হাই হোপস!!

ঠিক কবে থেকে রাত জাগা শুরু? মনে পড়ে না, তবে স্মৃত হাতড়ে যেটা ধারণা হলো, বোধ করি ৭-৮ এ থাকার সময় থেকেই, ফুটবল-ক্রিকেট-মুভি-কম্পিউটার গেমস-গান, কারণ যাই হোক না কেনো, রাত জাগাটা বোধ করি তখন থেকেই শুরু! ফলাফল হিসেবে সকালের ঘুমটাও একটু প্রলম্বিত হতো, মনে হতো, এ আর এমন কি! স্কুলে থাকার সময় রাত জাগতে ভারী ভাল্লাগতো, বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, যখন রাত জেগে গল্পের বই পড়তাম, আমি আর তখন আমার রুমে না, থাকতাম তিন গোয়েন্দার সাথে আমাজনে, অথবা নিঃসঙ্গ কোনো দ্বীপে, কিংবা জলদ্যুস্যদের সাথে কামান নিয়ে মারামারিতে ব্যাস্ত!  😀

 

আরেকটু সময় যাবার পর মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন কিংবা ক্লাসিক কোনো অনুবাদ! ঘটনা যাই হোক না কেনো, অই সময়টুকুর জন্য শৈশবটাকে আমি আমৃত্যু ভালোবেসেই যাবো! অই সময়টাই বোধ করি জীবনে সবাচাইতে নির্মল, সুন্দর, এবং প্রাপ্তিপূর্ণ সময় কেটেছে!

 

স্কুলে থাকার সময় অনেক কিছু করেছি! এক গল্পের বইয়ের জন্য আব্বু, আম্মু, ভাইয়ার কাছে কতো মার, কতো বকুনি খেয়েছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই! গল্পের বইয়ের জন্য কিইবা না করেছি, সবার মতই, টিফিনের টাকা জমিয়ে সপ্তাহ বা মাসের শেষে চলে যেতাম ১ নম্বর বা দশ নম্বর, বই কিনে হেটে হেটেই ফিরতাম! হাটার সময়টুকু নেহায়েৎ খারাপ ছিলো না, এখন মনে করলে বেশ হাসিই পায়, গল্পের বই পড়তে পড়তে রাস্তা দিয়ে হাটতাম, অনেকবার আছাড় হোচঁট খেয়েছি, ব্যাথা পেয়েছি, অভ্যেসটা যায়নি! তখনই যে সবচাইতে শান্তিতে বেশি সময় ধরে গল্পের বই পড়তাম!

 

বাসায় বেশ কিছু হটস্পট ছিলো আমার, আম্মু অই জায়গাগুলোতে হাত দিলে সবসময়ই দুই তিনটা বই পেতো! বালিশের কভার, ব্যাগের সাইডপকেট, সোফার কুশনের নিচে, বাথরুমের ভেন্টিলেটরের পিছনে, গেঞ্জির নিচে, বইখাতার মধ্যে… সোজা কথায়, সম্ভব্য যত জায়গা ছিলো সব জায়গাতেই বই পাওয়া যেতো! আর পাওয়া গেলেই বকুনি, মাঝে মধ্যে মুফতে উত্তম-মধ্যম! 🙁

 

দুই একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে এ প্রসঙ্গে, আমার রাস্তা দিয়া গল্পের বই পড়তে পড়তে হাটাটা বেশ ভালোরকম বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলো! ভাইয়া একদিন এসে বললে, ওর বেশ কয়েকজন বন্ধু নাকি আমাকে দেখেছে, আপু এসে বললো, আমি তো সোজা মানা করে দিলাম! পাগল নাকি?? তারপর একদিন ভাইয়া আমাকেই বমাল রাস্তাতেই ধরে ফেললো! গল্পের বই পড়তে পড়তে যাচ্ছিলাম!  🙁

 

খেলতে যাবার সময় পকেটে বই নিয়ে যেতাম, স্কুলে যাবা সময় তো কথাই নাই! যখনই বিরতি, পড় পড় পড়!! এই ক্ষেত্রে আমার একজন সহযোগীও ছিলো, আমার পিচ্চিকালের, এবং এখন পর্যন্ত সবথেকে কাছের বন্ধুটি! পাল্লা দিয়ে পড়তাম আমরা! স্কুলে, মাঠে, বাসায়, কে কত পড়তে পারে! স্কুলে বহুবার ধরা খাইসি গল্পের বই পড়তে গিয়ে! ক্লাসে সবার শেষ বেঞ্চে বসতাম, মাথা নিচু করে একটার পর একটা পাতা উল্টাতাম! একদিন ধরা খেলাম, স্যার ছেড়ে দিলো, আবার ধরা খেলাম, কাকুতি মিনতি করে আবার নিয়ে আসলাম! এর পর যতবার ধরা খেয়েছি, রফিকুল হক স্যার একবারও বই ফেরত দেন নি! 🙁

 

একবার ভালো বিপদ হলো, পাঠাগারের বই, নিয়ে আসছি! স্যার দিলো আটকায়া! দুই দিন গেলো, স্যার তো আর বই দেয় না! পাঠাগারে জরিমানা ওঠা শুরু হইলো, নতুন বইও নিতে পারি না! নিতে হলে পুরান বই ফেরত দিতে হবে, নাহলে বইয়ের দাম দিতে হবে, দুটো বইয়ের দাম ষাট টাকা! এতো টাকা কই পাবো? শেষমেষ মহা সাহসের কাজ করলাম! দুরুদুরু বুক নিয়ে অফ পিরিয়ডে টিচার্স রুমে গিয়ে সরাসর স্যারের ড্রয়ার খুললাম, বই দুটো নিয়ে সোজা দৌড়! আরো অনেক গুলো বই ছিলো ড্রয়ারে, আমারই, নিতে সাহস পাই নি! যদি স্যার ধরে ফেলে!

 

যখন কাজ থাকতো না, ছাদের চলে যেতাম, ছাদ তালা দেয়া, তাতে আমার কোনো সমস্যা হতো না, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেয়াল টপকে ছাদে গিয়ে মনের সুখে বই পড়তাম! আহ, বিরক্ত করার কেউ নেই! বাসায় থাকলে বই নিয়ে চলে যেতাম বাথরুমে, গোসল করতাম দেড় ঘন্টা ধরে, ১ঘন্টা ২৫ মিনিট বই পড়তাম, তারপর ধুমধাম পানি ঢেলে বের হয়ে আসতাম!

আব্বু আম্মু নিত্য নতুন আমার একটা ফন্দি ধরে ফেলতো, আমিও নতুন আরেকটা ফন্দি বের করতাম!

 

মনে হতে পারে, গল্পের বই পড়া তো ভালো, তবে এতো কড়াকড়ি কেনো আমার ক্ষেত্রে? কারণ ছিলো বৈকি, ২৪ ঘ্নন্টায় এক ঘন্টাও পাঠ্যবই পড়তাম কিনা সন্দেহ, কিন্তু গল্পের বই দেদারসে চলতো! আব্বু আম্মুর রাগ হতো প্রচন্ড, পাঠ্য ঠিক রেখে কেনো গল্পের বই পড়ি না! আমিও কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই আমার মত চলতাম! ধুর, পাত্তা দেবার সময় আছে??

 

গল্পের বইয়ের উৎসের কথায় আসা যাক! প্রথম প্রথম বন্ধুদের কাছে থেকে এনে পড়তাম! কিন্তু খুব শিঘ্রি তাদের সব বই পড়া হয়ে গেলো, তারপরে বেশ কিছু উৎস একসাথে বের হলো! ছোট আপুর বেশ কয়েকজন বান্ধবী ছিলো! তাদেরও মোটামুটি আমার মতই পড়ার অভ্যেস ছিলো, তাদের বাসায় গিয়ে সারাদিন পড়ে থাকতাম, স্কুল ফাঁকি দিয়ে গল্পের বই পড়তাম, তারপর ছুটির সময় বাসায় চলে আসতাম! কি শান্তি, সারাদিন গল্পের বই, জ্বালাতন করার কেউ নেই!ভালোই চলছিলো, মাঝে মধ্যে বেশ কিছু বই বাসাতেও আনতাম! কিন্তু একদিন ধরা খেয়ে এই পথ গেলো বন্ধ হয়ে!

 

বুঝলাম, নতুন উপায় লাগবে! কয়েকটা পাঠাগারের সন্ধান পেলাম! সবগুলোর সদস্য হলাম! এর মধ্যে প্রায় মাইলদুয়েক দূরে একটা পাঠাগার পাওয়া গেলো! দুই টাকা প্রতি বই, কিন্তু সংগ্রহ বিশাল, মনিপুর স্কুলের কাছেই, আর পায় কে? প্রত্যেকদিন সকালে ২টা, বিকালে ২ টা এইভাবে চলতে থাকলো! খুব শিঘ্রি তিন গোয়েন্দা , মাসুদ রানা মোটামুটি অনেকগুলোই শেষ করে ফেললাম! আমার মূল লক্ষ্য তখন পর্যন্ত ছিলো তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানাই! পরে সেবার অন্যন্য বই, ক্লাসিক আর ওয়েস্টার্ন গুলোও অনেক পড়েছি! পাশাপাশি আর যা যা হাতে আসতো, জাফর ইকবাল , হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ, সুনীল ইত্যাদি!

 

সমসাময়িক ভারতীয় লেখকদের মধ্যে আমার শীর্ষেন্দু ছাড়া আর কারোরই গল্প তেমন ভালো লাগতো না, কারণটা খুবই সহজ, শীর্ষেন্দুর আমি যে বইগুলো পড়তাম, সবই ছিলো কিশোর উপন্যাস! যেহেতু ভেতরে ভেতরে ততদিনে একটা গল্পের বইয়ের গোগ্রাস একটা ভাব তৈরি হয়ে গেছে, মেলা কষ্ট করে শরৎ, রবিবাবু খতম দিয়ে ফেললাম! মিথ্যে বলবো না, বিশেষ সুবিধার লাগে নাই! তবে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা অনেক ভাল্লাগতো, বোধহয় গুপ্তধন, রাজা-রাজড়া, রোমাঞ্চের ব্যাপার ছিলো বলে!পাশাপাশি শার্লক হোমস, সত্যজিতের ফেলুদা,শঙ্কু, এরকুল পোয়ারো… আর যা যা ছিলো, যা পেতাম, সবই পড়তাম! যথারীতি আড়ালে আবডালে, বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে, যেভাবেই হোক, পড়া তো আর থামানো যায় না!

 

ক্লাস টেনে ওঠার পর গল্পের বইয়ের ঝোঁক একটু নিয়ন্ত্রণ করেছি! আগে যেমন নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়তাম, তখন আর ব্যাপারটা এমন ছিলো না! ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলে, মাঝে মধ্যে,দুই একটা! পড়াশুনার চাপ না, বাসার চাপে! তারপরও, মাঝে মধ্যেই আগের মতই চলতো! রাতের বেলা কাথার নিচে টর্চ দিয়ে পড়তে গিয়ে ক্রমঃশ চোখের বারোটা বাজিয়ে ফেললাম! আব্বু-আম্মুকে বলতামও না, চোখের সমস্যা! অইযে, গল্পের বই পড়ার কড়াকড়ি যদি বেড়ে যায়!যাই হোক, স্কুল থেকে একদিন বাসায় ফোন দিলো, আপনার ছেলে তো ব্ল্যাকবোর্ডে কিছু দেখে না!

 

ডাক্তারের কাছে গেলাম, ডাক্তার প্রথম বারেই ধরায়া দিলো, মাইনাস ফাইভ পয়েন্ট সেভেন ফাইভ! সবাই তো হা! কি করছে এই ছেলে নিজের চোখের? যাই হোক, চশমা বাগায়া আমার খুব একটা খারাপ লাগে নাই! নিজেকে পন্ডিত পন্ডিত লাগে বেশ! গত ৬ বছরে চশমার পাওয়ার সামান্যই বেড়েছে, মাইনাস সিক্স! আর কিছুই না! এরপর কলেজে উঠলাম, তখন পর্যন্ত পড়ার অভ্যেসটা কিছুটা হলেও ধরে রেখেছিলাম!

সেবার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, আমার গল্পের বই পড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি যার অবদান, তা এই সেবা প্রকাশনিরই!  আজন্ম ভালোবাসা থাকবে আমার সেবা’র জন্য!

 

এইচএসসি গেলো! ভালোমতই গেলো! সাথে সাথে আমার ভেতরের সেই গোগ্রাসী দুর্বার সর্বভূক পাঠকটাও গেলো!

খুব কষ্ট লাগে!!

 

একটা সময় আমার সংগ্রহের প্রত্যেকটা বই আমার নখদর্পণে ছিলো, কোন পাতায় কি আছে সব বলতে পারতাম, কেউ একটা বই সরালেই বলে দিতে পারতাম কোন বইটা কোন খান থেকে সরেছে! এখন সংগ্রহ বেড়েছে, গল্পের বইও পড়া হয়, কিন্তু শৈশবকালের সেই পাঠকের অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর নিজের ভেতর খুঁজে পাই না! মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাথে সাথে আমার ভেতরের সে পাঠকটাও কই যেনো চলে গেছে, অনেকটা হয়তো অভিমান নিয়েই, তুমি থাকো তোমার মত, আমাকে তো সময় দিলে না, এ ধরণের দুঃখ নিয়ে!

 

আমার মনে  হয়, মোটামুটি সব কিশোর-কিশোরীদেরই গল্পের বই পাঠের অভিজ্ঞতার সাথে আমার অভিজ্ঞতা অনেক খানি মিলে যাবে! ভার্সিটিতে ওঠার পর, ইদানিং যখন পুরনো কথা মনে করি, বড্ড কষ্ট লাগে! একটা সময় প্রচুর খেলাধুলা করতাম, দৌড়াদৌড়ি করতাম, নিজেকে আলাদা ভাবতাম, অনেক কিছু করবো, এমন স্বপ্ন ছিলো, এক আধটু বিতর্কও করেছি, কলেজে সায়েন্স ফেস্টিভালে প্রজেক্ট জমা দিয়েছি, স্কাউটিং করতাম, নিয়মিত পড়াশুনা করতাম, আড্ডা দিতাম, ঘুরতে যেতাম, সবাই মিলে যুক্তি-তর্কে টেবিল গরম করতাম! গণিতে প্রতি এক-আধটু আগ্রহ ছিলো, সেটা নিয়ে বেশ সময় দিতাম!

 

তুলনা করলে দেখা যাবে, এসএসসি অথবা এইচএসসিতে যে পরিমাণ গল্পের বই পড়েছি, গণিতের যতটুকু শিখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে তার ১০ ভাগের ১ ভাগও করা হয়নি! অথচ, বুয়েটে আসার আগে ভাবতাম, সব ক্লাস করবো, প্রত্যেকটা ক্লাবের সদস্য হব, খেলাধুলা করবো, বিতর্ক করবো, সাংস্কৃতিক কাজকর্মে জড়িত থাকবো, প্রজেক্ট জমা দেবো, এবং খুব ভালো একজন প্রকৌশলী হয়ে বের হয়ে দেশের জন্য কাজ করবো! কিছুই হয় নি, এককালে কাজ না থাকলে বসে বসে প্রবলেম সলভ করতাম, এখন অইরকম কিছু দেখলে আতংক লাগে, পাঁচ মিনিট ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার ক্ষমতা ঈশ্বর আমার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছেন!

 

এখনো আমি রাত জাগি, বসে বসে নস্টালজিক হয়ে পুরনো দিনগুলো রোমন্থন করা ছাড়া আমার কিছুই করার থাকে না! মাঝে মধ্যে মন বিদ্রোহ করতে চায়, ইচ্ছা করে, সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে আবার আগের মত হয়ে যাই! খুব কি কঠিন হবে, ঈশ্বর কি আমার লুপ্ত ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন না? শুধু মাঝে মধ্যে হঠাৎ করে কেউ কেউ সামনে এসে উকি দিয়ে যায়,অতীতের ধোয়া ভেদ করে মাঝে মধ্যে এখনো আমাকে কিশোর, মূসা, রবিন ডাক দেয়! নতুন করে তাদের সাথে কোনো রোমাঞ্চের সঙ্গী করতে চায়, মাসুদ রানা তার অকুতোভয় দেশপ্রেম নিয়ে এগিয়ে যায়, তার সঙ্গীদের মধ্যে আজ আর আমি থাকি না! দেখি এখনও উস্কোখুস্কো চুলের ছোট্টখাট্ট মানুষ একের পর পর অভিযান চালাচ্ছেন, এটা ওটা আবিষ্কার করছেন, গোমরাথেরিয়াম-হ্যংলাথেরিয়াম নামের প্রাণীগুলোর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আবার কোথাও একজন সারারাত বসে চুরুট টানছে, এক মনে চিন্তা করছে, সমস্যা সমাধান হলে একমুখ ধোঁয়া উড়িয়ে বলছে,’ইউ নো মাই মেথডস, ওয়াটসন!’

 

দেয়ালে শুধু আমার দীর্ঘশ্বাসগুলোই প্রতিফলিত হয়ে আসে, হাহাকারের মত শোনায়, হল অথবা বাসা, যেখানেই থাকি না কেনো, নিজের দিকে দেখলে এখন কষ্ট লাগে, করুণা হয়, কি ছিলাম, কি হয়েছি! আমার জাগ্রত স্বপ্নগুলো ক্রমঃশ করুণ থেকে করুণতর হয়ে ওঠে, দিনগুলো ক্রমঃশ ধুসর হতে থাকে, আমি আমার চোখের সামনে জীবনের রঙ হারাই, আর হারিয়ে আসা দিনগুলোর ঔজ্জ্বল্য ক্রমঃশ বেড়েই চলে, পুরাতন সে আমার সামনে আজকের আমি কতটা ভঙ্গুর, অসহায়, দুর্বল, আর কাপুরুষ, তা প্রতি মূহুর্তে আর্তনাদ করে আমাকে জানান দেয়!

 

রাতের সময় গুলো সবথেকে আতঙ্কের, ক্রমঃশ নিজের অন্ধকারগুলো আবিষ্কার করতে থাকি, শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়েও নেই, তারপরও, মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হয়, সবকিছু যদি আগে মত হয়ে যেত, আমি অই দিনগুলি ফেরত পাবো না জানি, অই দিনের নিজেকে ফেরত পাওয়াটা কি খুব কঠিন! এতটা পরিবর্তন, কোনোটাই নতুন করেই পরিবর্তিত হবার না?

 

কিছুই পরিবর্তন হয় না, মাঝরাতে আমি কি-বোর্ড মাউস নিয়ে অন্তর্জালে ঘুরে বেড়াই, একটা পর্যায়ে গিয়ে সব থমকে যায়, আমার হাত, পিসি, মাউস-কি বোর্ড, সব! দম বন্ধ হয়ে আসে, একটা অসম্ভব নির্জনতা আমাকে গ্রাস করে! অতীত আর বর্তমানে তুলনা করতে গিয়ে আমিও থেমে যাই, কিছুই এগোয় না!

অন্ধকারের কালো পর্দাটা ক্রমঃশ এগিয়ে আসে, যবনিকা টেনে দেয়! যেন বলে, এখানেই তোমার শেষ! হতাশ আর অস্থিরতার মধ্যে একটা সময়ে প্রলম্বিত ক্ষণগুলো আবার গতিশীল হয়, আমি আবারো আমার অর্থহীন জীবন পালন করি, কিছু মিথ্যে আনন্দের অভিনয় করি, হতাশাকে ভুলতে চাই, যেমন করেই হোক!

মনিটর অফ করে দেবার পর পিংক ফ্লয়েড তার গুরুগম্ভীর গলা আর অসাধারণ গিটার দিয়ে আমাকে বারবার একই কথা বলতে থাকেন, একই স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে থাকেন, আর ক্রমঃশ নিঃশব্দতার ঘুর্ণি তৈরি করে, আমি আবারো সে পুরনো আমাকে খুজঁতে গিয়ে একই চক্রে হাবুডুবু খাই!!

 

 

এক ভাঙ্গা রেডিওর মত মনের মধ্যে ঘুরতেই থাকে, ঘুরতেই থাকে,

The grass was greener, the light was brighter,

The taste was sweeter, the nights of wonder,

With friends surrounded, the dawn mist glowing,

The water flowing, the endless rive,

Forever and ever…

প্যালারাম সম্পর্কে

যাকনা জীবন যাচ্ছে যখন, নির্ভাবনার নাটাই হাতে...
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বইপড়ুয়া, স্মৃতিচারণ, হাবিজাবি-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

18 Responses to হাই হোপস!!

  1. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    দারুণ!! বইপড়া নিয়ে কী অসাধারণ স্মৃতিচারণ!

    আপনার সাথে আমারও মিলে গেলো। যেই বুয়েট এ ঢুকলাম বইপড়ার পরিমাণ গেলো কমে! (আমি তারপরও পড়েছি। কিন্তু আগের মত পাগলাটে পরিমাণে নয়।)

    এইটা নিয়ে ভাবা দরকার। কেন আমাদের বই পড়ার পরিমাণ কমে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলে।

    • প্যালারাম বলেছেনঃ

      @বোহেমিয়ান – অনেক ধন্যবাদ কষ্ট করে লেখাটা পড়ার জন্য!

      হুম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলে গল্পের বই পড়া কমে যায়, এর পেছনে বেশ কিছু কারণও আছে! 🙂

      অনেকগুলো ব্যাপার, নতুন আঙিনা, নতুন শিক্ষক, ক্যম্পাস, মুভি, ইন্টারনেট, আড্ডা… আর ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাঘুরি, টিএসসি-চারুকলা ইত্যাদি ইত্যাদি!

      পোলাপাইন সময়ই পায় না, পড়ব কখন! 😛

      পুনশ্চ – ভাইয়া, আপনি কোন ব্যাচের (এবং ডিপার্টমেন্ট), জানতে পারি কি? 🙂

  2. সামিরা বলেছেনঃ

    ব্লগে বড় লেখা পড়তে ইচ্ছাই করে না, আপনারটা পড়লাম, একটানে। মুগ্ধপাঠ!

    ব্লগে আমার নিজের প্রথম পোস্টও ছিল বই পড়া নিয়ে। ছোটবেলার পড়া বইয়ের ধরণও মিলে গেছে! বড় হয়ে বই পড়া কমে যাওয়া, সেটাও মিলে গেছে। বই পড়ার জায়গা দখল করেছে আন্তর্জালের সময়ক্ষেপন।

    তবে বই পড়া নিয়ে বকা খাই নি অবশ্য কখনো। বরং খবরের কাগজ ঠিকমত না পড়ার জন্য আম্মুর বকা, আর স্কুলের বই পড়ার জন্য ভাই-বোনের পচানি খেয়েছি। 😛

    আর আপনি কি মনিপুরিয়ান নাকি? বাহ্‌! :happy: দুই টাকা প্রতি বই, সংগ্রহ বিশাল…মিঠু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। সেই সময়ে আমার পড়া বেশির ভাগ বইয়ের উৎসস্থল উনি! আর সেবা প্রকাশনী – আহ্‌!

    আপনার চশমার পাওয়ার, আর রাস্তায় হেঁটে বই পড়া – হাহাহা। 😀

    বই পড়া আমি, আর দিনরাত কম্পিউটার ঘাঁটা আমার মধ্যে কেন এত পার্থক্য – এটা ভাবলে একটা কারণ মনে হয় – বই পড়ার সময় অনবরত কল্পনা করতে হয়, এমনিতে যেটা হয় না। আবার আগে যেখানে একদিনে ৩০০ পৃষ্ঠার বই শেষ করে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম, সেখানে এখন ব্লগে একটু দীর্ঘ লেখা পড়তে যেয়েও হাঁপিয়ে উঠি। ধৈর্যও কমে যাচ্ছে। তবে বুঝেছি যখন কোথায় নেমে যাচ্ছি, বদলানোর চেষ্টাও তো করতে পারি। সেটা তো আর অসম্ভব না।

    লেখার প্রথম অংশ এক রকম সুন্দর, শেষ অংশ আরেক রকম!

    • সামিরা বলেছেনঃ

      :welcome:

      ব্লগে এখন পর্যন্ত আমার দীর্ঘতম মন্তব্য করে ফেললাম মনে হয়। আরো অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিলাম অবশ্য! 😀

      • প্যালারাম বলেছেনঃ

        আপনাকেও ধন্যবাদ! 🙂

        ইমোটিকন ব্যাবহারের ব্যাপারে আরেকটু সচেতন হইতে হবে আমাকে, লেখা গুলা ছাড়া ছাড়া লাগে! 😛

    • প্যালারাম বলেছেনঃ

      মনিপুরিয়ান না, তবে চিনলেও চিনতে পারেন! বশির উদ্দিন আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মহিলা কলেজ!! 😀 😀

      মনিপুর যেতাম অই একটা কারণেই, মিঠু ভাইয়ের বিরাট সংগ্রহের বই! এক বন্ধু সন্ধান দিয়েছিলো, তারপরে আর থামাথামি নাই! দুই বছর কোপায়া পড়সি! 😀

      যত যাই করি না কেনো, আমার কাছে এখন পর্যন্ত সেরা আনন্দদায়ক কাজ দুটি, ঘুরতে যাওয়া এবং বই পড়া!

      হুম, its never too late to begin! 🙂

      শুভ কামনা রইলো, পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ! 🙂

      • সামিরা বলেছেনঃ

        হ্যাঁ চিনেছি। 😀 মহিলা কলেজ দেখে শুরুতে আঁতকে উঠেছিলাম নিজের বুদ্ধি দেখে, কারণ এতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে একবারও মহিলা মনে হয় নি। পরে মনে হল, মহিলা কলেজের পুরুষ স্কুলে পড়েছেন বোধ হয়! 😛

  3. নূরবাহার ঈয়াশা বলেছেনঃ

    এখন আর আগের মতো পড়া হয় না! 🙁
    আগে বড় ভাইদের সব বই বড় ভাইদের আগে পড়ে ফেলতাম চোখের নিমিষে। এখন আর ধৈর্য করে উঠতে পারি না…একদমই না!

    আবারো পড়ার অভ্যাসটা জাগিয়ে তোলার সময় এসেছে মনে হয়…

    লেখা এবং লেখার পেছনের অভিজ্ঞতা…দুটোই চমৎকার!!
    :welcome:

    • প্যালারাম বলেছেনঃ

      ধন্যবাদ আপু! 🙂

      সেটাই, নতুন করে শৈশবের অভ্যেসটা ফেরত আনার বড্ড প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি ইদানিং! 🙂

  4. অক্ষর বলেছেনঃ

    “ক্লাস টেনে ওঠার পর গল্পের বইয়ের ঝোঁক একটু নিয়ন্ত্রণ করেছি! আগে যেমন নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়তাম, তখন আর ব্যাপারটা এমন ছিলো না! ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলে, মাঝে মধ্যে,দুই একটা! পড়াশুনার চাপ না, বাসার চাপে! ”

    কথা সত্য সেই চাপ সামলে আর উঠে দাঁড়াতে পারলামনা এখনও 🙁 🙁

    নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল 🙁 বই আর বই 🙁

  5. জনৈক বলেছেনঃ

    গল্পের বই বাবা পড়তে দিতো না। এমনও হয়েছে ছিড়ে ফেলেছে। মা আশকারা দিত বলেই পড়তে পারতাম। অবশ্য চোখের বারোটা বাজার কথা সবাই বলতো… কিন্তু তা এখনও ম্লান হয়নি।

    বুয়েটে গিয়ে সেভাবে গল্পের বই পড়া আমারও হয়ে ওঠেনি।
    লেখা বড় হলেও বেশ সরসরে। লিখতে থাকুন।

  6. বোকা মানুষ বলেছেনঃ

    মহাসড়ক দিয়া হাঁটিবার কালে তিনি পুস্তক অধ্যয়ন করিয়া থাকেন। ক্ষমা দাও হে মহাজ্ঞানী। ক্ষমা!
    আহারে গল্পের বই চুরির সেই দিনগুলো! মফস্বলের লাইব্রেরি। যা বই থাকে তার মধ্যে বুড়োদের বই বেশি। কিশোরদের গুলো ছেঁড়া। ভালো না লাগলেও তাই হাত টান দিতে হত। একবার এক বই চোরকে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ ও বই মারছিল। আমারও পছন্দ সেই বই।
    এর পর থেকে আর বই চুরি করি না। না বলে নিয়ে নেই।
    ভালো লাগলো আপনার লেখা।

  7. অনাবিল বলেছেনঃ

    নস্টালজিক হয়ে গেলাম, অনেক কিছু মিলে গেল যে……

    স্বাগতম সরবে!

  8. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    সবার কেন এমন হয়?! গল্পের বই পড়ার কী পাগলাটে নেশা ছিলো! কত্ত মার খেয়েছি গল্পের বই পড়ার জন্য। আর এখন আমি একটা ঘন্টাও পড়তে পারি না। বই কিনি। বইয়ের উপর ধূলো জমতে থাকে। মাঝে মাঝে হাতে নিয়ে বই নেড়েচেড়ে দেখি।
    মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্তর্জালে অতিব্যস্ততাই কাল হয়েছে বুঝি।

    তবুও সেই শৈশব, কৈশোরের সাথে এই যুবকের হিসেবের ফারাক মেলে না………

বোহেমিয়ান শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।