আগস্ট 28, 2015

ট্রি-মেইল: প্রিয় বৃক্ষকে পাঠিয়ে দিন ই-মেইল

স্কুল-কলেজে থাকতে ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান’/ ‘পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন’ রচনা আমরা সবাই পড়েছি। রচনার বিভিন্ন অংশে আমরা বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব, বৃক্ষনিধনের অপকারিতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধে বৃক্ষের অবদান এসব পয়েন্ট গতানুগতিকভাবে লিখে এসেছি। আরেকটি কমন পয়েন্ট যেটা আমরা মোটামুটি সবাই এক অর্থে মুখস্থ লিখে দিতাম তা হল, বৃক্ষরোপণ অভিযানে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়াকে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে। আর ঠিক এই সচেতনতা বর্ধনের জায়গাটিতেই চমক দেখিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন সিটি কাউন্সিল। তারা যে অভিনব পদক্ষেপটি গ্রহণ করেছে তা হল- ট্রিমেইল।

 

1

 

ট্রিমেইল নিয়ে বিস্তারিত কথা বলার আগে চলুন ঝটপট করে চোখ বুলিয়ে আসি কিছু দারুণ ট্রিমেইলের দিকে। আমি ভাল অনুবাদক নই, তাই অনুবাদ না করে ট্রিমেইলগুলো সরাসরি ইংরেজিতে তুলে দিলাম।

 

ট্রিমেইল-১

 

Weeping Myrtle, Tree ID 1494392

5 July 2015

Hello Weeping Myrtle,

I'm sitting inside near you and I noticed on the urban tree map you don't have many friends nearby. I think that's sad so I want you to know I'm thinking of you. I also want to thank you for providing oxygen for us to breath in the hustle and bustle of the city.

Best Regards, N

 

ট্রিমেইল-২

 

Gum, Tree ID 1032002

11 July 2015

Dear Gum,

Apologies if that's not the form of address you prefer. I wanted very much to tell you how much I miss your family. I've lived in Texas for two and a half years now, and I so fervently miss the heady scent of your cologne as the morning sun warms you.

I miss your gentle swish swish as the wind tousles your leaves playfully. I miss your strong white trunk, rising majestically from the earth, striking up towards the clouds. I miss the dappled shade you so generously provide.

The sound of magpies, harbouring in your foliage, does not grace my ears. The silver green of your long, lithe leaves does not appear in my current surrounds.

I miss you, Gum. I miss all that you represent for me. Stand tall and strong, and know that my heart reaches out to you across the seas.

With immense fondness, A

 

ট্রিমেইল-৩

 

Variegated Elm, Tree ID 1033102

13 July 2015

Dear Elm, I was delighted to find you alive and flourishing, because a lot of your family used to live in the UK, but they all caught a terrible infection and died. Do be very careful, and if you notice any unfamiliar insects e-mail an arboriculturist at once. I miss your characteristic silhouettes and beautifully shaped branches - used to be one of the glories of the English landscape - more than I can say. Melbourne must be a beautiful city.

Sincere good wishes, D

 

ট্রিমেইল-৪

 

Golden Elm Tree ID 1040779

11 July 2015

Dearest Golden Elm Tree, I finally found you! As in I see you everyday on my way to uni, but I had no idea of what kind of tree you are. You are the most beautiful tree in the city and I love you ^_^ It always makes me so happy to see you standing there minding your own business. I have to say, you have the most beautiful canopy and I love how the light green leaves on your branches contrast with the darkness of your trunk. We really should have more trees of your kind in our city.

Stay awesome.

Hugs! A

 

ট্রিমেইল-৫

 

English Elm, Tree ID 1032245

14 July 2015

Are you and your fellow English Elms enjoying the Ashes series as much as we in England are, and are you giving the native Aussie trees some stick over their team's performance?

 

2

 

এবার চলুন একটু জেনে নেই এই প্রজেক্টের ইতিকথা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে। ২০০৯ সালের ভয়াবহ খরায় অস্ট্রেলিয়ার ‘গার্ডেন সিটি’ খ্যাত মেলবোর্নের প্রায় ৪০ শতাংশ গাছ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। এই অবস্থায় একটি কর্তৃপক্ষের যা করণীয় হতে পারে ঠিক তেমনভাবেই এগুচ্ছিল মেলবোর্ন কর্তৃপক্ষ। যেমন- তারা চিন্তা করছিল কিভাবে বৃক্ষরোপণের হার বাড়ানো যেতে পারে, বিভিন্ন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তারা ধারণা করার চেষ্টা করছিল আগামী কয়েক বছরে এই সঙ্কট কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেল, আগামী ২০ বছরে প্রায় প্রতি ১০ গাছের মধ্যে ৪টি গাছ বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে। এই অবস্থায় তারা হিসাব করে দেখল, প্রতি বছর যদি ৩০০০ নতুন গাছ তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে লাগাতে পারে, তাহলে ক্যানপি কাভার ২০ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা যাবে। আর তা সম্ভব হলে প্রখর গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস কমে যাবে।

 

এখন সিটি কাউন্সিল ভেবে দেখল, গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী তো পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সেই সাথে জনসচেতনতাও বাড়ানো দরকার। এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন সিংহভাগ মানুষ এবং গোটা তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন করছে, তখন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতেই পারে! এই চিন্তা থেকেই কর্তৃপক্ষ পুরো শহরের যত গাছ আছে, প্রতিটি গাছের জন্য আইডি নম্বর ও ইমেইল অ্যাড্রেস ঠিক করল। এছাড়া কোন গাছটি সুস্থ, কোন গাছটি রোগাক্রান্ত, কোন গাছটি অর্ধমৃত- এসব পয়েন্টও তারা চিহ্নিত করল। ইমেইল সিস্টেমের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, কোন নির্দিষ্ট গাছ যে কমিউনিটি বা এলাকার অন্তর্ভুক্ত, সেখানকার মানুষ যেন গাছের বিভিন্ন সমস্যা জানিয়ে মেইল করতে পারে। তাতে করে কোন গাছের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে বা ডালপালা ভেঙ্গে যাচ্ছে এসব ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ দ্রুত জানতে পারবে এবং পদক্ষেপ নিতে পারবে। গুগল ম্যাপের আদলে তারা মেলবোর্ন শহরের ম্যাপে প্রতিটি গাছের অবস্থান ও বর্ণনা দারুণভাবে তুলে ধরেছে যা দেখে আমি রীতিমত মুগ্ধ হয়েছি। নিচের লিঙ্কে গিয়ে এক নজরে দেখে আসতে পারেন তাদের অসাধারণ ওয়েবসাইটটি:

http://melbourneurbanforestvisual.com.au/

 

Urban Forest Visual

 

এই ট্রিমেইল চালুর পর থেকে গত ২ বছরে প্রায় ৩০০০ মেইল এসেছে। দেখা গেল, বেশিরভাগ মেইলেই গাছের প্রতি ভক্তি, অন্যকথায় যাকে বলা যায় বৃক্ষপ্রেম, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু, মেলবোর্ন কর্তৃপক্ষ এটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে। তারা বলছে, ইকোসিস্টেমের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বৃক্ষরোপণের প্রতি উৎসাহ বাড়ানোই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এখন তারা দেখছে, কেবল ইকোসিস্টেম নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গল্পের সাথেও যে একেকটি গাছ জড়িয়ে আছে, তার প্রতিফলন ঘটেছে প্রাপ্ত ট্রিমেইলগুলোতে। আর এতেই তারা তাদের কর্মসূচিকে অনেকটা সার্থক মনে করছে।

 

3

 

আমারও কি মনে হয় জানেন? আমাদের দেশেও যদি এরকম ট্রিমেইল চালু করা হত, তাহলে আমিও হয়তো আমার ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখের ঐ মাথা উঁচু করে একলা দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছ কিংবা আমাদের বাসার পেছনের ঐ মেহেদি গাছকে কিছু প্রিয় কথা বলতে পারতাম 😛  ব্যাপারটা যত বেখাপ্পাই শোনাক না কেন, আমার কাছে কিন্তু মন্দ লাগেনি।

 

লেখা শেষ করব রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘বৃক্ষবন্দনা’র অংশবিশেষ দিয়ে (যা আমরা কমবেশি সবাই রচনায় লিখতাম)-

 

‘অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান

প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ;

ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা

ছন্দহীন পাষাণের বক্ষ- ‘পরে; আনিলে বেদনা

নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে......

জলস্থল শূন্যতল, ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন-

শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,

যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয়,

সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনু

রঞ্জিত করিয়া নিল, অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনু

উত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে......

তব প্রাণে প্রাণবান,

তব স্নেহছায়ায় শীতল, তব তেজে তেজীয়ান,

সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব, তারি দূত হয়ে

ওগো মানবের বন্ধু, আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল’য়ে

শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি

অর্পিলাম তোমায় প্রণামী।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি ম্যাগাজিন, সিটিমেট্রিক

4 comments on “ট্রি-মেইল: প্রিয় বৃক্ষকে পাঠিয়ে দিন ই-মেইল”

    1. দারুণ তো বটেই। আমি আশ্চর্য হয়েছি ওদের ওয়েবসাইট দেখে। কতটা খেটে কাজগুলো করেছে ওরা! খুব জানতে ইচ্ছে করে আমাদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এমন ভিন্নধর্মী প্রজেক্ট আছে কিনা :thinking:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Copyright 2019