নগরের বিস্মৃত আঁধারে

মুঠোফোনের স্ক্রীনে তার নামটা দেখে শত ব্যস্ততার মাঝেও ‘হ্যালো’ বলেছিলাম। তখনো ভাবিনি আজ দিনের বাকী সময়টুকু অন্য এক নেশার ঘোরে হাবুডুবু খাবে!

ঠিক এমনিভাবেই কয়েকমাস আগেও সে আমাকে ফোন দিয়েছিলো। বলেছিলো, “ভাইয়া, আগামীকাল আমার লেখা প্রথম বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে- একুশের বইমেলাতে। আপনি অবশ্যই থাকবেন এবং অনুরোধ রইলো- বইটির গল্পগুলো নিয়ে আপনার অনুভূতিটা শুধুমাত্র নিজের মনের ভিতরে রাখবেন না”।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে থাকলেও, কুন্ঠিত কন্ঠে স্বীকার করছি, বইটি পড়ার সময় আমার কখনো হয় নি। এতে যেমন আমার কাজের ব্যস্ততাও অনেকখানি দায়ী, আবার আমার অলসতাকেও নির্দোষ সাব্যস্ত করা যায় না! তবে বইটিকে যক্ষের ধনের মতোই আমার সাথে সাথে রেখেছিলাম।

আজ যখন সে ফোনে আমায় জানতে চাইলো, আমি কি অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছি, আমি খুব লজ্জা পেলাম। হাসপাতাল থেকে বিকেলের দিকে বাসায় এসেই ‘নগরের বিস্মৃত আঁধারে’ নিয়ে বসলাম।

হ্যাঁ, আমি একুয়া রেজিয়ার লেখা প্রথম বই ‘নগরের বিস্মৃতির আঁধারে’ নিয়েই কিছু লিখতে বসেছি।

(১)

একুয়া রেজিয়ার লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ‘চতুর্মাত্রিক’ ব্লগে। এবং প্রথম থেকেই আমি ছিলাম গুণমুগ্ধ পাঠক। কিন্তু সেটা কখনো আমার আবেগকে নিয়ে খেলতে পারে নি, কারণ ব্লগে ওর লেখা পড়তাম অনেকদিন পর পর একটা।  গত সপ্তাহে এক ধরনের অনুভূতি হলো তো, এই সপ্তাহে আরেক ধরনের। লেখার মাঝে গ্যাপের কারণে, পড়ার মাঝে গ্যাপের কারণে তাই কখনই অনুভূতিগুলো বাঁধ ভেঙ্গেনি।

কিন্তু আজ!

প্রথম গল্পটাই ‘শেষের ওপাশে’।

নিঝুম যখন কেকের পাশে বসে আসিফের লেখা চিঠিটি মোমবাতির আলোয় পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো, আমার ভিতরেও তখন যেনো চাপা কষ্টটা আসিফের জন্য চিৎকার করে উঠছিলো। আমার জীবন কাহিনী আসিফের মতো না হয়েও, কেনো যেনো বার বার আমার নিজেকেই আসিফ মনে হচ্ছিল। কাঁপা হাতে যেমন নিঝুম কেক কাটছিলো, আমিও তেমন কাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলাম।

কাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টিয়েও খুব একটা শান্তি পাই নি! ‘মনকৌটা’ যেনো আমাকে আরো অস্থির করে তুললো। আমি যেনো একবার শ্রাবণ, আরেকবার নায়ানকে বোঝার চেষ্টা করছিলাম। যখন নিজেরও দুইটা সাদা আর কালো মনকৌটা প্রায় আবিষ্কারই করে ফেলেছিলাম, তখন একুয়ার মনকৌটা খুলে মনটাকে একটা পাখির মতো আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার উপদেশ শুনে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম।

স্তব্ধ হয়েও বসে থাকতে পারলাম না! ‘কেনো মিছে নক্ষত্রেরা জেগে থাকে’ পড়তে পড়তে কেমন যেনো বিষন্ন হয়ে গেলাম। আমার ছোট দুই বোনের কথা খুব মনে পড়লো। দুইজনই আজ বিদেশ বিভূইয়ে, আর চাঁদপুরের মতলবে এক বিষন্ন সন্ধ্যায় আমি যেনো অনুভব করলাম মাসুদের মতো আমার বোনদেরকেও আমি কত ভালোবাসি! ওদের জন্য যেনো বুকটা হাহাকার করে উঠলো!

(২)

“ভালোবাসা মানেই প্রেম না। ভালোবাসা মানে অনেক বড় কিছু, অনেক উদার কিছু”, এই বোধটাই যেনো একুয়ার প্রায় সবগুলো গল্পেই আমি অবাক হয়ে পেলাম। আর তাই তনিমার প্রতি জামিল সাহেবের মায়া, মমতা বা সাদির প্রতি নীরার হাহাকার কিংবা আনিলার প্রতি পুষ্পিতার ভালোবাসাকে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়, অনুধাবন করা যায়, হৃদয়ে গেঁথে যায়।

একুয়া যেনো শুধু সম্পর্কের বিভিন্ন দিকগুলো নিয়েই আমাকে নাড়িয়ে যায় নি, নাড়িয়ে দিয়েছে দেশপ্রেমের গল্প দিয়েও। আম্ব্রিনকে দিয়ে যেনো কানাডা প্রবাসী আমার ছোট বোনটিকেই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। উফ! গল্প কীভাবে এতো বাস্তব!

(৩)

‘খুব বিচিত্র একটি সিস্টেমের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। আপনি যদি একজন ফেয়ার মানুষ হন, তবে আপনাকে এখানে একটি জেলী ফিশের মতো বেঁচে থাকতে হবে’- আমি স্তম্ভিত! এখানে এসে একুয়াকে আমার নবীন লেখক মনে হয় নি! এখানে এসে আমার মনে হয় নি এটি একুয়ার প্রথম প্রকাশিত বই! আমি যেনো জীবনের বহু অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মাহরীন ফেরদৌসকে এখানে দেখতে পেলাম।

‘জীবন নামক সিনেমার বাস্তব চরিত্রের প্রকৃত নায়কেরা আশফাকের মাঝে নয়; বরং শরীফের মতো পরিশ্রমী আর পোড় খাওয়া মানুষের মাঝেই লুকিয়ে থাকে’ – আমার বুঝতে আর কোনো সমস্যা রইলো না- কেনো অন্যপ্রকাশের মতো একটি নামী প্রকাশনী এই বইটি প্রকাশ করেছে।

(৪)

‘…এই পৃথিবীতে মন খারাপ করে থাকার ব্যাপারটা আসলেই ভীষন অদ্ভুত…’ এই অদ্ভুত ব্যাপারটি এই প্রায় প্রতিটি গল্প পড়ার পরেই আমার হয়েছে। নাফিসা আপার বাসায় গিয়ে হাসানের যে উপলব্ধি হয়েছিলো, ক্ষনিকের জন্য আমিও যেনো থমকে গিয়েছিলাম! জীবনটাকে নিয়ে উথাল পাথাল ভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। যদি আমি মারা যাই, কি হবে…!

কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে চাই এই নশ্বর পৃথিবীতে- আরো অনেকদিন। পৃথিবীর প্রতিটি রূপ রস গন্ধ আমি প্রতিটি মুহূর্তে উপভোগ করতে চাই। আর চাই জীবনটা ভালোবাসার মানুষের সাথে সিনারজিস্টিকভাবে কাটিয়ে দিতে। এই বোধটাই যেনো দিন শেষে আমি ‘নগরের বিস্মৃত আঁধারে’ থেকে পেলাম। আর তাই বইটি পড়া শেষ করে আমি এক মুহূর্ত দেরী না করে ফোন দিয়েছিলাম আমার ভালোবাসার মানুষটিকে, এপারের নিরবতা যেনো ওপারের ভালোবাসাকেও  ছুঁয়ে যায়!

(৫)

একুয়া, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ- এতোগুলো অসম্ভব সুন্দর গল্প একসাথে আমাদেরকে উপহার দেওয়ায়। তুমি হয়তো ভাবতে পারো, ভাইয়ার লেখাতো কোনো রিভিউ হলো না! লেখার কোনো সমালোচনা নেই! শুধু প্রশংসা করলে হবে? আরো অনেক কিছু! হ্যাঁ, হয়তোবা কোথাও কোথাও কিছুটা ছন্দ পতন হয়েছে, তুমি যে অনেক বেশি জানো, সেটা হয়তোবা কোথাও কোথাও ফুটে উঠেছে, তারপরও একটি গল্পগ্রন্থে পাঠককে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চুম্বকের মতো আটকে রাখা কম সার্থকতা নয়! সবচেয়ে বড় কথা প্রতিটি গল্পই যেনো ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের আস্বাদনের সুযোগ করে দিয়েছ। আর তাই আজ শুধু তোমারই জয় গান।

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বইপড়ুয়া-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

2 Responses to নগরের বিস্মৃত আঁধারে

  1. শারমিন বলেছেনঃ

    বইটা ব্যস্ততার কারনে পড়বো পড়বো করে আর পড়া হয়নি
    তবে এখন রিভিউ পরে মনে হচ্ছে যে না পড়তেই হবে তো 🙂
    আর একুয়া আপুনির লিখাগুলো অনেক সুন্দর হয়

  2. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    আমি বইটা ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে বসে পড়েছি। ট্রানজিটের চারঘণ্টা খুব সুন্দর কেটে গেছে। কয়েকটা গল্প ব্লগ থেকে পড়া ছিল। একুয়ার লেখাগুলো অন্যরকম। অনুভূতিটা ঠিক বোঝানোর মত নয়।

শারমিন শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।