আঁধার নেমে আসে

দীপের বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা ঢাকের মতো শব্দ করেই চলেছে। সেই শব্দের চোটে আর কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারছে না সে। এর মধ্যে গরমটাও যা পড়েছে, ঘামতে ঘামতে একশেষ অবস্থা তার। বাসার সবাই তার সাথে তামাসা  করে চললেও মাঝে মাঝে দাঁত বের করে হাসি দেয়ার অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি দীপ।
এমনিতেও বিয়ের দিন খুব একটা কথা বলার রেওয়াজ নেই এ দেশে। কতদিন আগে থেকে ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে আজকের তারিখটায় গোল দিয়ে রেখেছে সে। যে পরিমাণ আনন্দ নিয়ে বিয়ে করছে দীপ, তার চেহারা দেখে অন্তত এই মুহূর্তে কেউ সেটা বুঝতে পারবে না। আনন্দ অবশ্য হওয়ারই কথা।
সাবা-কে প্রথম যে দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছিল, সে মুহূর্তটা মাঝে মাঝেই চোখের সামনে  ভেসে উঠছে আজও। প্রতিদিনের মতো আজও ভালো লাগছে সে সময়টার কথা ভেবে। সাদা রঙের শাড়ি, সবুজ পাড়, লাল টিপ দেয়া মেয়েটা যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো তখন তো শুধু সে না, কতগুলো মানুষ সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিলো! কিন্তু, সেই মেটার চোখ যখন এক মুহূর্তের জন্য দীপ এর চোখে স্থির হলো, তখনও ঠিক এখনের মতই চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে গিয়ে বুকের ভিতর ভীষণ শব্দে হৃৎদিণ্ডটা যেন ঢাক বাজিয়ে চলেছিল।

এরপর প্রায় বছর দু’য়েক সময় পার হয়েছে। সাবা প্রথম প্রথম বোকাসোকা চেহারার ছেলেটাকে পাত্তা না দিলেও একসময় ঠিকই দেখা যায়, ক্লাসের পরে কিছু সময় দীপ এর সাথে কাটানো হচ্ছে। তারপর মা-বাবার রক্তচক্ষু, আত্নীয়-স্বজনের ভ্রুকুটি আর বন্ধুদের অনেক আনন্দের পর আজকে ওদের বিয়ে।

ঘরের দরজা বন্ধ করে এসে বিছানার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে দীপ। এখনও দরজার বাইরে চাচাতো-ফুপাতো-খালাতো ভাইবোনের দল কান পেতে আছে জানে সে। এতদিন ধরে পরিচিত মেয়েটা আজ তার সাথে অন্য এক সম্পর্কে জড়িয়ে গেলো, ভেবেই কতক্ষণ কথা বলতে পারে না সে। কতদিন তারা দু’জনে এই দিনটার কথা ভেবেছে, স্বপ্ন দেখেছে এই দিনটার আশায়।

তবুও সব ভাবনার চেয়ে দিনটা কেমন আলাদা!
সাবা-র পাশে বসে মুগ্ধ নয়নে তার দিকে তাকায় দীপ। একইভাবে দীপের দিকে তাকিয়ে আছে সাবা। কত কথা বলা হয়ে যায় ওই দৃষ্টিতে।

ঘণ্টা দুই পরে……

ঘরের ভাঙা কাঠের দরজার একটা অংশ পড়ে আছে মেঝেতে। ঘরের বাইরে থেকে ভিতরটা চোখে আসছে না দীপের। অনেকক্ষণ ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার শোনা গেলেও এখন শুধুই একটা গাঢ় নীরবতা গ্রাস করেছে চারপাশ। ধীর পায়ে ঘরের ভিতর থেকে বের হয়ে আসে উর্দি পরা এক লোক। দীপ এর চোখের সামনে এক মুহূর্ত দাঁড়ায় সে। দীপ চোখের সামনের রক্তের লাল পর্দা ভেদ করে শুধু একজোড়া বুট জুতা দেখতে পায়। উর্দি পরা পাঁচ-ছয়টা লোক বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
মেঝেতে ঘষে ঘষে শরীরটা নিয়ে একটু একটু করে ঘরের ভিতরে ঢোকে দীপ। ওই তো বিছানার প্রান্ত থেকে সাবা-র হাত দেখা যাচ্ছে। খাটের কোণা ধরে একটু উঁচু হয়ে সাবা-র চোখ দুটো দেখতে পায়।
বহুদিন ধরে পরিচিত ভালোবাসা মাখা সে চোখ এখন অনুভূতিহীন, মৃত-তাঁর বাকী শরীরটার মতোই।

ধীরে ধীরে কালো পর্দা নেমে আসতে থাকে দীপের চোখের সামনে। দূরে শোনা যায় গুলির শব্দ। আগুনে পোড়া কোন কিছুর ঘ্রাণ ভেসে আসে তার নাকে। অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তেও সাবা-র ভালোবাসা মাখ চোখ দু’টো খুব মনে করতে চায় দীপ।

কিন্তু, নির্জীব একজোড়া চোখ বারবার ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে।

নীরব ঘরটার ক্যালেন্ডারে গোল চিহ্ন দেয়া তারিখ। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১।

………………………………………………………………………………………………………..

[২৫শে মার্চের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করেও পুরোপুরি অনুভব করা সম্ভব না। তবুও, এটা অন্তত অনুভব করা যায়, পাকিস্তানীরা বাংলাদেশীদের উপর কী বিভৎস নির্যাতন চালিয়েছে এই নয় মাস জুড়ে, যার শুরু হয়েছে এই কালরাত্রির মধ্যে দিয়ে।

এই ভয়াবহ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেক মানুষের পাকিস্তান প্রেম দেখে খুব লজ্জা হয়……খুব লজ্জা হয়!]

স্বপ্ন বিলাস সম্পর্কে

বাস্তবে মানুষ হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। জীবনের নানা পথ ঘুরে ইদানীং মনে হচ্ছে গোলকধাঁধায় হারিয়েছি আমি। পথ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি আর দেখে যাই চারপাশ। ক্লান্ত হয়ে হারাই যখন স্বপ্নে, তখন আমার পৃথিবীর আমার মতো......ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা। আর তাই, স্বপ্ন দেখি..........স্বপ্নে বাস করি.....
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

16 Responses to আঁধার নেমে আসে

  1. সরল বলেছেনঃ

    এই ভয়াবহ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেক মানুষের পাকিস্তান প্রেম দেখে খুব লজ্জা হয়……খুব লজ্জা হয়!
    আশা করি সত্যিকারের বোধ টা জাগ্রত হবে সবার মাঝে…… 🙁

  2. সামিরা বলেছেনঃ

    গল্পের পরের অংশটা কী হবে বুঝতেই পারি নাই।
    🙁

  3. অনাবিল বলেছেনঃ

    উফফ……………

    কি বলবো জানি না…………… 🙁

    গল্প ভালো হয়েছে, কিন্তু এমন গল্প যদি লিখতে না হতো…………… 🙁

  4. নিবিড় বলেছেনঃ

    🙁 বাস্তবধর্মী লেখা, অথচ এই মার্চেই সেই পাকি পতাকা এদেশের মাটিতে দেখলে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়,

    লেখা ভালো হয়েছে।

  5. অক্ষর বলেছেনঃ

    ২৫ মার্চের কথা যখন বইয়ে পড়ি তখন নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠি ! চিন্তা করতেও ভয় হয় ঐদিন কি ঝড়ই না বয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষগুলোর উপর। আর যারা ঐ ঝড়ের চাক্ষুষ সাক্ষী তারা না জানি কতটা কষ্টে দিন পার করেছে !

    অনেকেই পাকিস্তানের পক্ষে এই কথা সেই কথা বলে, বলে “খেলা যুদ্ধ এক না”, “বিশ্বায়নের এই যুগে এমন করলে চলবে ? ” “আরেহ দেখ পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতি কত উদার ” আরও কত কি ? কিন্তু তারপরও মন মানে না , মাফ করতে মন চায় না, বিশেষ করে এই দিনগুলোর জন্য , ‘৭১ এর নয়টা মাস যে কি করেছে তারা আমাদের সাথে তা মনে হয় শুধু মাত্র তারাই জানে যারা ঐ নয় মাস ঐ অত্যাচার সহ্য করেছে। 🙁

    ভাইয়া , গল্পটা এমন হবে ভাবিনি , অন্য রকম এক ভালবাসা নিয়ে পড়তে বসেছিলাম, অন্য রকম এক ভালবাসা নিয়ে উঠলাম। ৭১ এর প্রতিটা শহিদের প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধা ভালবাসা। আর তোমার মত মানুষ যারা আজও স্বাধীনতাকে মনে লালন করে তাদের জন্যও অনেক ভালবাসা । :huzur:

  6. নিশম বলেছেনঃ

    মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে নাম, তারিখটা তো গুরুত্বপুর্ন ছিলোনা। আমি তাই সবসময় বলি যে, মুক্তিযুদ্ধের যে ব্যাপারটা, সেখানে আমরা যে আত্মত্যাগ করেছিলাম, আসলে যে ঘটনাটা, সেটা অনেক বেশী গুরুত্বপুর্ণ। কাজেই নতুন প্রজন্মকে যদি সেই জায়গায় ঢুকিয়ে দেয়া যায়, তখন তারা হঠাত করে আবিষ্কার করবে, তারিখটাতো অতো গুরুত্বপুর্ণ না। ……… সত্যটা যদি বের করতে চায়, নতুন প্রজন্ম বের করতে পারবে, তাই আমি ঐটা নিয়ে টানাটানি করা পছন্দ করিনা। আমি চাই, আসল যে ব্যাপারটা, কতো বড় আত্মত্যাগ করেছে, যুদ্ধ করেছে, সমস্ত বাংলাদেশ করেছে। এটা একটা জনযুদ্ধ ছিলো, ঐ ব্যাপারগুলা পড়ুক, তারা বুকের ভেতর একটা শক্তি অনুভব করবে।

    আমি চাই শুধু একটাই, তারা (তরুন প্রজন্ম) নিজেদের নিয়ে গর্ব করুক, নিজের দেশকে নিয়ে গর্ব করুক, নিজের জাতিকে নিয়ে গর্ব করুক। এবং তার জন্য সবচেয়ে ভালো এবং সহইজ উপায় হচ্ছে গিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা যদি পড়ে। তখন তারা হঠাত করে নিজের ভেতরে এতো একটা শক্তি অনুভব করবে যে, আমার দেশের মানুষ এতো অসাধারণ মানুষ! ৭১ সালে প্রত্যেকটা মানুষ যোগ দিয়েছে, যারা শরনার্থি হয়ে গিয়েছে, গ্রামের মানুষ তাদের সাহায্য করেছে এবং মানুষের ভেতর যতো সুন্দর দিক ছিলো, প্রত্যেকটা দিক তখন প্রস্ফুটিত হয়েছে।

    – ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার

    লেখাটা পড়ে ইচ্ছা করলো, স্যারের কথা গুলো তুলে দেই। আসলেই, উপাত্ত গুলো অতো জরুরী না, জরুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগটাকে অনুভব করা, নিজের ভেতরে ধারণ করা, চেতনায় নিজেকে শুদ্ধতর করে তোলা। লেখা অসাধারণ হয়েছে ভাইয়া 🙂

    • স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

      ধন্যবাদ, ভাইয়া।
      আসলেই, মুক্তিযুদ্ধের সময় তারিখগুলোর চেয়ে তখনকার ঘটনাগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশী ছিল।

  7. mohammed fawzul kabir বলেছেনঃ

    লেখাটা ভালো লাগসে …তোর লেখা প্রবন্ধ,গল্প ও কবিতা পরে যেসব অনুভুতি হয় সেগুলো হলো ১.হিংসা : ইশ !!! স্বপ্নটা এত ভালো লিখে কেমনে??২..গর্বিত: এই অসাধারণ গল্পটা আমার অতি ক্লোজ ফ্রেন্ড স্বপ্নের লেখা:)৩. আফসোস: আহারে আমার যদি এইরকম সুন্দর লেখার মাথা থাকত :(…চালিয়ে যাও দোস্ত …ভালো একজন লেখক হও..

    ***৪৭,৫২,৬৯,৭১ , পূব পাকিস্তান , পশ্চিম পাকিস্তান , বাংলাদেশ ,পাকিস্তান, স্বাধীনতা , স্বাধীনতার ঘোষক, রাজাকার , যোদ্ধাপরাধী এসব নিয়ে বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন বক্তব্য পাই..যারা বামপন্থী তারা একরকম বলে,যারা ডানপন্থী তারা একরকম বলে…পরিবারের কাছ থেকে একরকম শুনি..আমার বিভিন্ন শিক্ষকের কাছ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য শুনি…এক একটি জাতীয় পত্রিকায় এক এক খবর পাই…এক এক লেখকের বই এ এক এক ধরনের তথ্য পাই…আমার অতি দুর্ভাগ্য যে, আমি এই বিষগুলো নিয়ে সন্দিহান এই যে ,কার তথ্য সত্তি?? ইশ বুকটা চিরে এই কষ্টটা দেখাতে ইচ্ছা করে…স্বাধীনতার মত গৌরবউজ্জল বিষয়টার ইতিহাস কেন মানুষ বিকৃত করে 🙁

    • স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

      অনেক ধন্যবাদ, দোস্ত।
      এটাই আমাদের দেশের জন্য দুঃখের। আমাদের এখনও তর্ক করে বেড়াতে হয় আমাদের দেশের চল্লিশ বছর আগের ইতিহাস নিয়ে। এতো বেশিই মানুষ ব্যস্ত তা নিয়ে, বর্তমান নিয়ে ভাবার সময়ই পায় না অনেকে……

  8. অদ্ভুত ছেলে বলেছেনঃ

    শুরুতে ভাবছিলাম রোমান্টিক কোনো গল্পের দুঃখের ফিনিশিং হবে।
    সেটাই হলো, কিন্তু যেভাবে হলো এককথায় অসাধারণ!

    শুধু বিয়ের রাতে নব্দম্পতিই নয় আরো কতভাবে যে কত মানুষ ঐ হানাদাররা ২৫ শে মার্চ রাতে মেরেছে তা কোনো ধিক্কার কিংবা থুথু ছিটিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়

    • স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

      “আরো কতভাবে যে কত মানুষ ঐ হানাদাররা ২৫ শে মার্চ রাতে মেরেছে তা কোনো ধিক্কার কিংবা থুথু ছিটিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়”

সামিরা শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।