জানুয়ারী 5, 2014

‘বাবুসোনা, তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?’

ছোটবেলায় সবাইকেই একটা সাধারণ প্রশ্ন শুনতে হয় আর তা হল ‘বাবুসোনা, তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?’; সম্বোধনটি হয়তো একেক রকম হতে পারে। অনেক বাচ্চাকেই দেখা যায় তারা রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবার জন্য। অনেকে আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বাবা-মার দিকে। অনেকে আবার তড়িঘড়ি করে বলে ফেলে তার মনের ভেতরের কথাটুকু। একটা চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা এই জগতের কতটুকুই চেনে বা জানে? তারপরও তাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হয়! অধিকাংশ বাচ্চারাই আশেপাশের পরিবেশ বা জগতে যা দেখে তা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে হুট করে উত্তর দিয়ে বসে, “আমি বাসের হেল্পার হব”, “আমি ট্রাক চালাব”, “আমি চকলেট বিক্রি করব”, “আমি র‍্যাব/পুলিশ হব”, আরও কত কি! আর যেসব বাচ্চারা বাবা-মার মুখের দিকে চেয়ে থাকে তাদের বাবা-মা কিছুটা সাহায্য করে উত্তর দিয়ে দেন, “আমার বাবুটা বাবার মত বড় ‘...’ হবে”।

আমাকে যখন ছোটবেলায় এই প্রশ্নটা করা হত তখন আমি বাবা-মার দিকেই তাকিয়ে থাকতাম। একটু বড় হবার পর যখন একটু একটু বুঝতে শিখলাম, তখন ক্লাসের টিচারদের দেখে বেশ মুগ্ধ হতাম। মিশনারি প্রতিষ্ঠানে স্কুলজীবনের কিছু সময় অতিক্রম করেছি। টিচারদের যত্ন–ভালবাসার বেড়াজালে বন্দি আমি তখন এই প্রশ্নের ঝটপট উত্তর দিতাম “আমি টিচার হব”। এভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে কতবার যে এই প্রশ্নের উত্তর পরিবর্তিত হয়েছে তার হিসাব নেই। ক্লাস ফাইভ/সিক্স এ পড়ার সময় গানের দিকে ঝোঁক চলে যাওয়ায় গানের সুর শুনে শুনে কিবোর্ড-গিটার শেখার খুব শখ হয়েছিল। কিন্তু হায়! রক্ষণশীল পরিবার ও পড়াশুনার কারণে বাবা-মা বেঁকে বসলেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় প্রথম ক্যামেরা কেনা হল, একেবারে সস্তা দামের। সারাদিন সেই ক্যামেরা নিয়ে ছবি তোলা হত, কখনও ছাদে গিয়ে, কখনও বাগানে, কখনও বারান্দায়, আবার কখনও ঘরের ভেতরে! তখন মনে হত “ফটোগ্রাফার হব” (এই একমাত্র ইচ্ছে এখন পর্যন্ত অটুট আছে)। ক্লাস টেনে পড়ার সময় পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মায়। তখন মাথায় ঢুকল “গবেষক হব”। তারপর কলেজে উঠে রসায়নকে ভাল লাগল। তখন ইচ্ছে জাগল “ফারমেসিতে পড়ব”। অতঃপর ভর্তিপরীক্ষার সময় বাবা-মার ইচ্ছানুযায়ী প্রকৌশল বিদ্যাকেই বেছে নিলাম। প্রকৌশল পড়ার জন্য ভর্তিও হলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন মাথায় আবার মুভির পোকা ঢুকেছে। ক্যামেরার প্রতি দুর্বলতা সেই ছোটবেলা থেকেই। মনের অজান্তে এখন কিছুটা হলেও ইচ্ছে জাগে একদিন নাটক/ সিনেমা/ডকুমেন্টারি বানাব। যদিও এহেন চিন্তা মাথায় আসার পর নিজেকে কিছুটা বেকুব বেকুব মনে হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে শেষমেশ মুভির পরিচালক! মনে ভয় জাগে ‘আর যাই হোক, আশেপাশের রক্ষণশীল সমাজ ছিঃ ছিঃ করবে’!

আজ যখন চিন্তা করি আমার জীবনের রেখা এতবার দিক পরিবর্তন করেছে যে আমি নিজে নিজেকে বুঝতে পারি নি, চিনতে পারি নি, তখন প্রচণ্ড হতাশ লাগে। আমি কি আসলেই কখনও নিজেকে প্রশ্ন করেছি আমার কি ভাল লাগে, কিংবা আমার কি হতে ইচ্ছে করে। ছোটবেলা থেকে এই পর্যন্ত কখনও হেলমেট পরা প্রকৌশলী দেখে অভিভূত হইনি। টিচাররা প্রায়ই বলতেন আমি নাকি অঙ্কে ভাল (যদিও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গিয়ে এ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নবোধক চিহ্নের সম্মুখীন হয়েছিলাম) এজন্য প্রকৌশলকেই উচ্চশিক্ষার বিষয় হিসেবে বেছে নেয়া দরকার। আমার জীববিজ্ঞান পড়তে বা মনে রাখতে ভাল লাগত না বিধায় উপায় না পেয়ে প্রকৌশলকেই বেছে নেয়া। আর আমাদের দেশে বাবা-মায়েরা তো তাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই চিন্তিত থাকেন যে কচিমনে এই ‘ভয়’ ঢুকিয়ে দেন, ডাক্তার/ প্রকৌশলী হওয়া ছাড়া আর কোন গতি নেই। অথচ পুরো দুনিয়ায় কি এই দুটি পেশা ছাড়া আর কিছু নেই। আমি স্বীকার করছি যে এই দুটি পেশা খুবই সম্মানিত। কিন্তু একটা ছেলে বা মেয়ের মনের উপর কেউ এই বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারে না। ছোটবেলা থেকে বাবামায়েদের নিজ বাচ্চাদের মনঃজগতকে বুঝা উচিৎ। আমরা পাশ্চাত্য বিশ্ব থেকে এতকিছু অনুকরণ করতে পারি অথচ তাদের ইতিবাচক মনোভাবকে অনুসরণ করতে পারি না। বাইরের দেশগুলোতে স্কুলের টিচাররা তাদের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ, মেধা, দুর্বলতা এই দিকগুলো সুচারুভাবে নির্ণয় করতে পারেন। সেখানে বেশি মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আলাদাভাবে তাদের মেধানুযায়ী বিশেষ ক্লাস নেয়া হয়। যারা খেলাধুলায় বা নাচগানে ভাল তাদের সেভাবে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়, উৎসাহ দেয়া হয়। বিপরীতভাবে, আমাদের স্কুলের টিচাররা কিভাবে তাদের সব (মেধার)  ছাত্রছাত্রী পি এস সি, জে এস সি, এস এস সি তে জিপিএ ৫ অর্জন করবে তা নিয়ে একরকম মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। শিশুকালের আনন্দ আমরা স্কুল-কোচিং-প্রস্তুতি পরীক্ষা-পরীক্ষা-ফলাফল এই পদ্ধতিতেই জীবিত মাটিচাপা দেই। রাজনৈতিক অরাজকতা আর সামাজিক প্রতিযোগিতার সাথে যুদ্ধ করে বাবা-মায়েরা ভুলে যান তাদের বাচ্চাদের বিনোদনের কথা। আজকালকার কোন বাবা-মাকে যদি প্রশ্ন করেন তাদের ছেলে-মেয়েদের মানসিক আনন্দ কিভাবে নিশ্চিত করছেন, উনারা উত্তর দেন ‘গত মাসে নতুন ভিডিও গেমস কিনে দিয়েছি’। এবার যদি প্রশ্ন করা হয় ‘শুধু ভিডিও গেমস কিনে দিয়েছেন, বেড়াতে নিয়ে যাননি?’ উনারা হয়তো উত্তর দিবেন, ‘দেশের যা অবস্থা, দূরে কোথায় নিয়ে যাব বলুন? আর আমরা তো অফিস করে অবসরের সময়টুকুও পাই না। যতটুকু সময় পাই আশেপাশে কোথাও নিয়ে যাই। শিশু পার্ক, ফ্যান্টাসি কিংডম আছে না।’ এভাবে আজকের দিনের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাচ্চারা দেখবেন কোনদিন হয়তো স্বচক্ষে পাহাড় দেখেনি, সমুদ্র দেখেনি, খোলা মাঠে মুক্ত বাতাসে নিজেদের মেলে দেয়নি। সমাজবিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠা এই বাচ্চাগুলো ‘শেয়ারিং’ ব্যাপারটি বুঝে না। তারা হয়ে উঠে সঙ্কীর্ণ মনের। স্কুল জীবন তাদের কাছে হয়ে উঠে বিভীষিকাময় এক জীবন। কোচিং এর হোমওয়ার্ক, স্কুলের হোমওয়ার্ক, কিভাবে পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাবে এসব চিন্তায় হয়তো তারা মগ্ন থাকে! আমি বলছি না, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা খুব কঠিন। এটি তখনই কঠিন হয় যখন সব মেধার শিক্ষার্থীদেরকে একই কাতারে ফেলা হয়, যখন বাবা-মায়েরা তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে চাপ দেন যে জিপিএ ৫ না পেলে বকা দেয়া হবে, বাসা থেকে বের করে দেয়া হবে। বাবামাদের বুঝতে হবে তাদের ছেলে-মেয়েদের মেধা কতটুকু, তাদের আগ্রহ কোনদিকে। আমি আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে অনেককে দেখেছি খুব ভাল গান করে, অসাধারণ ছবি আঁকতে পারে, কেউবা দারুণ ছন্দমিল দিয়ে ছড়া লিখতে পারে। কিন্তু এদের অনেকেরই পরবর্তীতে প্রতিভা ধ্বংস হয়ে গেছে শুধুমাত্র বাবা-মার মনের ইচ্ছাকে পূর্ণতা দিতে গিয়ে। অনেককে দেখেছি, তারা হয়তো  অতটা ভাল ছাত্রছাত্রী নয়। তারা নিজেদের পুরো পরিশ্রম ঢেলেই পড়াশুনা করেছে কিন্তু তারপরও জিপিএ ৫ পায় নি বলে তাদেরই বাবা-মা অন্যদের কাছে বলে বেড়ান ‘আমার ছেলে/মেয়েটা এত ফাঁকিবাজ, কিচ্ছু পড়াশুনা করে না, রেজাল্ট ভাল হবে কি করে’। এভাবে শুধু পড়াশুনা দিয়েই তারা ছেলেমেয়েদের মেধা বিচার করেন। এস এস সি, এইচ এস সি পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে অনেকেই উপরের সারির প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। তাতেও পরিবারের কাছে হতে হয় অপদস্ত। কেউ হয়ত বাবামার ইচ্ছে পূরণ করতে না পেরে ডাক্তারি/প্রকৌশলী বাদ দিয়ে অন্য বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করে। কিন্তু এখানেই কি জীবনের সব আশা শেষ হয়ে যায় কিংবা এখানেই কি জীবন থেমে যায়? না, তো! এই ব্যাপারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবক বা ছাত্রছাত্রীদের বুঝান সম্ভব হয় না। ফলাফলঃ বছরের পর বছর ধরে একইভাবে আমাদের শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে অপদস্ত ও পর্যুদস্ত হচ্ছে। তাহলে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন এবং অভিভাবক-সন্তানের সম্পর্ক উন্নয়ন ও ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি। 

আপনার মনে এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, আমি কেন এতগুলো জ্ঞানগর্ভ কথা লিখলাম? আমার শৈশব কখনই খুব আনন্দের ছিল না। যাই পড়াশুনা করতাম কিভাবে যেন সবসময় ক্লাসের প্রথম সারিতে থাকতাম। আর সেজন্যই আমার প্রতি পরিবার ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা বেশিই থাকত। হয়তো আমাকে তারা যে পরামর্শ দিয়েছেন তা আমার জীবনের জন্য যথেষ্ট ইতিবাচক। কিন্তু তাই বলে আমার মেধা অন্য কোন ক্ষেত্রে থাকতে পারে না এটা মেনে নেয়াই বা কতটা যুক্তিযুক্ত! আর অন্যান্য ক্ষেত্রে চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? ঠিক সেরকমভাবেই, আমাদের দেশে বাবামাদের বুঝতে হবে তাদের ছেলে-মেয়েরা কোন দিকটাতে আগ্রহী, মেধাবী। সেটা শিল্প হতে পারে, খেলাধুলা হতে পারে, সাহিত্য হতে পারে। সাথে সাথে পড়াশুনা চালিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সেটার জন্য জোরজবরদস্তির কিছু নেই। সবাই পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে, লাস্ট কে হবে বলুন? আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাবা-মায়েরা তাদের অপূর্ণ ইচ্ছা তাদের ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়ে পূরণ করতে চান। এটা আমি একেবারেই সমর্থন করি না। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, কেউ যদি কোন বিষয়ে সত্যিকারের আগ্রহ পেয়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে বাবা-মা বা অন্য কারো চাপাচাপির দরকার হয় না। তখন তার মেধা আপনাআপনি প্রকাশ পায়। আর দেশও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে মেধাবী মানুষদের খুঁজে পাবে, বাবা-মায়েরাও তাদের সন্তান নিয়ে গর্ব করতে পারবেন। আমার লেখা শেষ করব এই প্রত্যাশা নিয়ে যে, এ দেশের প্রতিটি শিশু যেন সুন্দর, আনন্দময় শৈশব উপভোগ করতে পারে এবং বাবামাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, শিশুদের সব কথায় ‘না’ বলবেন না, তাদের ইচ্ছেমত কিছু সময় কাটাতে দিন, ভুল হলে হাসিমুখে শুধরে দিবেন আর পড়াশুনা নিয়ে তাদের উৎসাহ দিন কিন্তু তাদের উপর পড়াশুনাকে ‘ভার’ হিসেবে চাপিয়ে দিবেন না।  

[এই লেখাটি আমার নিজস্ব মতামত ও চিন্তাপ্রসূত। আপনাদের সাথে মতের অমিল হতেও পারে। সেক্ষেত্রে আমার লেখাটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ!]

 

6 comments on “‘বাবুসোনা, তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?’”

  1. পড়াশুনা নিয়ে তাদের উৎসাহ দিন কিন্তু তাদের উপর পড়াশুনাকে ‘ভার’ হিসেবে চাপিয়ে দিবেন না

    সুন্দর চিন্তাভাবনা 🙂
    আনন্দের সাথেই শিক্ষা লাভ করা উচিৎ
    আশা করি নিয়মিত লিখবেন 🙂

  2. এই লেখায় অনেকগুলো স্টার দেয়ার সুযোগ থাকলে দিতাম ! তবে আপাতত রেটিং ৫ দিয়েই ক্ষান্ত হলাম। আপনার অনুভূতিগুলো একেবারে চাক্ষুষ আমারও দেখে আসা, হয়তো বাংলাদেশের সব ছেলেমেয়েরই এমন অবস্থা। ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ারের এই বাইনারী এইম ইন লাইফ থেকে মুক্তি চাই। অন্তত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা যেন চাপিয়ে না দিই। এমন আরও লেখা চাই।

    অনেক ধন্যবাদ আবার। 🙂

    1. আমার লেখা পড়ে আপনার ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম। এ ধরণের কথা আলোচনা করে অনেকের কাছ থেকে তির্যক মন্তব্য পেয়েছি। আপনাদের মত মুক্তমনা পাঠকদের জন্যই আমার লেখা সার্থক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Copyright 2019