চেরি,ফুলের নামে নাম আর মাঝরাতের গল্প!

ঈদ মানে অনেকের জন্য বাইরে ঘুরাঘুরি, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কিংবা বিশেষ প্রিয়জনের সাথে ভাল কিছু সময় কাটানো।কিন্তু আমার কাছে পুরাই উলটা, নিজের মনের চোখ আর মাথার চোখকে আরেকটু শাণিত করার ইচ্ছা ভালো কিছু কল্পিত কাহিনী আর মানুষের সম্পর্ক কে আরেকবার জেনে নেওয়ার মাধ্যমে,সেইজন্য দেখা যায় সব কিছু বাদ দিয়ে ভালো নাটক আর টেলিফিল্ম    খুঁজে বেড়াই চ্যানেল থেকে চ্যানেলে।

এখন চাইলে বাজে নাটক আর অনুষ্ঠান নিয়ে লিখতে পারি, কিন্তু ভালটা জানানো বেশি জরুরী মনে হয়।সত্যি বলতে এইবার কিছু ভাল কাজ দেখেছি যে টিভির সামনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসেছিলাম।

যেমন জয়া আহসান অভিনীত আর মাহমুদ দিদার এর রচনা আর পরিচালনায় “ চেরি,ফুলের নামে নাম” এই নাটক দেখে আরেকবার সম্মান করতে ইচ্ছা করেছে জয়া আহসানকে। একজন ভ্রাম্যমান নারীর নাম ভুমিকায় তাকে দেখা যায়।জয়া আহসান এখানে নিজের আধুনিক সুন্দর মুখশ্রী ছাপিয়ে এত সাবলীল ভাবে অভিনয় করেছেন যে টিভির পর্দায় তার কথা বলার ধরন,তাকানোর ধরন এবং বিশেষ করে স্পিচ থ্রো এর যে টাইমিং সত্যিকার মনে হবে। বুকের মধ্যে ভীষণ কষ্ট হবে চেরি এর জন্য।বিজ্ঞাপনী সংস্থার সৃজনশীল লেখক রুদ্র এর স্বপ্ন তাদের নতুন বাল্ব এর বিজ্ঞাপনে চেরিকে দেখানো হবে অন্ধকার জীবন থেকে আলোকিত জীবনে নতুন ভাবে আসতে লাইট বাল্ব সত্যিকার অর্থে কিভাবে সাহায্য করতে পারে।এইরকম স্বপ্নের দুনিয়ায় চেরি হয়ত ভেসে যায় কিন্তু কিছু বাস্তব ঘটনা দেখা যায়।পার্কে একটা ছোট ঘর বানিয়ে থাকত চেরি,বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যস্ততার জন্য তার সেই ঘর দখল হয়ে যায় আরেকজন ভ্রাম্যমাণ নারীর হাতে।মার্জিত বেশধারী চেরি এইটা দেখে সবভুলে গালাগালি করে, তার ঘর চাওয়ার দৃশ্যটা অনেক বাস্তব।এই জায়গায় ক্যমেরার কাজ এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে কবিতার লাইনগুলো পুরো ব্যপারটা কে এত মাখিয়ে দেয় যে আরেকবার কষ্ট লাগে চেরির হারানো কঠিন অতীতের জন্য।নাটকের আরেকটা ব্যপার ছিল দর্শককে ধরে রাখা।জয়া আহসান তার সচ্ছন্দ অভিনয় এবং ঘটনার পরম্পরা তালে তালে আগিয়েছে।যদিও জানি পত্রিকার সুত্রে কাহিনী কী তারপরো একঘেয়েমি লাগেনি! পার্শ্ব অভিনেতা আহমেদ রাসেল নতুন কিন্তু শুরুটা বেছে করেছেন বলে তাকে ও সম্মান জানালাম।

 

এই নাটক ক্যমেরার কাজ এর জন্য এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জন্য প্রশংসার দাবীদার।নাটক শেষ হয় চেরির সাফল্য এবং তাকে দেখে স্বপ্নভুক কিছু ভ্রাম্যমাণ নারী আর সৃজনশীল মানুষদের আগমনকে দিয়ে। এখানে দর্শককে চিন্তা করার সু্যোগ দেওয়া হয়েছে যেটা অনেক নাটকেই দেখা যায়নি এইবার।নাট্যকার এইজন্য আরেকবার প্রশংসা পাবে।

মোশাররফ যে কী পরিমান মেধাবী এবং স্বতস্ফূর্ত অভিনেতা তা সবাই জানে।তার একক নাটক প্রায় ঈদে দেখি। এইবারো ব্যতিক্রম হয়নাই। “মাঝরাতের গল্প” নাটকে মানুষের মনের অলীক চিন্তাভাবনা আর তার সাথে অসামঞ্জস্যতা খুব নাটকীয়ভাবে দর্শককে বিভ্রান্ত করেছে। ঘটনা খুব সাধারণ আমাদের সাথে অনেকেরি ঘটেছে।বন্ধুর কাছ থেকে ৫০০০০টাকা ধার করে উত্তরা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি মাঝরাত্রে ভাড়া করা ক্যব নিয়ে। টাকাটা তার খুব প্রয়োজন আগামীকাল ঋণ পরিশোধ করবার জন্য। এখান থেকে কাহিনী শুরু। মধ্যবিত্ত মোশাররফ অনেক ভীতু, গাড়ি চালককে অবিশ্বাস আর টাকা শোধ করার দুঃশ্চিন্তা ছড়িয়ে পরে তার মাথার ভিতরে।মৌটুসী ,তার স্ত্রী বারবার ফোন চিন্তা আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়।মোটামুটি মাঝরাত্রে অন্ধকার ফাঁকা রাস্তা মাথাকে এলোমেলো করে দেয়।আচমকা চালক গাড়ি থামিয়ে চাকু দেখিয়ে টাকা নিয়ে নিতে চায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় মোশাররফ গাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তার নামতে দেখা যায়,  তখনি দেখা গেল চালক প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে গাড়িতে উঠছে। এইখানে তার সাথে সাথে আমরাও ধোঁকা খাই।কিন্তু বিপদের শেষ নাই।এইখানে মোশাররফ এর মুখভঙ্গি আর চোখের চাহুনি দর্শককে একবারে আটকে রাখবে।বিশেষ করে পাশ দিয়ে কোন গাড়ি গেলে তার যে ভয় পাওয়া এবং মনে মনে যেভাবে কথা বলে তা আমাকেও বিশ্বাস করায় এখনি কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

এবং ঠিক উত্তরা থেকে শহরে ঢুকা মাত্র পুলিশের চেক পোস্টে গাড়ি আটকানোর সময় তো নিজেরি বুক ঢিপঢিপ করছিল।কেননা চালকের ভয়ে টাকা প্যন্টের পকেটে না রেখে স্ত্রীর পরামর্শে অন্য জায়গায় লুকিয়ে রাখে।পুলিশের সহকারী গাড়ী তল্লাশি করে সিটের চিপায় টাকা পেলে তা অবৈধ বলে পুলিশ তাকে টাকা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে বলে।এইসময় সবচেয়ে অসহায় অবস্থা হয় তার, টাকাটা নিজের তা প্রমাণ করতে পারেনা কেননা টাকা তার সঙ্গে ছিলনা।গভীর রাত্রে বন্ধুফোন ধরেনা আর স্ত্রীএর মোবাইল বন্ধ পায়।হতবিহবল মোশাররফ আবার আবিষ্কার করে সে গাড়িতে ই বসে আছে।এবং পুলিশ চালককে জেরা করে ছেড়ে দিয়েছে।

এইভাবে নিজের অস্থির মস্তিষ্ক থেকে নিজেড় বানানো ঘটনা থেকে আরো মানসিক ভাবে দূর্বল হতে থাকে।একপর্যায়ে টাকা গাড়ির মধ্যে হারিয়ে ফেলে।কোথায় রেখেছে মনে করতেই পারেনা।এইসময় নির্দেশক এর কিছু খুটিনাটি চিন্তা ভাল লাগে যেমন চালকের সামনে রাখা আয়নাতে বার বার আরোহীকে দেখা আসলেই মনে ভয় ধরিয়ে দেয় যেটা ছিল কাকতালীয় মাত্র।আরেকটা ব্যপার ছিল ক্যমেরার ধারনের এংগেল গুলো।বিভ্রান্তিকর মন মানসিকতার সাথে ক্যমেরার এঙ্গেল অনেক কাজে দিয়েছে।যেমন একজায়গায় দেখা যায় মোশাররফ টাকা হারিয়ে বাসায় এসে বললে মৌটুসী পানি খাওয়ার গ্লাস ভেঙ্গে ফেলে রাগ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় গ্লাস ভেঙ্গে যায় মৌটুসির ঘুমন্ত হাতের ধাক্কায়।আসলে সে স্বপ্ন দেখছিল।

আবারো নাটকের শেষে নাটকীয়তা।এরকম ভাবে নানারকম বাজে ঘটনা চিন্তা করতে করতে যখন বাড়ির কাছাকাছি আসে তখনই পাড়ার আজেবাজে ছেলেরা এসে পথ রোধ করে দাঁড়ায়।এরপর কী হয়?সেটা আমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।এটা কি আসলেও মোশাররফ অথবা মৌটুসী এর স্বপ্ন কে জানে?

বিজ্ঞাপনের ভারে নাটক ভালো দেখা হয়নাই, এইখানে এই নাটকদুটি বিজ্ঞাপনের ভার স্বত্তেও নিজ গুনে আমাকে আটকে রেখেছিল।হতে পারে গল্পের ভিন্নতার জন্য ।সবচেয়ে বড় কথা নাটকদুটি হাল্কা গল্পের উপর ছিলনা, অনেক চিন্তার সূচনার অবকাশ ছিল এতে।সমসাময়িক প্রেম যেগুলোতে বাস্তবতা অনেক কম সেগুলা ছিলনা বলে হয়ত দেখতে ভালো লেগেছে।আরো কিছু ভাল নাটক দেখেছি সেইগুলো নিয়ে আরেকদিন বলার সুযোগ হলে বলব।তবে সব শেষে একটা কথা না বললেই না জয়া আহসান আর মোশাররফ করিম দুজনেই অনেক মেধাবী অভনেতা যারা নিজেদের চেহারা ভেঙ্গে ফেলতে পারেন  নিমেষেই।অনেক ইমেজ হারানোর ভয়ে সব চরিত্রে অভিনয় করেননা।তাদের মধ্যে এটা কখনোই নাই যা গত কয়েক ঈদের নাটকগুলো দেখে বুঝলাম।

আবার আসবঃ)

 

 

অরিন সম্পর্কে

আমি সবসময় কিছু খুজঁছি!জানিনা এই খোঁজা কখন শেষ হবে!ঃ)
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বিবিধ-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

6 Responses to চেরি,ফুলের নামে নাম আর মাঝরাতের গল্প!

  1. ইঁদুর বলেছেনঃ

    ভালো লাগল-ঈদ নাটকের রিভিউ পাওয়া গেলে সেগুলো দেখি-এই দুইটাও দেখে ফেলতে হবে!

  2. অন্নেক ধইন্যাপাতা! এবার যে কাজটা করবো তা হলো এই রিভিউয়ে পাওয়া নাটক গুলো ডাউনলোড করে দেখে ফেলবো! 😀
    আপনারা না থাকলে যে কই যাইতাম! 😀 😀

  3. নিলয় বলেছেনঃ

    নতুন ধারার লেখা পড়লাম একটা- এইটাই সম্ভবত ঈদের নাটক নিয়ে আমার পড়া প্রথম রিভিউ 🙂

    সেই কবে ঈদের নাটক দেখা ছেড়েছি মনে নেই- বাবা মা টিভি দেখে, আমি থাকি পিসিতে 😀 এই নাটকগুলো দেখার ইচ্ছে থাকলো…

    আবার আসার অপেক্ষায় থাকলাম 🙂 :clappinghands:

  4. প্রজ্ঞা বলেছেনঃ

    নাটক দু’টা দেখা হয়নি যদিও তবে এতো ভাল রিভিউ পড়ে মনে হচ্ছে যেন পুরা নাটকটাই দেখা হয়ে গেল! :happy:

  5. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    বিশাল একটা মন্তব্য লিখছিলাম।
    কম্পু রিস্টার্ট নেয়ায় হলো না।

    লেখা দারুণ ভালো লাগছে।

    (নেতিবাচক দিকঃ
    লেখা লাইন শেষ হলে দাঁড়ি এভাবে দিবা। তারপর একটা স্পেস দিয়ে আবার শুরু করবা! এভাবে দাঁড়ির পর নতুন লাইনের আগে গ্যাপ!)

  6. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    রিভিউ ভাল লাগল। কিন্তু সমস্যা হল, এখনি নাটক দুটো দেখতে ইচ্ছা করছে! 🙁

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।