” সিনেমা বদলায় নাকি আমরা ” [সরব “মুভি থেকে নেয়া”-১৮]

ইয়া ধিসুম ম ম ম  বাংলা সিনেমার নায়কের ঘুষির দৃশ্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দের অভূতপূর্ব সমন্বয় পরিবারের সবাইকে নিয়ে সাগ্রহে দেখার মধ্য দিয়েই সম্ভবত আমার জেনারেশন এর অধিকাংশের সিনেমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আজকাল আমরা যদিও বাংলা ছিঃনেমা বলে নাক সিটকাই তবুও খুব মানুষেরই বোধহয়  বলতে পারবে  IELTS এ 7 স্কোর নিয়ে জন্মিয়ে ইংলিশ সিনেমা দেখার জন্যই তাদের এ ধরায় আগমন। বেশ মনে আছে ছয় সাত বছর বয়সের দিনগুলোর কথা যখন বাসায় ডিশ ক্যাবল এর আগমন হয়নি। বৃহস্পতি আর শুক্রবার দুইদিন একমাত্র চ্যানেল বিটিভির সাড়ে তিনটার বাংলা সিনেমার জন্য চৌদ্দ ইঞ্চি সাদাকালো টিভিটার সামনে অধীর আগ্রহে বসে থাকা ছিল নিত্যদিনের রুটিন। সেই ছোট্ট টিভিটা অবশ্য রেখে দেয়া হয়েছে অতীত এর সাক্ষী হিসেবে এবং এখনও কিন্তু সেটাতে ছবি দেখা যায় !

বাংলা ছবির এই অদ্ভুত মোহময়তা হটাৎ করেই কেমন যেন কেড়ে নিলো ডিশ ক্যাবলের আগমনের পর কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেলটা। ঘোলা প্রিন্টেরএকই পানসে গল্পের বাংলা সিনেমার চাইতে টম অ্যান্ড জেরির মারামারি,পপাই এর প্রেম,ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট,স্পাইডার ম্যান, ব্যাটম্যান এর মত সুপারহিরোরা ঝকঝকে প্রিন্টে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল ক্লাস সেভেন এইট পর্যন্ত। এর মধ্যে অবশ্য আস্তে আস্তে হিন্দি ভাষার সাথে সাথে হিন্দি সিনেমার সাথেও খানিকটা পরিচয় হয়ে গিয়েছে। এই বয়সেই প্রথম প্রেম প্রেম ভাব জাগ্রত হয় বলেই হয়ত শাহরুখ এর রোমাঞ্চ কিংবা ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া শুরু করলাম খুব সহজেই। আর এরই মধ্যে বাসায় ডেস্কটপ এর আগমন হওয়ায়  দশ টাকায় সিডি বা ডিভিডি ভাড়া এনে পুরদমে হিন্দি সিনেমা আরইংরেজি ভাল না বুঝতে পারায় শুধু একশন নির্ভর দু একটা ইংলিশ সিনেমা দেখেই চলতে লাগলো দিন।

প্রথম সিনেমা হলে পঞ্চাশ ফুট লম্বা প্রেমিক গরিলা KING KONG কে দেখার অভিজ্ঞতাটা বেশ রোমাঞ্চকর ছিল মনে আছে। ক্লাস নাইন এ পরার সময় প্রথম বলাকাতে সিনেমা দেখতে যাই সেখানকার একসময়ের নিয়মিত দর্শক ইউনিভার্সিটি লাইফ এ জগন্নাথ হলের প্রাক্তন ছাত্র আমার বাবার সাথে। সিনেমা শুরুর আগে বাবার মুখে দশ টাকায় দলবেঁধে বলাকায় সিনেমা দেখার গল্প শুনে ভালই বুঝতে পারছিলাম আমার এই সিনেমাপ্রীতির উৎস কোথায়!এরপর থেকে মোটামুটি কলেজ এর লাস্ট ইয়ার থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বসুন্ধরার সিনেপ্লেক্স হয়ে গেছে বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটানোর এক সহজ,আকর্ষণীয় ও নিরাপদ উপায়। সিনেমা হল প্রসঙ্গে মনে পরে গেলো সুন্দরী তরুণীর পেপসি হরণের ঘটনাটা। গতবছর এই সময়ই সম্ভবত অনেক সুপারহিরোকে নিয়ে করা এভেনজার সিনেমাটা দেখতে গিয়েছি কয়েকজন বন্ধু মিলে। সিনেপ্লেক্সে গমনকারী সবারই জানা আছে যে সিনেপ্লেক্স এর প্রতিটি সিট এর ডানপাশে হাতের কাছে থাকে একটা করে কোমল পানীয় রাখার গ্লাস হোল্ডার। হাফ টাইম এর ব্রেক এর পর সিনেমা শুরু হলে HULK এর হাতেঅসহায় LOKI র আছাড় খাওয়া দেখতে দেখতে কখন যে উত্তেজনায় বাম পাশে বসা সুন্দরীর আধ খাওয়া পেপসির ক্যান বাঁ হাতে তুলে সাবাড় করে দিয়েছি টের পাইনি। সম্বিৎ ফিরে পেলাম ডান পাশে বসা বন্ধুদের অট্টহাসি শুনে আর বাম পাশে বসা সুন্দরীর রাগত দৃষ্টি দেখে। আমার এই গোবেচারা চেহারা দেখেই কিনা কে জানে সেই সুন্দরী আর তার পাশে বসা বডিবিল্ডার প্রেমিককে শুধু সরি বলেই সে যাত্রা রেহাই পেলাম।

কতিপয় বন্ধুর কাছে পোর্টেবল  IMDB আখ্যায়িত এই আমি এখন অবশ্য সিনেমার ব্যাপারে সর্বভুক হয়ে গেছি। যে কোন সময় যেকোনো ধরনের সিনেমা গোগ্রাসে গিলে হজম করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে আমি এখন সিদ্ধহস্ত। আনিমেশন সিনেমাতে হৃদয়হীন রোবট WALLE  প্রেম কিংবা পেটুক পাণ্ডা PO এর কীর্তিকলাপ দেখে যেমন পুলকিত হই তেমনি FORRERT GUMP এ JENI র মুখে Run Forrest run……. শুনতে শুনতে ভাবি এমন একটা দৌড় কি আমাদের পুরো জীবনের দৌড়টাকে বদলে দিতে পারে না। এরই সাথে কল্পনির্ভর সুপারহিরোদের নিয়মিত আসা যাওয়া আর মন ভাল করে দেয়া গানসহ হিন্দি সিনেমাগুলো তো ভুরিভোজ এর পর ডেসার্ট এর কাজ করেই। এমনকি ইদানিং কালের ভিন্নধর্মী বাংলা সিনেমাগুলো যে আমাদের পুরনো ধারণাকে অনেকটাই পালটে দিতে পারবে সেটা না দেখলে বোধহয় বোঝানো কঠিন হবে। পুরো লেখাটা একবারে লেখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে দেখে এর মাঝেই অ্যাকুয়া রিজিয়া আপুর ফেসবুক এ সাজেস্ট করা The Fault In Our Stars সিনেমাটা দেখে বেশ রিচার্জড হয়ে নিলাম। ভাগ্যিস মানুষ উড়োজাহাজ,মোবাইল, আর ফেসবুক এর পাশাপাশি সিনেমাটাও আবিষ্কার করেছিল, নইলে আমাদের যে কি হোতো! তবে এতদিন ধরে এত সিনেমা দেখে আমার মত গাধামানবের উপলব্ধি হচ্ছে বাকী জীবনটা ভালমতো কাটানোর জন্য আমাকে সিনেমাই দেখতে হবে। আর সিনেমাতো আসলে বদলায় না, বয়স আর সময়ের সাথে সাথে বদলায় আমাদের পছন্দ। এভাবেই না হয় চলতে থাকুক সিনেমার সঙ্গে আমাদের পথচলা।

 

তবে আজীবন সিনেমাতে দুইদিনের পরিচয়ে নায়কের দারিদ্র্য আর সততা দেখে নায়িকার প্রেমে বিহব্বল হওয়ার দৃশ্য দেখে আমরাই নায়িকার চেয়ে বেশি আবেগাপুলত হয়ে পরলেও বাস্তবে যে সে আশা গুড়ে বালি তা আমি কিছুদিন হল বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছি। দুবছরের নিঃশব্দ অনসরণ ও বাস্তব জীবনে অর্থহীন।প্রমাণিত হল। যদিওবা কোন বিশেষ দুর্ঘটনা কিংবা দৈববলে সিনেপ্লেক্স এর এক জোড়া টিকেট আমার কপালে জুটেও যায়, সে কি আমার সঙ্গে যেতে রাজি হবে?? কেউ কি আমার হয়ে একটু বলে দেবেন???

নামঃ কৌশিক বিশ্বাস

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে চলচ্চিত্র-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।