যাপন

খুব দ্রুত ল্যাপটপের কিবোর্ডের উপর হাত চালাতে চালাতে মানুষটি বোধয় ভুলে যায় সময় গতিশীল। সামাজিক যোগাযোগ সাইটে পরিচিত-স্বল্প পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন মানুষের সাথে আলাপে মগ্নতার মুহূর্তে যেন সময় থেমে যায়। অবশ্য থেমে যাওয়া সময় নতুন করে থামতে পারে কিনা জানা নেই। সময় তো সেই কবেই থেমে গেছে। কান পাতলে শোনা যায় এ শহর আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলছে না। সমস্ত গল্পই সামনে পিছিয়ে যাওয়ার গল্প।

কিবোর্ডের উপর হাতের ঝড় অব্যাহত রেখেই মানুষটি সময় দেখে নেয় এক পলকে। রাত কখন যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে সে খেয়াল তার নেই। ভোর হতে চললো, এবার কিবোর্ডের উপর ঝড় থেমে আসে। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ সাইটে সামাজিকতা রক্ষা করতে করতে এভাবেই রাত গভীর হতে হতে ভোর হয়ে আসে। মানুষটি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। তার ছোট্ট রুমটায় নীলচে হালকা আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকলে মনে হতে থাকে আরেকটা ‘বোরিং’ দিন কাটালাম। এ শহরে বৈচিত্র্য নেই অথবা ব্যক্তিগতভাবে কারো কাছেই তা ধরা দেয় না। এ শহর আলোর শহর, তিব্র আলোয় চোখ বুজে আসলে মনে হয় এখানে কতো সুখ! আলোর খেলার নীচে কখনো যদিবা চোখ পড়ে, তবে অস্বস্তিতে সরিয়ে নিতে হয়। বিষণ্ণ এক অন্ধকার প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে শহরটিকে কিংবা কে জানে হয়তো পুরো পৃথিবীকে! প্রতিটি ব্যস্ত দিন ঝিমিয়ে আসে বিষাদময় ক্লান্ত রাতে। এ শহর মুখ লুকায় আধুনিক সমঝোতায়। সমঝোতা সুখের সাথে। আপস স্বপ্নের সাথে। প্রতিটি দিন নাওয়া খাওয়া ঘুমের মতো কিবোর্ডে ঝড় তোলা এই মানুষটিও তাদের একজন। প্রায় পাঁচ বছর আগেও মানুষটি যখন আঠারো-উনিশ বছরের টগবগে এক তরুণ ছিলো তখন সে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতো। বুকের ভেতরে লালন করতো বিপ্লবী হওয়ার ইচ্ছে। নজরুলের কবিতা পড়ে তারও রক্ত গরম হতো। মাঝে মাঝে বিদ্রোহী দুয়েকটা কবিতা সেও লিখতো না তা নয়। সমাজ বদলে দেবার চেতনা খেলা করতো তার চিন্তায়। সে অনেক দিন আগের কথা। কী হবে অসম্ভবের পেছনে ছুটে! সমাজ বদলানো মুখের কথা নয়। আর বিপ্লবী হওয়া? সদ্য আসা তারুণ্যে সবার রক্তই কম বেশি গরম হয়। তারও হয়েছিলো। তা না হলে এরকম ছেলেমানুষি চিন্তা করতো নাকি! মানবতার সকল দায়িত্ব কেনোই বা তাকে নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে! কেনো তাকেই ভাবতে হবে অসঙ্গতিগুলো নিয়ে!

মানুষটি এবার ল্যাপটপ শাট ডাউন করে। তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে। ভোর হতে থাকা মায়াবি নীলচে আলোয় ভাসতে থাকা ছোট্ট রুমটায় দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ বড্ড বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। সকাল আটটায় ক্লাস আছে। মানুষটি জোর করে চোখ বন্ধ করে। একটু না ঘুমোলেই নয়। আধো ঘুম আধো জাগরণে তার মনে হতে থাকে- ধ্যাত, লাইফটা বড্ড বোরিং!

ফারাহ্‌ মাহমুদ সম্পর্কে

অবিদিত, জানো কি? বুকের মধ্যে জল তরঙ্গ নিয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয়া পাপ! অবিদিত, জানো কি? অনুরাগ এক প্রকার সুখকর বিভ্রান্তি..
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

8 Responses to যাপন

  1. অনুজ বলেছেনঃ

    অনুভূতিগুলো কেমন যেন খুব পরিচিত বলে মনে হল।
    তবে আমি বলি কি জান, লাইফ ইজ নট বোরিং! মেয়ার, ইউ ডোন্ট নো, হাও টু স্পেন্ড ইউর লাইফ!

  2. রুহশান আহমেদ বলেছেনঃ

    কথা ঠিক, লাইফটা আসলেই বোরিং। ‘লাইফটা বোরিং’ এই অপশনটা নেয়াই তুলনামূলক সহজ রঙ্গিন করার চেষ্টার চেয়ে। কেননা, অন্ধকারই সত্য! আলো মানেই ফোটনের ছোটাছুটি, তাপ, বিকিরন…এনট্রপি…বিশৃংখলা।

  3. মাধবীলতা বলেছেনঃ

    লেখাটা অনেক ধাক্কা দিল, সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না।

  4. অক্ষর বলেছেনঃ

    এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম ( অবশ্য তাই হওয়ার কথা, এটা ছোট গল্পের ছেয়েও ছোট 😛 ) তবে এই ছোট্ট ছোট্ট কিছু শব্দের মিশেলে লেখা গল্পটা কেন যেন মনে হয় এখনকার অনেকেরই গল্প। খুব ভালো করে খেয়াল করলে সবাই একটু হলেও কি নিজের ছায়াটা খুঁজে পাবে না এখানে ঐ “মানুষ”টির মাঝে? আমার তো মনে হয় পাওয়ার কথা। আমি পেয়েছি। যাই হোক সুন্দর লেখা। লেখা চলতে থাকুক।

    :clappinghands:

রুহশান আহমেদ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।