বয়স বিভ্রাট

–   তোমার বয়স কত?

–   উনিশ।

–   আরে সার্টিফিকেট না, আসল বয়স।

–   আসল বয়সই উনিশ।

আমার মাঝেমাঝেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশের মানুষের সাধারণত দুটো বয়স থাকে, একটা সার্টিফিকেট বয়স, আরেকটা আসল বয়স। সবাই ধরে নেয়মুখে সবাই যে বয়সটা বলে সেটা ‘সার্টিফিকেট বয়স’, এবং অবশ্যই সেটা আসল বয়সের তুলনায় ২-১ বছর কম। আর কারো বয়স যদি সত্যি সত্যি তুলনামূলকভাবে একটু কম হয়েই যায়, তাহলে তো আর কথাই নেই।

আমি এই সমস্যায় ভালমতই পড়েছি। কারণ আমার আসল বয়স একটু কম না, বেশ কম। এবং এত পরিমাণে কম যে সেটা অন্যদের ‘সার্টিফিকেট বয়স’ এর সাথে খুব সুন্দরমত মিলে যায়। তাই প্রিয় বন্ধুটিও ফর্ম ফিলআপের সময় বলে, “তুইও এত বয়স কমাস?”

লেভেল-১ টার্ম-২’র পরীক্ষা শেষ হল কিছুদিন আগে, অর্থাৎ ভার্সিটির প্রথম বর্ষ শেষ করলাম। আমাদের সাথের প্রায় সবারই জন্মতারিখই ১৯৯১ এর কোন একদিন, কিন্তু কাটছাঁট করে সেটা ১৯৯৩ বানিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর খুবই দুঃখজনকভাবে, আমার আসল জন্মতারিখই ১৯৯৩’র!

বয়স কম হওয়াটা অবশ্য খানিকটা লজ্জার, যখন দেখি জুনিয়ররাও বয়সে আমার চেয়ে বড়। আমার এক বছরের জুনিয়র যারা তারা প্রায় সবাইই আমার থেকে বড়, এটা মোটামুটি মেনে নিয়েছি। আমাদের পাশের বাসার এক ছেলে এবার এইচএসসি দিবে, আমার দুই বছরের জুনিয়র। আন্টির সাথে আগেই পরিচয় আছে, উনি বললেন অ্যাডমিশন টেস্টের সময় আমি যেখানে কোচিং করেছি ওখানেই উনি ছেলেটাকে ভর্তি করাবেন, আমি যেন ভর্তির সময় উনার সাথে একটু যাই। গেলাম। ফর্ম ফিলআপের সময় দেখলাম, ছেলেটা আমার চেয়ে ৪ মাসের বড়। আমাদের দুজনের জন্মই ১৯৯৩ তে, আমার জুন আর ওর ফেব্রুয়ারি। দুই বছরের জুনিয়রও যদি বয়সে আমার তুলনায় ৪ মাসের বড় হয় (আশা করছি সে বয়স কমায়নি, কমিয়ে থাকলে তো্ আর কথাই নেই), তাহলে আর এই দুঃখ রাখি কোথায়! :crying:

যাহোক… আমাকে আসলেই একটু কম বয়সে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন দেখি বাচ্চারা সবাই প্লে-নার্সারি এসব ধাপ অতিক্রম করে তারপর ওয়ানে ভর্তি হয়, আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছিলাম, তাই এসব ভাগ্যে জুটেনি। শিশু বলে একটা ক্লাস অবশ্য ছিল, বাসায় আগে থেকেই খানিকটা পড়াশোনা থাকায় ওখানে আর ভর্তি হতে হয়নি। তবে যখন বুঝলাম যাদের সাথে পড়ছি প্রায় সবাইই আমার চেয়ে বয়সে একটা বড়, তখন থেকেই খুঁজতাম আমার চেয়ে ছোট কাউকে পাওয়া যায় কিনা। ক্লাস থ্রিতে একজনকে পাওয়া গেল, তাকে নাকি সরাসরি থ্রিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অবশ্য কেন সেটা বুঝতে পারিনি, ওর খাতা খুললে দেখা যেত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শুধু আঁকিবুঁকি। ফাইভে আরেকজনকে পেয়েছিলাম আমার চেয়ে বয়সে ছোট। অ্যাডমিশন টেস্টের পর ফেসবুকে ফ্রেন্ডের সংখ্যা যখন ধাঁইধাঁই করে বাড়ছিল, তখন মাঝে মাঝে খেয়াল  রাখতাম আমার চেয়ে ছোট কাউকে পাওয়া যায় কিনা। পেতাম অনেককেই, কিন্তু জিজ্ঞেস করলে দেখা যেত সেটা ওর ‘সার্টিফিকেট বয়স’ 🙁 অবশ্য শেষ পর্যন্ত আমাদের ডিপার্টমেন্টেই একজনকে পেয়েছিলাম ১৯৯৩ সালে জন্ম, আমার চেয়ে দুই মাসের বড়। তবে ওকে দেখলেই বোঝা যায় বয়স কম, কিন্তু কাজকর্ম সব বড়দের (মানে সতীর্থদের) মতই। আমার আবার উল্টো, উচ্চতা বেশি হওয়ায় দেখতে দেখা যায় বড়দের মত, কিন্তু কাজকর্মে বাচ্চা ভাবটা এখনো পুরোপুরি যায়নি 🙁

যাহোক, বয়স কমানোর ব্যাপারটা অবশ্য অভিভাবকদের উপরই নির্ভর করে। রবিঠাকুরের হৈমন্তীতে দেখেছিলাম সেকালে কন্যার বয়স বেশি হয়ে গেলে বয়স কমিয়ে বলা হত, কিন্তু আজকের দিনে কেন? আমি ঠিক নিশ্চিত নই এই প্রশ্নটির জবাব কি, তবে যতদূর বুঝি চাকরীর জন্য, চাকরীতে যোগদানের জন্য বয়সসীমা নামে একটা ব্যাপার থাকে… আবার সরকারী চাকরী থেকে অবসর গ্রহণেরও নির্দিষ্ট সময় থাকে, ২ বছর বয়স কমানো মানে দুই বছর বেশি চাকরী করতে পারা। তবে সরকারী চাকরীই কী এই প্রবণতার কারণ? আমার ধারণা এত কিছু না ভেবে অন্যদের দেখাদেখিই বয়স কমানোর এই প্রবণতা, ক্ষতি তো আর নেই, যদি লাভ হয় তো হোক! আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছি তার এসএসসির রেজিস্ট্রেশনের সময় স্কুল থেকেই নাকি বয়স কমিয়ে দিয়েছিল। আমার ক্ষেত্রেও একবার এমন হয়েছিল, ক্লাস ফাইভের রেজাল্ট দেওয়ার পর আব্বুসহ স্কুলে গিয়েছিলাম ট্রান্সফার সার্টিফিকেট আনতে, হেডস্যার জন্মতারিখ লেখার সময় আব্বুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “কিছু কমিয়ে দেওয়া লাগবে?” আমার মনে হয় ওইসময় বয়স খানিকটা বাড়িয়ে দিলেই যেন ভালো হত।

বয়স নিয়ে ভালই সমস্যায় পড়েছিলাম কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। শিক্ষা বিভাগের অদ্ভুত নিয়ম, “একই জিপিএধারীদের মধ্যে কলেজে ভর্তির জন্য অধিক বয়সধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে”। ফলাফলস্বরূপ দেখা গেল গোল্ডেন এ+ পেয়েও আমি মহসীন কলেজের সেকেন্ড ওয়েটিং লিস্টে, চট্টগ্রাম কলেজের ওয়েটিং লিস্টেও নাই, চান্স পেলাম শুধু সরকারী বিজ্ঞান কলেজে। শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেলাম নটরডেমে ভাইভা সিস্টেম থাকায়।

তবে মোটের উপর বয়স কম থাকাটা বোধহয় একেবারে খারাপ না (বিয়ের সময় অবশ্য কি হবে বুঝতে পারছি না  🙁 )। ভালোই তো, যদি আরও দুটো বছর শিশু হয়ে থাকতে পারি! :penguindance:

রাফি কামাল সম্পর্কে

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি বুয়েটে। স্বপ্ন দেখি না খুব একটা, কিন্তু যেগুলো দেখি সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাই অবিরাম...
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে হাবিজাবি-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

9 Responses to বয়স বিভ্রাট

  1. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    বয়স বদলানোর এই অদ্ভূত নিয়মটা বাংলাদেশে খুব ভালোমতোই আছে । আমার কাছে মনে হয়, সরকারী চাকরী বেশিদিন করতে পারার ইচ্ছেই এই প্রবণতা তৈরীর প্রধান কারণ ।
    জন্ম নিবন্ধনের উপর গুরুত্ব দিল এই প্রবণতা কমতে বাধ্য ।

    আমারও সার্টিফিকেটেরই বয়স আসল বয়স । 😀

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    দারুণ দারুণ!

    আমিও বয়স লুকাই!! :wallbash:
    আমাদের এক বন্ধুও তোমার মত বিপদে! ও এক মেয়েকে পছন্দ করছিলো, সেই মেয়ের জন্ম তারিখ ওর আসল এর চেয়ে কম!! (সেই মেয়ে আবার একটা বিখ্যাত স্কুলের যেখানে ভর্তির জন্য বাবা মা ক্লাস থ্রির মেয়েকে ওয়ানে ভর্তি করায়। তার মানে সেই মেয়ে যদি কমায়া থাকে ওর চেয়ে কতটা বড়! 😛 )

  3. সামিরা বলেছেনঃ

    হাহা।
    আমারও সার্টিফিকেটের বয়সই আসল বয়স, সৌভাগ্যক্রমে! 😛 তবে সেটা কতজন মানুষ বিশ্বাস করে এটা একটা প্রশ্ন।
    আমিও যতদূর জানি সরকারি চাকরি বেশিদিন করতে পারার জন্য বয়স কমায় সবাই, সার্টিফিকেটে। আর মেয়েরা এছাড়াও নানাবিধ অজ্ঞাত কারণে বয়স কমায় বলে। 🙁 ছেলেদের ব্যাপারে আইডিয়া নাই।
    কাহিনী হচ্ছে, আমি নিজেও মেয়েদের বয়স সহজে বিশ্বাস করি না। তোমার মত কারো বয়স আসলেই কম হলে তো বোঝার কোন উপায়ই নাই (যদি না সত্যবাদী হিসেবে তার বিশেষ সুনাম থাকে)!

    • সামিরা বলেছেনঃ

      তবে অল্প কিছু মেয়েকে দেখছি যাদের বয়স সহপাঠীদের থেকে যথেষ্ট বেশি আর তারা সেটা লুকায়ও না। মুগ্ধ হইছি দেখে!

  4. অদ্ভুত ছেলে বলেছেনঃ

    বয়স লুকানোর মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য দেখি না। তবে ভাব ধরা টাইপের কিছু হইতে পারে।
    সার্টিফিকেটে মেয়েদের বয়স কমানোর যুক্তিসংগত কারণ আছে। তবে ফেসবুকে বা পাবলিকলি অন্য কোথাও মেয়েরা বয়স শেয়ার করলে সেটা কমিয়ে লেখার প্রবণতাই বেশি।

  5. অনাবিল বলেছেনঃ

    সৌভাগ্যক্রমে আমার আসল বয়স আর সার্টিফিকেইট বয়স একই……সরাসরি ক্লাস টুতে ভর্তি হয়েছিলাম……….. 😀

    বয়স বদলে দেয়াটা আমার খুব খারাপ লাগে… আমার মনে হয় আমরা এই থেকে ছোটবেলা হতে মিথ্যের চর্চা শিখি…………………

  6. ছিঃ!!
    বয়স নিয়ে টানাটানি কেন??

    আমরা বয়স তো লুকাতেই পারি, হাজার হোক, এট্টু বেশিদিন বাঁচলে খারাপ কি! 😛

  7. সাবরির অনিক বলেছেনঃ

    বিবাহের বাজারে এই সার্টিফিকেট বয়স বড়ই বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে 😛

  8. রাইয়্যান বলেছেনঃ

    দোস্ত তোর পোস্টগুলা পড়ি আর মিশ্র অনুভূতি হয়!!

    প্রাইভেট কোচিং নিয়ে যেটি লিখেছিলি সেখানে আমি অপ্রাসঙ্গিক একটা কমেন্ট করেছিলাম, কেননা মূল লেখা প্রসঙ্গে কমেন্ট করার সৎ সাহস আমার ছিল না, আমি নিজেই চিরকাল প্রাইভেটের উপর দিয়ে চলেছি। কী ভীষণ শরম লাগছিল তোর অতি অতি সত্য কথাগুলো শুনে!!

    এই লেখাটি পড়েও সেই অনুভূতিই হচ্ছে! আমিও যথারীতি বয়স চুরি করা পাবলিক। কারণ জানি না, হয়তো সরকারি চাকরী বা যেকোন কিছু। গড্ডালিকা প্রবাহ।

    আবার, তোর লেখা পড়ে আমার চেয়ে বেশি গর্বিত মানুষ তুই কম পাবি নিশ্চিত থাক!! নটরডেমে একই গ্রুপে, একই সারিতে বসে আমরা দুই বছর পড়াশোনা করেছি, এটা ভাবতেই আমার কী যে আনন্দ লাগছে!!

    কলেজে ঘটনা অন্যরকম ছিল। তুই নিজে নিজে পরিশ্রম করে অঙ্কে ১০০ তুলতি, আমরা প্রাইভেটে পড়ে অঙ্ক গিলে এসে ৮০ তুলতাম। তুই বয়সের দিক থেকে কমে থেকেও সমানে ফাইট দিতি, আমরা ওভার-ম্যাচিউরিটি নিয়ে অহংকার করতাম। আফসুস।

    তুই এগিয়ে যা দোস্ত!! এত স্পষ্ট করে সহজ ভাষায় জিনিসগুলো তুলে ধরার ক্ষমতা খুব বেশি মানুষের নেই। তোর মতন মানুষদেরকে বড় দরকার আমাদের!

সামিরা শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।