আর কত??? এবার তো কিছু বলুন!!!

সবাই প্রতিনিয়ত আশার বাণী শোনায় যে এই হবে সেই হবে কিন্তু আমি কোন আশার বাণী শোনাতে আসিনি, অনেক দুঃখ, কষ্ট আর প্রচন্ড ক্ষোভ থেকে এই লেখার জন্ম। আমরা দিন দিন কোন পথে হাঁটছি? মানবতা, সহমর্মিতা , মমত্ববোধ সব কি আজ আমাদের মাঝ থেকে উঠে যাচ্ছে?? আজ আমরা মানুষকে আর মানুষ বলে বিবেচনা করি না ,বিবেচনা করি পণ্য হিসেবে। আমরা  তথাকথিত ” প্রতিবন্ধী” শব্দটির সাথে সবাই পরিচিত তাই না?? আমরা নিজেদের বলি সাধারণ মানুষ আর সেই সব “অসাধারণ” মানুষদের নামের পেছনে যোগ করে দেই এই “প্রতিবন্ধী” শব্দটি। কিন্তু আমরা কোনদিন একটি বারের জন্য কি ভেবে দেখেছি এই সব মানুষগুলো আমাদের ই মত আরেক জন মানুষ!  তারা আমাদের মতই এই পৃথিবীতে এসেছে, আমাদের মত জীবনধারন করা তাদের মৌলিক অধিকার? অনেকেই বলবেন, “কেন? তারা তো আমাদের মতই জীবনযাপন করছেন?” কিন্তু আমি বলব না কথাটা একদমই সত্য না, তারা আমাদের সমকক্ষ হয়েও সু্যোগ সুবিধার দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে আছে, আমি আজ একটি সত্য ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই তারপর বিচার বিবেচনা আপনাদের হাতে….

স্বপ্না আপি, নামের মাঝেই মানুষটির পরিচয় অনেকটা ফুটে ওঠে, উনি একজন “দৃষ্টি প্রতিবন্ধী” (যদিও আমি তাকে “প্রতিবন্ধী” বলতে নারাজ, তারপরও শুধু লেখার সুবিধার্থে আমি শব্দটি ব্যবহার করছি বলে আমি ক্ষমা প্রার্থী ), আপিটির সাথে আমার দেখা CommiuniyAction এর আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপে। ওই ওয়ার্কশপ চলাকালীন সময়ে আপির বান্ধবীর কাছ থেকে একটি ম্যাসেজ আসে যে মালীবাগের ন্যাশনাল আইডিয়াল (!!!!!!) কলেজ এ ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রাথমিক তালিকায় তার নাম এসেছে এক্ষুনি তাকে ওই কলেজে গিয়ে একটি পরীক্ষা দিতে হবে , তো ওই মুহূর্তে আপির সাথে কেউ ছিল না বলে CommiunityAction এর পক্ষ থেকে আমিই আপির শ্রুতিলিখক হিসেবে আপির সাথে যাই, আচ্ছা স্বপ্না আপি সম্পর্কে কিছু বলে নেই, আপি SSC আর HSC পাশ করেছেন বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ রাইফেলস কলেজ থেকে আর তারপর অনার্স করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস থেকে, স্বপ্না আপি মাস্টার্স ও করেছেন একই বিষয়ে আর তার মাস্টার্সে পজিশন ছিল অষ্টম (  ৮ম) ।

 

যাই হোক আমরা ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজে পৌছালাম,সেখানে তার ওই বন্ধুটি অপেক্ষা করছিলেন, যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন না, !! আমরা তো হতবাক!! মানে কি?? প্রধান শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে যখন তাকে আপি বলল যে “স্যার আমার তো নাম এসেছে তো আমি কি পরীক্ষা দিতে পারবো না?? ” তখন তার উত্তরটা ছিল এতোটা তাচ্ছিল্যমাখা যে বলার বাইরে, উনি আপিকে এমন ভাবে বললেন যে,” না না , আমরা “এই” সব কে চাকরী দেই না” খেয়াল করুন এই সব মানে তিনি স্বপ্না আপিকে মানুষও মনে করেন না, মনে করেন “এই সব”!! আপি আবার বললেন কিন্তু স্যার আমার তো নাম এসেছে? তখন ওই শিক্ষক বললেন ” তোমাদের জন্য তো অন্য জায়গা আছে, এখানে আসছো কেন?? আর তুমি কি ক্লাস নিবে?? দেখতে পারোনা বোর্ড এ লিখবে কিভাবে??” আচ্ছা বুঝলাম আপি না হয় দেখতে পান না বলে লিখতে পারবেন না কিন্তু আমাকে কেউ একটু কষ্ট করে বলবেন কি ইতিহাস এ এত বোর্ডে লিখার কি আছে? আপি যদি না পারে তাহলে আপি’র চাকরি তারা বাতিল করবে , কিন্তু তাকে তো সুযোগটা দিতে হবে নাকি?? সে পড়াতে পাড়ুক না পাড়ুক, আগে তার যোগ্যতা প্রমাণের সু্যোগ তো দিতে হবে যেই মানুষটি মাস্টার্স এ ৮ম হয় সে কিছুই পারে না তা মানতে আমি কেন কেউ ই রাজী হবে না, সেখানে তিনি বলছেন যে স্বপ্না আপি পড়াতে পারবে না, ভালো কথা এরপর অনেক কথা অনেক কিছুর পর তিনি শেষমেষ পরীক্ষা দিতে অনুমতি দিলেন, আমরা ও পরীক্ষা দিয়েছি, কিন্তু আমাদের জন্য অতিরিক্ত ১৫ মিনিটের বরাদ্দ তারা দেয় নি কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে নি, আমরা অন্য ১১ জনের মতই ভাল পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছি, তারা ৫ জন শিক্ষক নিবে জানি ওই ৫ জনের এক জন স্বপ্না আপি হবেন না যদিও তিনি ওই যোগ্যতা রাখেন তারপরও আমরা হারার আগে হার মানি নি, তবে হার মেনে গেছে আমার মানবসত্তা, স্বপ্না আপিকে বার বার বলতে ইচ্ছা করছিল , ” আপি তুমি চোখে দেখ না ভালই হয়েছে কেননা তুমি চোখে না দেখে যা করছ তা এই চোখে দেখা “সাধারণ” মানুষগুলো কোনদিনো করতে পারতো না। এরা হচ্ছে প্রকৃত অন্ধ যারা দেখেও দেখে না, জ্ঞানের পোষাকে এরাই প্রকৃত মূর্খ! আমদের ক্ষমা করো।

 

জানি না কয়জন এই পোস্টটা পড়বে কিন্তু যেই পড়বেন প্লিজ একটু ভেবে দেখবেন এই যে অসাধারণ মানুষগুলো যারা হাজারো প্রতিবন্ধকতার মাঝে নিরন্তর ছুটে চলেছেন আমাদের কি উচিৎ না তাদের জন্য কিছু করা?? তারা করুনা চায় না, যোগ্যতা দিয়ে নিজের অবস্থানটুকু নিশ্চিত করতে চায় মাত্র, আমরা সাধারণ মানুষরা যা পারি তারাও তা পারে, তাহলে আমদের কি উচিৎ না তাদের জন্য তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু নিশ্চিত করা। যদি মনে করেন যে না এখন ই সময় আওয়াজ তোলার তাহলে এখনই সরব হোন, অনেক তো দেখলেন আর কত? এবার কিছু করার সময় আমাদের ভাই-বোনদের জন্য।

অক্ষর সম্পর্কে

স্বপ্নবাজ মানুষ একজন। আশাবাদ আর নিরাশার দোলাচালে আশাকেই শেষ পর্যন্ত সঙ্গী করতে চাই। আর স্বপ্ন দেখি একদিন দেশের জন্য কিছু করার, স্বপ্ন দেখি ছোট্ট করে হলেও কিছু একটা করার যা একটা প্রজন্মের গতিপথ পরিবর্তন করবে এবং অবশ্যই সেটা যেন হয় ইতিবাচক কোন পরিবর্তন। এখন পড়াশোনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে। গণনা যন্ত্রের উপর পড়াশোনা করছি ঠিকই কিন্তু যন্ত্র শব্দটাই আমার কাছে বিরক্তিকর। ফেসবুক লিঙ্ক- www.facebook.com/akkhar21
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে সচেতনতা-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

19 Responses to আর কত??? এবার তো কিছু বলুন!!!

  1. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    তোমার লেখাটা দারুণ লেগেছে ভাইয়া

    আসলেই কারা দেখতে পায়, আর কারা অন্ধ?
    কারা মানুষ হবার পথে হাঁটতে পারে, আর কারা পঙ্গু!

    স্যালুট!

    • অক্ষর বলেছেনঃ

      ধন্যবাদ ভাইয়া, এই অসাধারণ মানুষগুলোর জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে, আশা করি আমরা পারব, কেননা পারতে আমাদের হবেই

  2. কৃষ্ণচূড়া বলেছেনঃ

    লেখাটা খুব ভাল লাগলো অক্ষর।
    এই যে ছেলেমেয়েগুলো “স্বপ্না আপি”র মত আপিদের স্বপ্ন পূরণে ছুটে যায়, তাদের “hatts off” । :clappinghands:

    আমার বিশ্বাস বাংলাদেশেও একদিন হেলেন কেলার কিম্বা অ্যানি সুলিভানদের মত মানুষগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হতে শেখাবে।

    “এরা হচ্ছে প্রকৃত অন্ধ যারা দেখেও দেখে না, জ্ঞানের পোষাকে এরাই প্রকৃত মূর্খ! ” সম্পূর্ণ একমত।

    অপেক্ষায় থাকলাম এরকম আপি আর ভাইয়াদের জীবনগল্প শোনার ।

    • অক্ষর বলেছেনঃ

      “আমার বিশ্বাস বাংলাদেশেও একদিন হেলেন কেলার কিম্বা অ্যানি সুলিভানদের মত মানুষগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হতে শেখাবে।” সহমত

      আমিও সেই বিশ্বাসই করি, একদিন আমরা তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে সমর্থ হব এবং একদিন এই সমাজের “অন্ধ ” মানুষগুলো এই সব অসাধারণ মানুষগুলোর প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে।

  3. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    সমাজে অনেকেরই দৃষ্টিশক্তি আছে কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি নেই! আফসোস, যারা দেখেও দেখে না, জ্ঞানের আলোও এদের চক্ষুষ্মান করে তুলতে পারে না।

    অক্ষর ভাইয়া তোমার প্রতি অনেক অনেক ভালবাসা, আশীর্বাদ- তোমাদের মত প্রজন্ম হয়ত আরও কিছু পরিবর্তন আনবে এই সাধারণের মাঝে।

  4. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    সমাজের চেয়ারে বসে থাকা চোখওলা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর অভাব নেই। এই লেখা তা-ই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।

    ‘ভিন্নভাবে দৃষ্টি-সম্পন্ন’ এই অসাধারণ আপুকে স্যালুট।

    • জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

      অফিসিয়ালী একটা প্রতিব্ন্ধী কোটার কথা প্রায়ই শুনি। কিন্তু, এটার যে কোন প্রয়োগ নেই তা তো দেখাই যাচ্ছে।
      কখনো কখনো মনে হয়, সরকারী বেসরকারী প্রজ্ঞাপন গুলোতে প্রতিবন্ধীদেরকে আলাদা অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলে, অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে তাদের প্রাপ্য সম্মান থেকেই বঞ্চিত করা হয়। এটা এক প্রকার দুর্নীতি।
      রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন করে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করার দাবী তোলা হোক।
      আমি দাবী করি, ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটাই বন্ধ করা হোক।

      • অক্ষর বলেছেনঃ

        আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই যে এই আপি ভাইয়া গুলো এতো কষ্ট করে, এতো বাঁধা অতিক্রম করে পড়াশোনা করে, ভালো রেসাল্ট করে, এর মূল্য কি?? তারা যদি নিজেদের জ্ঞানকে প্রকাশ করার সুযোগই না পায় তাহলে কি হবে তাদের এই শিক্ষিত হয়ে !! আসলে আমদের সমাজ হয়ত জানে এই সব মানুষগুলো কর্মক্ষেত্রে চলে আসলে তাদের যে কুৎসিত রূপ তা ধরা পড়ে যাবে!!

  5. সামিরা বলেছেনঃ

    অনেক সুন্দর হয়েছে লেখাটা পিচ্চি। :huzur:
    এই মানসিকতা আস্তে আস্তে পাল্টাবে ইনশাআল্লাহ্‌। 🙂

  6. প্রথম-নাম বলেছেনঃ

    অক্ষরঃ ভাইয়া, নিঃসন্দেহে আমাদের মানসিকতায় বড় সমস্যা আছে। প্রধান শিক্ষকের মন্তব্যে আমাদের মানষিক দৈন্য খুব ভালোভাবে প্রকাশিত। আর, একজন ক্যান্ডিডেটকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া নিয়ে টাল-বাহানা খুবি দৃষ্টিকটু।
    কিন্তু তার চেয়েও বাংলাদেশে যেটা বেশি প্রকট, তা হলো – অর্থনৈতিক দুরাবস্থা। গরীব দেশ বলেই বাংলাদেশে ‘স্বপ্না’দের জন্য কর্মক্ষেত্রে সঠিক অবকাঠামো গড়ে উঠে নি। আমি জানি, মেধার ভিত্তিতে স্বপ্না হয়তো ঠিকই সেই শিক্ষকতা চাকুরীর বৈধ দাবিদার। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, ক্লাস-টেস্টে ছাত্রদের নজরদারী, ইত্যাদি নানাধরণের ইস্যু শিক্ষকতার সাথে জড়িত।এইসব ক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে আমাদের।

  7. সাথী বলেছেনঃ

    লেখাটা দারুণ হয়েছে ভাইয়া।
    স্যালুট এই ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষ গুলোকে।:huzur:
    মাঝে মাঝে অবাক লাগে, কীভাবে এত কিছু করতে পারেন তাঁরা!!
    আমি একটা আপুর জন্য পরীক্ষা দিচ্ছি, সেখানে দারোয়ান ভাইয়া বললেন, আপু যে শুধু পড়াশোনা ভাল পারছে তা নয়, আপু রান্না বান্না, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া সব কিছুই অনেক ভাল পারেন, এমনকি একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি ভাল পারেন। তিনিও আমাকে অবাক হয়ে একই কথা বললেন “কীভাবে এত কিছু করতে পারেন তারা ?!!”

  8. শামসীর বলেছেনঃ

    কবে বদলাবে সব

  9. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    সেইদিনের স্বপ্ন খুব দেখি যখন মানুষকে তার শারীরিক কোন সমস্যার জন্য পিছিয়ে থাকতে হবে না। আর, পিছিয়ে দেবার জন্য কোন মানুষের মানষিক দৈন্য খুঁজে পাওয়া যাবে না……

  10. অবন্তিকা বলেছেনঃ

    ওই মানুষ(!)গুলোর দৃষ্টি শক্তি স্বপ্নাপ্পির মত মানুষগুলোকে দিয়ে দেয়া উচিত।

  11. প্রজ্ঞা বলেছেনঃ

    আগেও বলেছিলাম, আজ আবারো বলি- আমি তোমাদের স্যালুট করি! :huzur:

    অসাধারণ লিখেছো!

    তবে, কথোপকথনগুলোর মধ্যে স্পেস দিয়ে আলাদা আলাদা করে দিলে মনে হয় চোখে পড়ত আরও ভাল করে!
    আরো বেশি বেশি এমন লেখা চাই!

  12. অনাবিল বলেছেনঃ

    মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়…

    ইনশাল্লাহ, সব বদলাবে খুব শীঘ্রি……
    এমন লেখা আরো চাই অক্ষর………

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।