শিক্ষাব্যবস্থা: “হীরক রাজার দেশ” বনাম “বাংলাদেশ”

১.

সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” সিনেমার হীরক রাজ্য, আর সম্প্রতি পড়া নসীম হিজাযীর “কিং সায়মনের রাজত্ব” উপন্যাসের শাদা উপদ্বীপ — এই দুই ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থার কথা আজকাল মাঝেমাঝেই মনে পড়ে। কিং সায়মন বারবার তার মন্ত্রীসভা পরিবর্তন করলেও রাজ্যের সবচাইতে রাবিশ-বোগাস-স্টুপিড, চোর-টাউট-বাটপার, অ্যান্ড মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি কিং সায়মনের পদলেহনে সবচেয়ে অভিজ্ঞ — এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে মন্ত্রী বানিয়ে দিতেন! আর ওদিকে সত্যজিতের হীরক রাজা “জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই” মন্ত্র প্রচার করে রাজ্যের পাঠশালাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন! কারণ রাজার মতে, “যে যত বেশি জানে, সে তত কম মানে।”

এই দৃশ্যগুলো বোধকরি কেবল নাটক-সিনেমা কিংবা গল্প-উপন্যাসেই মানায়।

২.

পিএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা প্রথম থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। এই দু’টো পরীক্ষা আসলেই ভালো কোন ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলতে পারে; তবে ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ার চেয়ে বরং পরীক্ষা না হওয়াটাই যে শতগুণ ভালো, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। প্রশ্নপত্র এবারো পুরোদমেই ফাঁস হচ্ছে! এই মহামারী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করার পর অনেক সময় পেরিয়ে গেল, কিন্তু এর বিপরীতে ফেইসবুকে কিছু স্ট্যাটাস আর পত্রপত্রিকায় কিছু কলামের জন্ম হওয়া ছাড়া ইতোমধ্যে এমন ফলপ্রসূ কিছু ঘটতে দেখা যায় নি। অতএব ফাঁস বন্ধ হওয়ারও কোন কারণ নেই।

এ তো গেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা। এদিকে জেএসসি পরীক্ষার একটা কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে আরটিভির একটা রিপোর্ট চোখে পড়লো। রিপোর্টটা দেখে আমি লিটারেলি আঁতকে উঠেছি! প্রশ্ন ফাঁস হবার পর যদি আবার পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রের পরিবেশেরও এই হাল হয়, তবে আর কিছুই বলার নেই। নিঃসন্দেহে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও নিকৃষ্টতম অধ্যায় পার করছে! অতীতের একটা সময়কে “নকলের যুগ” বলে আখ্যা দেয়া হয়, কিন্তু আমার ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতির কাছে সেটা কিছুই ছিল না। কারণ সে আমলে যারা নকল করত, তারা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হত। আর ভালো ছাত্র যারা পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিত, একটা পর্যায়ে গিয়ে নিজেদের যোগ্যতাবলে তারাই উন্নতি করত। এখনকার “নকল”গুলো আগের মত নেই বটে, কিন্তু এটা যে আধুনিক রূপ এখন ধারণ করেছে, তাতে সর্বনাশটা হচ্ছে সবার, মেধাবী-অমেধাবী নির্বিশেষে। কারণ ভালো ছাত্ররাও এখন পড়াশোনা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অব্যাহতভাবে প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকলে এই পরিণতি অবশ্যম্ভাবী। এই জেনারেশন যা দেখে ও শিখে বড় হচ্ছে, তাতে অবস্থার উন্নতি না ঘটলে ভবিষ্যতে তাদের কাছ থেকে দেশ “ইতিবাচক” কিছু পাবে, এই স্বপ্ন দেখা বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে বলেই মনে হয়।

৩.

এখন প্রশ্ন হল, এভাবেই কি চলতে থাকবে? চলতে পারে? হীরক রাজার গৃহপালিত বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কৃত “মগজ প্রক্ষালন যন্ত্র” জিনিসটার অস্তিত্ব তো বাস্তবে নেই। অতএব, অতি শীঘ্রই নিজেরাই নিজেদের বিবেক ও মগজকে পজিটিভলি প্রক্ষালন করতে শেখার কোন বিকল্প নেই। অন্যথায় হীরক রাজ্য আর শাদা উপদ্বীপের কাল্পনিক অবস্থার সাথে বাংলাদেশ নামক বাস্তব ভূখণ্ডের পার্থক্য ক্রমশ আরও সরুই হতে থাকবে। সেই ভয়াবহ অবস্থার হাত থেকে আল্লাহ আমাদের রেহাই দিন, এটাই প্রত্যাশা।

শাহরিয়ার সম্পর্কে

সারাদিন নানান ধরণের চিন্তাভাবনা মাথায় কিলবিল করতে থাকে। তার কিছু অংশ ডায়েরির পাতার পরিবর্তে এখানে স্থান দেয়ার প্রয়াসে...
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বিবিধ-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

7 Responses to শিক্ষাব্যবস্থা: “হীরক রাজার দেশ” বনাম “বাংলাদেশ”

  1. রুহশান আহমেদ বলেছেনঃ

    কি করুম ভাই… বড়ই অশান্তি লাগে এগুলা দেইখা।

  2. পাহাড়ি কন্যা বলেছেনঃ

    আমার মনে হয়, ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জন্য পি এস সি পরীক্ষা বেশিই হয়ে গেছে! এসব প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক পরীক্ষার জন্যই বাবা-মায়েরা তাদের বাচ্চাদের উপর মানসিক চাপ দিতে থাকে। এস এস সি, এইচ এস সি লেভেলে সেই চাপ বুঝতে পারা বা সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো সবার হয়ে যায়। কিন্তু ১০/১২ বছরের বাচ্চার উপর এই চাপ দিলে তাদের কি অবস্থা হয় ভাবতেই ভয় লাগে! আর ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চাকে যদি তার বাবা-মা বলে, ‘প্রশ্ন নাকি ফাঁস হয়েছে, যাই জোগাড় করে নিয়ে আসি’, তাহলে ঐ বাচ্চাই বা কি শিখবে? নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা তো পরিবারেই শুরু। এই যদি হয় তার অবস্থা, তাহলে নীতি বলে যে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না এটা বলাই বাহুল্য!

    • রুহশান আহমেদ বলেছেনঃ

      সরকার একটা পরীক্ষা চালু করল, যার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। মানলাম, আমাদের সরকার খারাপ। জনগনের ভালো বুঝেনা। কিন্তু, আমরা জনগন কেন এত অবুঝ? আমাদের বাবা-মা কেন এভাবে সন্তানদের চাপ দিবেন? বাবা-মা, টিচারের হেল্প ছাড়া ক্লাস ফাইভের এক স্টুডেন্টের পক্ষে কি ফাঁস করা প্রশ্ন যোগার করা/ এর মাজেজা বুঝা সম্ভব?

      • শাহরিয়ার বলেছেনঃ

        জনগণ কেন অবুঝ সেই উত্তর তো নাই রে ভাই! শুধু সন্তানদের চাপ দেয়ার কথাই বা বলি কেন, আমি তো মনে করি এই প্রশ্নপত্র ফাঁসটা ভাইরাল হওয়ার পিছনে অভিভাবক সমাজ অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। সরকার/প্রশাসন দায়ী তো অবশ্যই, কিন্তু তার পাশাপাশি একটা বিরাট সংখ্যক অভিভাবকদের “পরোক্ষ সায়” এবং “প্রত্যক্ষ তৎপরতা” না থাকলে এটা কোনদিনই এই পর্যায়ে আসত না।

        এজন্যই তো বললাম, ইমিডিয়েইটলি নিজেদের বিবেক এবং মগজ প্রক্ষালন করতে না শিখলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

    • শাহরিয়ার বলেছেনঃ

      পাহাড়ি কন্যা যথার্থ বলেছেন। সহমত।

  3. Sirajis Salekin বলেছেনঃ

    পুরাই ছেলুকাছ :crying: :penguindance:

রুহশান আহমেদ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।