একজন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় [সরব “মুভি থেকে নেয়া”- ২]

একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করা যাক?

“যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক সৈনিক পালিয়ে আসলো। সবাই বলতে লাগলো- শেষ পর্যন্ত কাপুরুষের মতো পালিয়ে এলে?

 

সৈনিকের উত্তর- ঠিক তা নয়। আমার পালিয়ে আসার পেছনে যুক্তি আছে- যুক্তি বললেই বুঝতে পারবে। যুদ্ধ করলে হয় আমি শত্রুকে মারব, নাহলে শত্রু আমাকে। শত্রু মরলে ক্ষতি নাই, কিন্তু আমি মরলে সমস্যা আছে। হয় আমি আহত হব বা নিহত। আহত হলে ক্ষতি নাই, কিন্তু নিহত হলে সমস্যা আছে, হয় ওরা আমাকে পুড়িয়ে মারবে নাহলে কবর দিয়ে। পুড়িয়ে মারলে ক্ষতি নাই, কবর দিলে সমস্যা আছে। হয় আমার কবরের উপর বড় গাছ জন্মাবে নাহলে ছোট ঘাস জন্মাবে। ঘাস জন্মালে ক্ষতি নাই, কিন্তু গাছ জন্মালে সমস্যা আছে। হয় সেটা থেকে ফার্নিচার তৈরি হবে নাহলে কাগজ। ফার্নিচার হলে নো প্রবলেম, কাগজ হলে দেয়ার ইজ প্রবলেম। ভালো কাগজ হলে সেটা দিয়ে সংবাদপত্র তৈরি হবে, খারাপ কাগজ হলে তা দিয়ে টয়লেট পেপার তৈরি হবে। সেটা দিয়ে মানুষ তাঁদের বটম সাফ করবে। তাই আমি যুদ্ধ করতে আগ্রহী নই, সৈনিক হিসেবে কারো “পায়ুর” জন্য আমি আমার “আয়ু” বিসর্জন দিতে রাজি নই!”
যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে যুদ্ধবিরোধী এই দুর্দান্ত লেভেলের সেন্স অফ হিউমারের কৌতুকটি সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নামটা অপরিচিত ঠেকছে? সেটা হওয়াই স্বাভাবিক, এই লোকের আরেক নাম( যেই নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত) হল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, এক সময়ের টালিগঞ্জ কাঁপানো রুপালী পর্দার চলচ্চিত্র অভিনেতা, যদিও বেশিরভাগ লোকে তাকে শুধু “কৌতুক অভিনেতা” বা “ভাঁড়” বলেই পাড় পেতে চায়। এই মানুষটিকে নিয়ে আমার আজকের লেখা। আলোচনার সুবিধার জন্য আলোচনাকে দুই ভাগে ভাগ করে লিখতে চাই- ব্যক্তি ভানু আর শিল্পী ভানু।

মানুষটা কিন্তু জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট মুন্সিগঞ্জে তার জন্ম। ভানুর বাবা মা দুজনেই ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করতেন- ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে ব্রিটিশ বিরোধী যেকোনো মনোভাব এমনকি কথা বলাও এক প্রকার নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তা না মেনেই মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এভাবে আস্তে আস্তে ভানু রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।  ১৯৪০ সালে ঢাকার বেশিরভাগ অনুশীলন সঙ্ঘের ‘আরএসপি” নামে একটি বামপন্থি দল গঠন করেন যাতে ভানু যোগ দেন। কিন্তু এই রাজনীতিই কাল হল তার জন্য। ১৯৪১ সালে তার বিরুদ্ধে “হুলিয়া” জারি হলে দেশ বিভাগের অনেক আগেই তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে গিয়েও চুপ করে বসে থাকেননি- সেটা সম্ভবত তার রক্তেই ছিল না। ৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ছেলেবেলা থেকেই ভানুর মন ও মননে এক আশ্চর্য প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এই দীনেশ বাবু যখন ব্রিটিশ গোলামদের হাতে মারা যান, ভানু কিছুটা হলেও ভেঙ্গে পড়েন। এই কারণে বিধাতার উপরে বেশ ক্ষোভও ছিল তার, দীনেশের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন- “ভগবান! তোমার লীলা বোঝা ভার! একটা ব্যাপারে তোমার উপরে আমার ভীষণ রাগ- তুমি আত্মার নিজস্ব কোন শক্তি দিলেনা কেন? দিলে দীনেশদার আত্মা এখনকার বাকসর্বস্ব, অসৎ রাজনীতিওয়ালাদের মুণ্ডু ছিঁড়ে ফেলতেন!”

ভানু মনে প্রাণে, কাজে কর্মে নিজেকে কমিউনিস্ট দাবি করতেন। ভানুর আরেকটা যে নাম ছিল, সাম্যময়- সেটা তার মাতামহ রেখেছিলেন, ভানু এই নাম নিয়েও মজা করতেন আর নিজের পরিচয় দিতেন। “That I am a communist, I bear it in my name!” (সাম্য= সমতা)। প্রায়ই একটা কথা বলতেন-জগতের সকল মজার কথাই হল সত্য কথা, তবে সেটা কোথায় আর কীভাবে বলতে হবে তা জানা দরকার। আর শোন, কথাটা কিন্তু আমার না, রসরাজ রাজশেখর বসু আমাদের এটা বলেছিলেন।

ব্যক্তি ভানুকে নিয়ে অনেক কথা হল, এবার শিল্পী ভানুর দিকে আসা যাক। ১৯৪৬ সালে “চন্দ্রগুপ্ত” নামে একটি নাটকে চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং সবার নজরে আসেন। এরপরেই যাত্রা শুরু বিভূতি চক্রবর্তীর “জাগরণ” দিয়ে। তবে শোনা যায়, তার শুরুটা নাকি আরও আগেই হয়েছিল, ষষ্ট শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তিনি “রনবির” নামের একটি নাটকে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে তার অনুপ্রেরণার নাম ছিল “চার্লি চ্যাপলিন”। টালিগঞ্জের তার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ত চ্যাপলিনের এক বিশাল ছবি। সম্ভব হলে প্রায় প্রতিদিন “গ্রেট ডিক্টেটর” দেখতেন, “গোল্ড রাশ” দেখে ভয়াবহ কষ্ট পেয়েছিলেন। “লাইমলাইট” দেখে বাড়িতে এসে কেঁদেছিলেন।

কমেডিকে কখনই ভাঁড়ামি মনে করেননি, বরং কমেডিকে চলচ্চিত্রে একটা শক্তিশালী জায়গা দিয়েছিলেন তিনি।উত্তম সুচিত্রা জুটির চেয়ে তার দাপট কোন অংশে কম ছিল না। একটা নমুনা দেই- ওরা থাকে ওধারে নামক সিনেমাতে সুচিত্রা সেনের দৈনিক পারিশ্রমিক ছিল দেড় হাজার টাকা, একই সিনেমাতে ভানুর দৈনিক পারিশ্রমিক ছিল এক হাজার টাকা। অথচ এই মানুষটা যখন কাজ শুরু করেন, তখন তার পারিশ্রমিক ছিল দৈনিক আড়াইশো টাকা। পরিচালক আর প্রযোজকের সাথে পারিশ্রমিক নিয়ে ঝগড়ার সময় তিনি বলতেন- “নায়ক নায়িকাই কেবল শিল্পী? চরিত্র খালি ওরাই সৃষ্টি করে? পার্শ্ব চরিত্রে যারা কাজ করে তারা সবাই গরু গাধা? তাঁদের অবদান কোন অংশে কম?”
সদা আত্মবিশ্বাসী এই মানুষটি এভাবেই সর্বদা সত্য বলে গেছেন, কখনও হাস্যরসের মাধ্যমে, কখনও সিরিয়াস ভঙ্গিতে, কাওকে পরোয়া না করেই। প্রায় তিনশোর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও, “প্রধান” চরিত্রে তাকে কমই পাওয়া গেছে, যদিও প্রধান না হয়েও তিনি পরোক্ষভাবে প্রধান ছিলেন। সেই আমলে কোন অভিনেতার নামে পুরো একটি সিনেমা তৈরি হয়নি, স্বয়ং উত্তমকুমারকে নিয়েও নয়। কিন্তু ভানুকে নিয়ে হয়েছিল, “ভানু পেল লটারি” আর “ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট”। মানুষটার দাপট ও জনপ্রিয়তা এ থেকেই বোঝা যায়। অনেকের মতে সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমাতে তিনি উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে ছাড়িয়ে গেছিলেন। তার “মাসিমা, মালপোয়া খামু” সংলাপটি আজও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখে ঘুরে ফেরে।

ভানুর জীবনের একটি বিশেষ সিনেমা হল “যমালয়ে জীবন্ত মানুষ”। একটু খুলে বলা যাক- ভানুকে মৃত ভেবে দুই যমদূত তাকে যমালয়ে নিয়ে যান। সেখানে ঘটনাক্রমে ধর্মরাজের সিংহাসনটি দখল করেন তিনি। এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ধর্মের বিধান সংস্কার শুরু করেন। মানুষের পাপ পুণ্যের হিসাব যারা রাখেন তাঁদের মাঝে একজন হলেন বিচিত্রগুপ্ত। তার সাথে কথোপকথনের সময় মানুষের আয়ুর বিধান নিয়ে ভানু বলেন- “কি আমার বিধানরে! সুন্দর ফুটফুটে শিশু,মায়ের কোল উজ্জ্বল করে আছে, সে মরে গেল! ২০ বছরের জোয়ান ছেলে , দেশের আশা ভরসা-তার অকালে মৃত্যু! আরে বাবা, অকাল মৃত্যুই যদি হবে, জন্মাল কেন তাহলে?” এরপরেই বিচিত্রগুপ্তকে নিয়ম পরিবর্তন করে ভানু লিখতে বলেন, “লেখ, একশ বছরের আগে কোন মানুষের মৃত্যু হবেনা। আপনারা নিজেরা অমর হয়ে থাকবেন- আর মানুষের বেলায়? যতোসব! না না, শুধু বেঁচে থাকবে না।… লেখ, অদক্ষ বা পঙ্গু হয়ে নয়, মানুষ বেঁচে থাকবে মানুষের মতো হয়ে!”

বস্তুত এটা সিনেমার সংলাপ হলেও, সাম্যবাদী ভানুর মনের কথাই ছিল এটা- মানুষ বাঁচবে মানুষের মতো। যমালয়ের এই কৃত্তিম ভানুই ছিলেন “মানবালয়ের” প্রকৃত ভানু। বলাবাহুল্য- এটাও কিন্তু ছিল কমেডি সিনেমা। কিন্তু কমেডির রূপ বিভিন্নরকমের হলেও, তার উদ্দেশ্য সর্বত্র ও সর্বদা এক- ব্যাঙ্গের অস্ত্র দিয়ে অন্ধকার, অত্যাচার ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই- ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এই জিনিসটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন।

অভিনেতা হিসেবে ভানু প্রতিষ্ঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও, তিনি কখনও বদলে যান নি। তবে তার এই সচ্ছলতাও কিন্তু সবসময় ছিল না, টালিউড সিনেমার সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনে প্রযোজকদের বিরুদ্ধে আর অভিনেতাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি- এ কারণে টানা পাঁচ বছর তাকে “ব্ল্যাক লিস্টেড” করা হয়, কোন কাজ পাননি তিনি। কাজ পেলেও করবেন কীভাবে? কারণ জীবনে একটি কাজই শিখেছিলেন তিনি- অভিনয়!

ব্ল্যাক লিস্টেড করেও কেও দমাতে পারেনি ভানুকে, যাত্রাদল নিয়ে গ্রামে গঞ্জের মাঠে মাঠে যাত্রা করে বেড়াতেন তিনি। বেশ কয়েকটি কৌতুকের এ্যালবামও আছে তার, যার প্রথমটি বের হয় ১৯৪৩ সালে, নাম ছিল “ঢাকার গাড়োয়ান”। এভাবেই আজীবন কাজ করে গেছেন তিনি, কোন কিছুই তাকে থামাতে পারেনি, এমন একজন শিল্পী তিনি যিনি কারো কাছে হার মানেননি। কেও তার উপরে প্রভুত্ব খাটাতে পারেনি, নিজেকে নিজের মত করেই উপস্থাপন করেছেন তিনি। কাজের মধ্যে থেকেই ১৯৮৩ সালের৪ মার্চ কলকাতায় পৃথিবী ত্যাগ করেন তিনি।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সম্পর্কে বলেছেন, “পূর্বসূরির প্রতি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা, সমসাময়িকের প্রতি এমন দ্বিধাহীন, ঈর্ষাশূন্য স্বীকৃতি আর কয়জন শিল্পীর মাঝে দেখত পাই?”

শেষ করছি ভানুর একটি উক্তি দিয়ে, “আমাগো দেশে এইটাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে!”

ছোট্ট এক লাইনের এই বাক্যটির আড়ালে কতটা বেদনা, কতটা আফসোস, কতটা জীবনদৃষ্টি লুকিয়ে আছে, তা হয়তো কেবল ভানুই জানতেন। ভাঁড় ভেবেই লোকে হয়তো তাকে এখন ভুলতে বসেছে- ইতিমধ্যে বেশভালভাবে ভুলে গেছেও বলে মনে হয়। বাঙালি জাতি বলে কথা- নিজের প্রতিভার কথা মনে রাখার মতো স্মরণশক্তি তার নেই, তাই আরেকটি ভানু জন্মায় নি বাংলায়, জন্মাবেও না। তবে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদানকে, তার শৈল্পিক সত্তাকে, তার ব্যক্তিসত্তাকে, তার চিন্তাকে,হাস্যরসের মাধ্যমে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামকে কেও অস্বীকার করতে পারবে না, অস্বীকারের “ভান” করেও “ভানুকে” অস্বীকার সোজা না।

সৈয়দ নাজমুস সাকিব

 

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে চলচ্চিত্র-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

2 Responses to একজন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় [সরব “মুভি থেকে নেয়া”- ২]

  1. নূহা চৌধুরী বলেছেনঃ

    :welcome:

    চমৎকার লেখনী। লেখকের শুভ কামনা। 😀

  2. অনুজ বলেছেনঃ

    চমৎকার লেখনী! বেশ ভালো লেগেছে!
    :clappinghands:

    বাঙলা সিনেমার জগতে হাস্যরসের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রদ্ধাঞ্জলী!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।