আমার ভীষণ বেহিসেবি স্বপ্নগুলো…

এক একটা দিন আমার মন খারাপ হয়, এক একটা দিন আমার ভীষণ ধরণের একটা মন খারাপ হয়। এই ছোট্ট জীবনে আমাকে কষ্ট দিতে পারে এমন ঘটনার কমতি নেই। কেন জানি নিজের ভেতরটাকে পড়ে দেখতে গেলেই টের পাই, এখনও ভীষণ রকম ছেলেমানুষ রয়ে গেছি, ভীষণ রকম জেদি খামখেয়ালি একটা মন পুষে চলেছি এই এতোটা সময়…

রাত গভীর করে বাড়ি ফেরা অভ্যাস হয়ে গেছে কেন জানি। সোডিয়ামের লাইটগুলো যখন গাঢ় থেকে আরো গাঢ়তর হয়ে আসে, যখন ক্লান্ত রিকশার চাকায় খেলা করে খয়েরি রঙের স্বপনগুলো, তখন কেমন অদ্ভুত রকম টান টের পাই, বাড়ি ফেরার টান। যখন রাস্তার পাশে বেঁচে থাকা মানুষগুলো রাত্তিরের সংসার সাজায়, তখন আমি, পাশ থেকে হেঁটে যাওয়া মানুষটা আনমনে ওদের অনুভূতিগুলো চুরি করে দেখি। আমি দেখি আজকে একটু বেশি চাল পাওয়া গেছে দেখে ভাতের হাঁড়ির পাশে গোল হয়ে বসে থাকা অনেকগুলো শিশুর চকচকে চোখ, কিংবা আজ হয়ত দিনমজুর বাবা ঘরে ফেরার সময় একটা আম নিয়ে এসেছে, আজ ওদের ছোট্ট খুপরি ঘরে ঈদের আনন্দ, সবাই মিলে বাবাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে হয়ত আমটা খাবে। আমি ওদের জীবনের টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলো ভাবতে থাকি,  আমার ক্যামেরার লেন্স ওদের ফোকাস করতে পারে না, আমার চোখ ভিজে আসে, রোজ অসংখ্য না পাওয়ার অনুযোগ জানাতে জানাতে আমি যখন চিন্তা করি এ মাসের শেষে তাহলে নতুন ল্যাপটপটা কিনেই ফেলবো, তখন অন্য কোথাও কারও মনে হয়তো ভাবনা চলে, আর ১০০টা টাকা হলে এ মাসের ভাড়াটা দিতে পারবো, আর ছেলেটার স্কুলে যাবার একটা শার্ট হবে এবার।

রোজ বাসায় ফেরার পথে আমি  প্রায়ই দেখি বাসার কাছের ডাস্টবিনে একটা লোক বসে থাকে উবু হয়ে, খুব বুঝতে চেয়েছি উনি কী করেন ওখানে বসে, একটা দিন হঠাৎ করেই টের পেলাম, মানুষটা ঐখানে বসে ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা থেকে খাবার খুঁজে খান, সেদিন সারাটা পথ মাথা নিচু করে বাসায় এসেছি, একটা ভয়ানক ধরণের অপরাধবোধ আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে সারাটাক্ষণ, এই আমার এখন খাবার খেতে ইচ্ছে করে না, আমার ভয়ানক ধরণের কষ্ট হয়, আমার ভীষণ মনে হয়, কোথাও কিছু একটা ভুল হয়ে যাচ্ছে, হিসেব এমন হবার কথা না, যেই মানুষটা উবু হয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় খাবার খুঁজেন, আমার খুব ইচ্ছে করে একদিন তার গল্প শুনতে, আমার জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কতোটা কষ্ট থাকলে, কতোটা ভীষণ রকম অচেনা এই পৃথিবীটা হলে…

এমন করে ডুবে যাওয়া যায় নিত্যতায়…

জানি না…

মাথার ভিতর দপদপ করে এসব ভাবনা ভাবতে গেলে, ইদানীং মনে হয় ভেতরটা বিকল হয়ে যাচ্ছে, এই অসুখ সারাবার একটাই উপায়, সেটাই করবো ঠিক করলাম…

পরদিন রাত আনুমানিক ১১টা, হেঁটে যাবার সময় লোকটাকে দেখলাম বসে আছেন, আমি উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, ল্যাম্পপোস্টটাকে আড়াল করেছি দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকালেন তিনি, একমুখ দাঁড়িগোঁফে ঢেকে আছে পুরোপুরি, কষটে মেরে যাওয়া চেহারা, পরনের শার্টটা বুঝি শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য, তবু চোখের মণিতে কেমন যেন একটা ঔজ্জ্বল্য, কি বলবো কিছু না বুঝে কিছুটা সময় বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর প্রায় ফিসফিসে স্বরে বললাম, “আপনি কি একটু আমার সাথে আসবেন?” ভাবলেশহীন উত্তর এলো একটা, “ক্যান?” আসলে বুঝতে পারছিলাম না কী বলবো, বললাম, “একটু আসেন, আমার দরকার আছে একটু।” নিতান্ত অনিচ্ছাতেই উনি উঠে এলেন, আমি হাঁটছি, উনি আমার পিছনে আসছেন, কিছুটা অস্থিরতা আর কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে, আমি পাশের হোটেলে ঢুকলাম, দেখি উনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ডেকে নিয়ে আসলাম উনাকে। কিছুটা কুণ্ঠিতভাবেই এলেন ভিতরে। আমি বললাম আপনি বসেন, আজকে আপনি আমার সাথে খাবেন, কিছুক্ষণ আমার দিকে দ্বিধান্বিত হয়ে তাকিয়ে থেকে উনি বললেন, আচ্ছা। হোটেলের বয়রা আড়চোখে দেখছে আমাদের দুজনকে। খাবার দিতে বললাম, ভাত, ডাল আর গরুর মাংস। খাবার এলো, উনি আমার দিকে একবার তাকালেন, আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম, কেন জানি উনার চোখে চোখ রাখতে পারছি না, তারপর উনি খাওয়া শুরু করলেন, আমি প্লেট নিয়ে বসে আছি, খাবার নিতে পারছি না, কেমন জানি ভেতরটা ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে, আমি একটা মানুষের খাওয়া দেখছি, এমন না যে আমার খুব প্রিয় একটা মানুষ আমার সামনে বসে আছে আমি তাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছি, বরং ব্যাপারটা এমন, আমি ভীষণভাবে বঞ্চিত একটা মানুষের খাওয়া দেখছি। কতো মায়া নিয়ে ভাতগুলোকে গুছিয়ে আনছেন একসাথে, লেবুটা চিপে দিলেন ভাতের উপর ভালোমতো, অল্প একটু ডাল দিয়ে ভাতটা মাখলেন, তারপর একগাল তুলে মুখে দিলেন…

আর ঠিক তার মুখোমুখি বসে আমি গ্রোগ্রাসে উনার অনুভূতিগুলো দেখে নিচ্ছি। আমার মানুষ দেখতে ভালো লাগে, আমার ভালো লাগে ওদের চোখের হাসি দেখতে, আমার ভালো লাগে নিটোল অভিনয়হীন সেই অনুভূতি দেখতে।

আমার প্লেটে থেমে আছে ভাত, আমি হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করছি। চোখের জল লুকোনোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি নিচের দিকে তাকিয়ে, আমার এমন হবার কথা না, খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপারই তো সবটুকু, একটা মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলো, তাকে খাইয়ে দিল কেউ। আর তো কিছু না, তবু কেন জানি অযথাই বুকের ভিতর ভেঙ্গে আসে কোন একটা কষ্টে, হয়তো এখনো মানুষ হয়ে বড়ো হয়ে ওঠা হয় নি, এখনও ভিতরের ছেলেমানুষটা চলে যায় নি বহুদূর…

আমি আস্তে করে উঠে গেলাম উনার সামনে থেকে, আমাদের খাবারের বিলটা দিয়ে বের হয়ে চলে এলাম, পিছনে রেখে এলাম অনেকটুকু অনুভূতি, ভালোলাগা আর একজন অবাক মানুষকে, যার চোখের দ্যুতি এখনো উজ্জ্বল, আমার মতো মরে যায় নি…

আমি জানি কাল থেকে এই মানুষটা আবারও খাবার খুঁজতে যাবেন, কালকে থেকে উনার গল্প পালটে যাবে না, কিন্তু এটুকুও জানি, আজ রাতে যখন ফুটপাতে উনি ঘুমাবেন, উনার ঠোঁটের মাঝে যেই হালকা হাসির ছোঁয়া থাকবে সেখানে একটুকরো হলেও আজকের রাতটুকুর কথা লিখা থাকবে…

আমি জানি এমন অদ্ভুতুড়ে ভাবনা আমাদের সবার মধ্যেই খেলা করে, আমাদের সবার ইচ্ছে করে পাশের মানুষটার মুখে হাসি ফোটাতে, ইচ্ছে করে মানুষকে ভালো রাখতে, ভালো রাখাতে, আমাদের ভাবনাগুলো লাগামছাড়া, যেদিন তার সাথে আমাদের কাজগুলোও এমন করে ভাবনার মতো হয়ে যাবে, সেদিনই সুন্দর একটা সকাল হবে আমাদের সবার জন্য, যেদিন সবাই খুশি থাকবে, যেদিন আমি আমার সাধ্যের মধ্যে আরেকটা মানুষের ভালো করবো, আরেকজনকে বাঁচতে শেখাবো……

আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, এই আমরাই একদিন এমন হবো, রোজ একটা করে অদ্ভুতুড়ে ভালো কাজ করবো, রোজ একটু করে মানুষের জন্য এগিয়ে আসবো, রোজ একটু করে আবার বাঁচতে শিখবো, এখনো বাকি আছে আমাদের হাত ধরে এগিয়ে যাবার। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় ভীষণ, একটা ভালো কাজ কখনো বিফলে যেতে পারে না, একটু মানুষের জন্য এগিয়ে আসাকে কখনো কেউ দূরে ঠেলে দিতে পারে না। আমার বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, আমরা সবাই একদিন বাসায় ফিরে স্ট্যাটাস দিবো,আজকে আমি এই কাজটা করেছি, তুমি? ছোট্ট একটা অনুরোধ রেখে যাবো শুধু, রোজ নিজেকে দিনশেষে একটা প্রশ্ন করি না হয়, আজ কী ভালো কাজটা করেছি? করেছি কী কিছু?

এই ছেলেমানুষী লিখাটা হয়তো এভাবেই ভেসে যাবে হাত থেকে হাতে, তবু একটুকরো আশা নিয়েই, এই লিখাটা কাউকে ভাবতে শিখাবে, কাউকে বলবে, এখনো শেষ হয়ে যায় নি মানুষের জীবনটা…

তাতেই পালটে যাবে অনেক কিছু, পালটে যাবে আমরা যেমন করে জীবনকে দেখতাম, যেমন করে মানুষকে দেখতাম…

তার সবকিছুই…

নিস্তব্ধ শৈশব সম্পর্কে

জন্মেছি যখন মানুষ হয়ে, লড়ে যাবো ভালোর হয়ে, এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়...
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অনুপ্রেরণা, ইতিবাচক, উদ্যোগ, গল্প, চিন্তাভাবনা, পাগলামি, বিবিধ, সচেতনতা, হাবিজাবি-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

9 Responses to আমার ভীষণ বেহিসেবি স্বপ্নগুলো…

  1. তুসিন বলেছেনঃ

    খুব ভাল লাগল লিখাটা।লেখাটা পড়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম
    “আজ কী ভালো কাজটা করেছি? করেছি কী কিছু?”
    উওরে কিছুই পেলাম না।সবই শূন্য………:(
    আসলে আমরা একটু একটু করে নিজেদের পরিবর্তন করে করতে পারি।

    “আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, এই আমরাই একদিন এমন হবো, রোজ একটা করে অদ্ভুতুড়ে ভালো কাজ করবো, রোজ একটু করে মানুষের জন্য এগিয়ে আসবো, ”
    এই লাইনগুলো চমৎকার ছিল।
    হৃদয় ছুয়ে যাওয়ার মত লেখা। 🙂
    :love:

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    এম্প্যাথিক মাইন্ড কাজ চালিয়ে যাক।

    দারুণ ভাবে ছুঁয়ে গেলো আমাকে।
    সমাজকর্মী সবার এই লেখাটা পড়া দরকার বলে মনে হয় 😀

  3. সামিরা বলেছেনঃ

    অসাধারণ ভাইয়া। চোখ ভিজিয়ে দিলেন।
    আমরা সবাই এমন হই!

  4. শারমিন বলেছেনঃ

    অসাধারণ ভাইয়া
    অনেক অনেক ভালো লেগেছে 🙂

  5. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    আমার মানুষ দেখতে ভালো লাগে, আমার ভালো লাগে ওদের চোখের হাসি দেখতে, আমার ভালো লাগে নিটোল অভিনয়হীন সেই অনুভূতি দেখতে।>> :huzur:

    সেই পুরনো স্মৃতিগুলো হঠাৎই জীবন্ত হয়ে উঠলো! লেখনীতে এখনো আগের সেই বোধ, ভালোবাসা আর কিছু নাম না জানা অনুভূতি। সেই অনুভূতিগুলো এসে আচমকাই যদি দু’চোখ ভিজিয়ে দিয়ে যায়, তবে যাক না! ক্ষতি কী?

    পৃথিবীতে ভালোবাসারা এমনি করেই বেঁচে থাক চোখের জলে, ঠোঁটের হাসিতে, এমন লেখনীর পরতে পরতে।

নিস্তব্ধ শৈশব শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।