চকের গুঁড়োর মতো ঘরে ফিরে যেতে চায়,
বনভূমিকে বলো, বনভূমি ওকে আর শুইয়ে রেখো না !
ওকে ঘরে ফিরে যেতে দাও। যে যাবার
সে চলে যাক, তাকে আর বসিয়ে রেখো না।


বদলে যাও, কিছুটা বদলাও

কিছুটা বদলাতে হবে বাঁশী
কিছুটা বদলাতে হবে সুর
সাতটি ছিদ্রের সূর্য; সময়ের গাঢ় অন্তঃপুর
কিছুটা বদলাতে হবে
মাটির কনুই , ভাঁজ
রক্তমাখা দুঃখের সমাজ কিছুটা বদলাতে হবে…
বদলে দাও, তুমি বদলাও
নইলে এক্ষুনি
ঢুকে পড়বে পাঁচজন বদমাশ খুনী ,
যখোন যেখানে পাবে
মেরে রেখে যাবে,
তোমার সংসার, বাঁশী, আঘাটার নাও ।
বদলে যাও, বদলে যাও, কিছুটা বদলাও !


পাখি হয়ে যায় প্রাণ

অবশেষে জেনেছি মানুষ একা !
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা !
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।
ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের
মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেনো আমি
চলে যাই আজো সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে,
যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে
জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর !
মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা
নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর
হরিকীর্তনের নদীভূত বোল !
বড় ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রা গান শুনে,
সাইকেল বেজে উঠতো ফেলে আসা শব্দে যখোন,
নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেনো শব্দে কান পেতে রেখে :
কেউ বলে যাচ্ছে যেনো,
বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন ?
পিঠে অই সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছো ?
আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে দুলাভাই !
ছোটবোন ঘরে বসে কেন যেনো তখন কেমন
পানের পাতার মতো নমনীয় হতো ক্রমে ক্রমে !
আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে !
দীঘিতে ভাসতো ঘনমেঘ, জল নিতে এসে
মেঘ হয়ে যেতো লীলা বৌদি সেই গোধূলি বেলায়,
পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম
এমন দিনে কি ওরে বলা যায়- ?
স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে
সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট,
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে কোরে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট !
একে একে নদীর ধারার মতো তার বহুদূরে গত !
বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো
সবার গোচরহীন আছি আজো সুদূর সন্ধানী !
দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান !
পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত !

১০
ঝিনুক নীরবে সহো –

ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো,
ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!

১১
যুগলসন্ধি

ছেলেটি খোঁড়েনি মাটিতে মধুর জল!
মেয়েটি কখনো পরে নাই নাকছবি।
ছেলেটি তবুও গায় জীবনের গান,
মেয়েটিকে দেখি একাকী আত্মহারা!
ছেলেটির চোখে দুর্ভিক্ষের দাহ,
মেয়েটির মুখে কতো মায়া মৌনতা;
কতো যুগ যায়, কতো শতাব্দী যায়!
কতো যুগ ধরে কতো না সে বলীদান!
ছেলেটি খোঁড়েনি মাটিতে মধুর জল,
মেয়েটি দেখেনি কখনো বকুল ফুল।
ছেলেটি তবুও প্রকৃতির-প্রতিনিধি;
মেয়েটি আবেগে উষ্ণ বকুল তলা!
ছেলেটি যখন যেতে চায় দক্ষিণে,
মেয়েটি তখন ঝর্নার গান গায়;
মেয়েটির মুখে সূর্যাস্তের মায়া!
ছেলেটি দিনের ধাবমান রোদ্দুর!
কতো কাল ধরে কতো না গৌধূলি তলে,
ছেলেটি মেয়েটি এর ওর দিকে চায়!
কতো বিচ্ছেদ কতো না সে বলীদান!
কতো যে অকাল শুভকাল পানে ধায়!
ছেলেটির গায়ে বেঁধে কতো বল্লম;
মেয়েটির মনে কতো মেয়ে মরে যায়!
ছেলেটি যদিও আঘাতে আহত তবু,
মেয়েটি আবার মেয়ে হয়ে হেসে ওঠে।
কতো বিদ্রোহ, কতো না সে বলীদান;
পার হয় ওরা কতো না মহামারী!
ছেলেটির বুকে মেয়েটির বরাভয়;
মেয়েটির চোখে ছেলেটির ভালোবাসা!
একজন ফের উদ্যানে আনে ফুল,
একজন মাঠে ফলায় পরিশ্রম,
কতো না রাত্রি কতো না দিনের ডেরা,
কতো না অশ্রু, কতো না আলিঙ্গন!
ছেলেটি আবার খোঁড়ে মাটি, খোঁড়ে জল!
মেয়েটি আবার নাকে পরে নাকছবি,
ছেলেটির চোখে মেয়েটির বরাভয়;
মেয়েটিকে দেখি একাকী আত্মহারা!

১২
সম্পর্ক

তুমি নও, তোমার ভিতরে এক অটল দ্রাক্ষার
আসন্ন মধুর, মাতোয়ারা বানায় আমাকে!
গেলাসে গেলাসে দিন- ঝরে পড়ি ঝর্না আয়োজনে!
তোমাকে চিনি না, বহমান তোমার দেহকে
দীঘল তরুর মতো বুনে দিয়ে তবু তার তিমির ছায়ায়
তোমার খোঁপার মতো তুলে আনি কিছু কালো ফুল!
বাজারে বিকোবে? না হে, এখন বাজারে এই শোক
কেনার পুরুষ নেই- ওরা কেনে অন্য সব স্মৃতি :
এখন প্রেমিক নেই, যারা আছে তারা সব পশুর আকৃতি!

১৩
প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বি

অতো বড় চোখ নিয়ে, অতো বড় খোঁপা নিয়ে
অতো বড় দ্বীর্ঘশ্বাস বুকের নিশ্বাস নিয়ে
যতো তুমি মেলে দাও কোমরের কোমল সারস
যতো তুমি খুলে দাও ঘরের পাহারা
যতো আনো ও-আঙুলে অবৈধ ইশারা
যতো না জাগাও তুমি ফুলের সুরভী
আঁচলে আলগা করো কোমলতা, অন্ধকার
মাটি থেকে মৌনতার ময়ূর নাচাও কোনো
আমি ফিরবো না আর, আমি কোনোদিন
কারো প্রেমিক হবো না; প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বি চাই আজ
আমি সব প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বি হবো!

১৪
বিচ্ছেদ

আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো
না হলে নিজের কাছে ভুলে যাও
এতো কষ্ট সহ্য করো না।
সে তোমার কতো দূর? কী এমন? কে?
নিজের কষ্টকে আর কষ্ট দিও না।
আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো,
না হলে নিজের কাছে নত হও, নষ্ট হয়ো না।

১৫
ভালোবাসার কবিতা লিখবো না

তোমাকে ভালোবাসি তাই ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।
আমার ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো কবিতা সফল হয়নি,
আমার এক ফোঁটা হাহাকার থেকে এক লক্ষ কোটি
ভালোবাসার কবিতার জন্ম হয়েছে।
আমার একাকীত্বের এক শতাংশ হাতে নিয়ে
তুমি আমার ভালোবাসার মুকুট পরেছো মাথায়!
আমাকে শোষণের নামে তৈরি করেছো আত্মরক্ষার মৃন্ময়ী যৌবন।
বলো বলো হে ম্লান মেয়ে, এতো স্পর্ধা কেন তোমার?
ভালোবাসার ঔরসে আমার জন্ম! অহংকার আমার জননী!
তুমি আমার কাছে নতজানু হও, তুমি ছাড়া আমি
আর কোনো ভূগোল জানি না,
আর কোনো ইতিহাস কোথাও পড়িনি!
আমার একা থাকার পাশে তোমার একাকার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
হে মেয়ে ম্লান মেয়ে তুমি তোমার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
আমার অপার করুণার মধ্যে তোমারও বিস্তৃতি!
তুমি কোন্ দুঃসাহসে তবে
আমার স্বীকৃতি চাও, হে ম্লান মেয়ে আমার স্বীকৃতি চাও কেন?
তোমার মূর্খতা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধে, পৃথিবীটা পুড়ে যাবে
হেলেনের গ্রীস হবে পুনর্বার আমার কবিতা!
এই ভয়ে প্রতিশোধস্পৃহায়
আজো আমি ভালোবাসার কবিতা লিখিনি
কোনোদিন ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।
হে মেয়ে হে ম্লান মেয়ে তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার কবিতা আমি কোনোদিন কখনো লিখবো না!

আমার একলা থাকার সঙ্গী যে কবি এবং কবিতা সেগুলো এই লেখায় বন্দী থাকুক। আর হ্যাঁ বলা হয় নি, ছোট্ট একটা বেদনা আর অভিমান আছে আমার আবুল হাসানকে নিয়ে। আমার জন্মদিন কেন আমার প্রিয় কবির মৃত্যুদিন হলো? যদি কখনো সম্ভব হত আমি সত্যি হয়ত উনার কাছে জানতে চাইতাম। সত্যি, ভিষণ দলা পাকানো কষ্ট আর অভিমান নিয়ে প্রশ্ন করতাম, “আপনার কবিতা পড়ে যেই আমি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পার করেছি, সেই আমার পৃথিবীতে আসার দিনই কেন আপনি পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিলেন? কেন? কেন? কেন?”

আজকের এই এলেবেলে খেয়ালী লেখাটুকু আবুল হাসান ও তাঁর কবিতাপ্রেমীদের উৎসর্গ করা হল…

একুয়া রেজিয়া সম্পর্কে

আকাশ তো ছুঁইনি, কিন্তু আকাশের মাঝে তো মেঘ হয়ে ভেসে আছি... বেঁচে আছি, দিব্যি জেগে আছি। রোদকে আমায় ভেদ করে স্পর্শ করতে দিচ্ছি...এই তো আমি....এই তো জীবন...আর বাঁচার সেকি আনন্দ...
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে কবিতা-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

13 Responses to আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়…

  1. জাগরূক বলেছেনঃ

    আবুল হাসান জেনে গিয়েছিলেন , এইসব সত্যযাপনের আনন্দের ভিত বিষাদমাত্র ! তাঁর কবিতায় ডুবে থাকার সময়ে জেনে যাই এই পার্থিব সাফল্য স্রেফ ঠুনকো কিছু খন্ডমাত্র। শেষমেষ , একা থাকাই হয়ে যায় , বিষাদগ্রস্থতার মাঝেই – সত্যিকারের বেঁচে থাকার বোধ ।

    কবি আবুল হাসান শিখিয়ে দিয়েছেন তাই , আমরা কবার জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন নিয়ে সত্য করে বলে ফেলি –
    “আমদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা
    সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম,
    সুধীবৃন্দ, তবু জীবনে কয়বার বলুন তো
    আমরা আমাদের কাছে বোলতে পেরেছি,
    ভালো আছি , খুব ভালো আছি?” –

    আমরা পারি না , কারণ আমরা নিশ্চিদ্র আর্মার পরিহিত যান্ত্রিকতার রক্তমাংশ , মানবিক হতে
    “আমারও বক্ষে একটি গর্ত প্রয়োজন” !

    ক্রমশ বক্তিগত পোশাক পরার পরে আমরা একক হতে একক হয়ে যাই !
    “এখন আমরা কেউই কাউকে চিনতে চাই না; স্বজন বন্ধু অন্নদাত্রী,
    আমরা কেউই কাউকে চিনিনা বক্তিগত পোশাক পরলে !”

    তাই ঐসব গাছগুলোর মত সারিবদ্ধ দাড়ায়ে থাকায় হয় না আমাদের
    “আমরা যখোন শার্টের তলায়
    নিজস্ব গোপন ছুরি নিয়ে চলাফেরা করি
    প্রতিমূহুর্তের আয়নায় আত্মহত্যা করি আর
    প্রতিমূহুর্তের অবিশ্বাসে এর ওর সাথে কথা বলি,
    সে মূহুর্তে ওরা বিলায় ওদের নিজস্ব সম্পদ
    নির্বিশেষে চুপিচাপি”

    এইসব ইত্যকার সাতপাঁচ পাঁচসাত ঝেড়ে ফেলে রিয়ালিস্টিক প্রত্যাবর্তনের সময় চোখ বুজে থাকতে হয় , যেহেতু –
    “গ্রন্থ এখন কেবলি শুধু ছাপার হরফ, সভ্যতা যে অধঃপতন,
    ……….
    শুধু শুধুই দুপুর গেছে মানুষ গেছে ব্যর্থ মানুষ,
    শিল্প এখন সুবিধাবাদ ”

    কনফেশানে আমরা স্রেফ প্রেম আর ক্ষোভে কথা জানালেই নিজের সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমাদের হয় না , অন্তর্গত মানুষ হয়ে আমরা বলতে পারি না –
    ” এই পাথরের চোখ,
    পরচুলা,
    নকল পোশাক,
    এসব আমার নয়
    এসব আমার নয় , প্রভু
    আমি যদি বোলতে পারতাম ! ”

    একমাত্র কুসংস্কার ভেবে নিয়ে আমরা ভাবি আমাদের সব আছে , শব আছে , মৃত্যুর আগে তাই লড়ে যায় মানুষমাত্র
    “একে একে সব গেছে, কিছু নেই, কিচ্ছুটি নেই,
    তবু কিছু কষ্টেসৃষ্টে ধরে আছে এখনো মানুষ”
    সেই সুখ নামের দুরস্থ ইউটোপিয়ায় ছুটে বেড়াই বিস্মৃতির স্মরণ করতে করতে –
    “যা কিছু আমার মনে নেই তাই হলো সুখ!
    আহ ! সে সুখ… ”

    ছুটন্ত আমাদের চোখ এড়িয়ে ছোট্ট সব মারাত্মক ঘটনাগুলো , যেমন
    “ একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
    নইলে কিশোর চেনেনা কেন ঘাসফুল? ঘাস কেন সবুজের বদলে হলুদ?
    একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
    নইলে নয়টি অমল হাঁস
    থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়
    ভালোবাসা কেবলি… একটি বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা হয় ?
    একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
    নইলে মানুষের দরোজায় টোকা দিলে কেন আজ দরোজা খোলে না ?
    ‘বৃষ্টি হলে গা জুড়োবে’ কেউ কেন বলে না এখন ?”

    পলায়নপ্রবণতার আগে , কোন দূরযাত্রায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া জানতে হয় ওনার মত করে –

    “আমি কার কাছে যাবো ? কোনদিকে যাবো ?
    ………………
    আমি নই ক্রীতদাস, হৃদয়ের আমি তো সম্রাট , আমি
    এক লক্ষ রাঁজহাস ছেড়েছি শহরে, আমি জয়ী , আমি জয়ী !”

    যাপিত এইসব গোলকধাঁধায় মুক্তি খুঁজি পালাতে চেয়ে এখানে ওখানে , প্যানারোমিক ভিউতে , তবু প্রতিক্ষার শোকগাঁথায় আমাদের ফিরে আসতেই হয় ।
    “ কিন্তু আমি তরবারীর সঠিক স্বভাব আজো বুঝতে পারিনি,
    আমি সমাজের সঠিক শব্দার্থ খুঁজে পাইনি কোনো শ্লোকে;
    মানবিক ভালোবাসা, নারীর নির্জন হাত কাকে বলে এখনো জানিনা !
    আমি সমুদ্রের কাছে গিয়ে পুনর্বার সমাজের কাছে ফিরে এসেছি !”

    মাঝে মাঝেও তবুও হুট করে এই হয় , এইভাবে হয় –
    “একটি অস্থির নীল প্রজাপতি পর্দার বুনট থেকে উড়ে এসে
    ঢুকে গেছে আমার মাথায়!”

    কিংবা সারাদুপুর ঘুরে আসা কোন কিশোরের বাড়ি ফেরার ক্ষণে, যখন তখন যদি বুকের মধ্যে কিসের একটা কঠিন দুঃখ রূক্ষ দুপুরের শাসন থাকে , অভিমানে হাত মুঠো হয়ে যায়, বাড়ির ফেরার অনিচ্ছায় যে কিশোর বা সদ্য অফিস থেকে নতুন চাকুরে বাসে ওঠে – তাকে দেখে কী বলা যায় না – “ক্লান্ত কিশোর তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখায়, ক্লান্ত দেখায় !” – আবুল হাসান বলেছেন ঐ কিশোরের উদ্দেশ্যেও বলে যান ।

    কোন আশ্রয় হিসেবে মানুষের চাওয়া –
    “এই তো মানুষ চায়, যুগে যুগে তার জেগে থেকে ঘুমোবার সাধ”

    নিত্যদিনের টানাপোড়েনে আমাদের মনে হয় –
    “ কোনটা ধরে রাখি আর কোনটা ফেলে দেই
    একটায় অবলুপ্তি, অন্যটায় অন্ধ জাগরণ”

    তিনি বালিকার রমণী হবার অতটুকু চাওয়া চিনিয়েছেন , শিখিয়েছেন মানুষের চিবুক ছুঁয়ে দেয়া যায় কিন্তু কালিমা নয় , এমনকি দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী না রেখে গোলাপের নীচে যে কিশোর কবি নিহত হয়, তাকে তিনি জানিয়েছিলেন একদিন ভবঘুরের প্রধান হয়ে ফালি করে দেয়া চাঁদ , বাঘিনীর ঠোটে বলা যায় – উদ্ধার করো আর শেষমেষ আমাদের পথটাই ভীষণ ব্যর্থ!

    কিংবা আহত আঙ্গুলে কখনো স্পর্শ করা যায় না শোক , পবিত্র সন্ধি ! অপরূপ কোন বাগানে বসতি গেড়ে অনুপস্থিতির একলা ঘরে না যায় থাকা । অবহেলা করার সময়ে , উপেক্ষা করার সবসময়েই সবকিছু। তবু তিনি বিচ্ছেদে অবলীলায় বলতে পারেন –
    “ আগুনে লাফিয়ে পড়ো, বিষ খাও, মরো
    না হলে নিজের কাছে নত হও, নষ্ট হয়ো না !”

    তবু ঝিনুক নীরবে সয়ে যায় , বিষের বালি সয়ে মুক্তো ফলায় ।

    এই ডোয়ার্ক মোমেন্টামে আমাদের তুচ্ছতা ধরা পড়ে যায় আতস কাঁচে –
    “আমাদের জায়গা নেই; গ্রহণ করবে কাউকে –
    বন্ধুকে অথবা শত্রুকে !
    এত ছোটো, এত ছোটো হয়ে গেছি আমরা সবাই !”

    অপমানিত শহরের বাসিন্দা হয়ে তাঁর ভাষায় চিনে নিতে জানি –
    “গোলাপ এখানে লাশ, মানুষের লাশ
    কুকুর এখানে আজ হতে চায় কোমল হরিণ!
    তাকাও এদিকে ক্ষত , ঐদিকে খুন , তুমি তাকাও – সময়
    যেখানে মমতা নেই , মনীষার ছায়া নেই – আমার গমন !”

    এবং চূড়ান্ত সত্য সেই এপিটাফ , লিখে গিয়েছেন –
    “ আমার হবে না আমি বুঝে গেছি” !

    সত্যিই , প্রিয় আবুল হাসান, আমি এবং আমরা বুঝে গেছি !

    • একুয়া রেজিয়া বলেছেনঃ

      জাগরূক,
      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আর দুঃখিত মন্তব্যের প্রতি উত্তর দিতে দেরি হওয়ার। আপনার মন্তব্য নিয়েই মনে হচ্ছে একটা আস্ত পোস্ট হয়ে যাবে। 🙂
      ভালো থাকুন নিরন্তর।
      শুভকামনা।

  2. নিশম বলেছেনঃ

    একেকটা কবিতা যেনো একেকটা গল্প। আবুল হাসান নিয়ে তোমার পাগলামীর সাথে ব্যাপক পরিচিত, এখন তো মনে হচ্ছে, আমারও আবুল হাসানের কবিতা সমগ্রটা বইমেলা থেকে ছিনিয়ে নেয়া উচিত ছিলো !

    আমি কাছে যাবো আমি তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না!

    কী অদ্ভুত সুন্দর !!!

  3. শারমিন বলেছেনঃ

    কবিতাগুলো অনেক সুন্দর 😀
    অনেক ভালো লেগেছে

  4. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    অদ্ভুত সুন্দর একটা পোস্ট। প্রিয়তে নিলাম।

  5. রুহশান আহমেদ বলেছেনঃ

    সুন্দর পোস্ট। লেখার শুরুটা বেশ কাব্যিক ছিল। কবি নিশ্চয়ই স্বার্থক।

  6. খেয়ালী কিশোর বলেছেনঃ

    আবুল হাসান কে নিয়ে কিছু বলতে গেলে সেটা আরেকটা পোষ্ট হয়ে যাবে। শুধু বলি- আবুল হাসানের তুলনা কেবল আবুল হাসান-ই। সব কিছু বাদ দিলেও শুধু একটা কারণেই আমি তার অন্ধ ভক্ত- আমার নিজের সম্পর্কে সবচে বড় সত্যটা আবুল হাসান বলে গেছেন, যেটা আমি কখনোই এতো ভালো বলতো পারতাম না 😀

    “আমার হবে না আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ! “

    • একুয়া রেজিয়া বলেছেনঃ

      প্রিয় খেয়ালী কিশোর,
      আপনার নিকটি খুব সুন্দর।
      আমিও জেনে গিয়েছি–

      “মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা”

  7. রাজ্যহীন রাজপুত্র বলেছেনঃ

    খুব ভালো লাগল!

একুয়া রেজিয়া শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।