মধুর আমার মায়ের হাসি,চাদের মুখে ঝরে-মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে।

আমি যে সময়ে শহরের বিখ্যাত কলেজে পড়ার জন্যে ঢাকা চলে আসলাম সে সময়েই গ্রামীণ ফোন একটা নতুন এড ছাড়ল। চঞ্চল চৌধুরীর সাথে আমার সেই প্রথম পরিচয়- তাকে আমার চিরজীবন মনে থাকবে, সেই এডটা তাকে আমার ভেতরে অমর করে দিয়েছে।

 

চমৎকার একটা এড ছিলো সেটা- চঞ্চল লঞ্চে করে বাড়ি যাচ্ছে আর মায়ের কথা ভাবছে। সে ঢাকা যাবার পরে একটি রাতও মা ঘুমাতে পারে নি- তার শার্ট বুকে চেপে ধরে কেঁদেছে সেই সব কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে হয় তার মা টা কত বোকা। এইবার তাই সে মায়ের জন্যে একটা মোবাইল নিয়ে যাচ্ছে। এই মোবাইল দিয়ে সে মায়ের সাথে কথা বলবে- দূরে থেকেও সে থাকবে মায়ের খুব কাছে।

 

ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজত চমৎকার সেই গান-

 

 

পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মা গো বল কবে শীতল হবো

কতদূর আর কতদুর

বল মা।

 

এই এডটা যতবার দেখেছি ততবার ভেতরে ভেতরে আমার অশ্রুজলে ভেসেছে হৃদয়- মুখচোরা ছেলে আমি কোনদিন কাঁদি না- আমার কান্না কখনো চোখে আসে নি। মায়ের একমাত্র ছেলে আমি জীবনে কোনদিন একরাত মাকে ছাড়া থাকি নি- আর এখন আমাকে কতদুরে থাকতে হচ্ছে। ভাল রেজাল্টের কাঙ্গাল ছিলাম- এখন সেই আমার মাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। এডটা দেখলেই মনে হতো চঞ্চলের মত আমিও বাড়ি চলে যাই। যেখানে আমাদের সুন্দর বাড়িটা- আমার সযত্নে গড়া গোলাপ বাগানটা- যেখানে আমার মা।

 

কলেজের ক্লাসে বসে ঘড়ি দেখতাম, বারোটা বাজে- আম্মা নিশ্চয়ই দুপুরের রান্না শুরু করেছে। বাড়িতে থাকলে দুপুরের রান্নার সময় আমি মায়ের চুলার পাশে বসে থাকতাম। আম্মা কোন না কোন খাবার বানিয়ে দিতেন- বসে বসে সেটাই খেতাম। আমাকে পাশে না রেখে একা একা রান্না করতে মায়ের কি এখন কষ্ট হচ্ছে না? মা কি কাঁদছে না?

 

 

মা অবশ্যই কাঁদে- কিন্তু মা জানে যে আমাকে বাইরের পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা এখন আরো জরুরী। ভালবেসেছেন- আচলে বেধে রাখেন নি। কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন- আমার সামনে ছিলেন হাসিমুখে। তিনি আমার মা- সবাই যখন আমাকে শরীয়তপুর কলেজে ভর্তি করার জন্যে চেষ্টা করছিলেন একমাত্র মায়ের কারনেই আমি পড়তে পেরেছ নটরডেমে- আমাকে দূরে রেখে কষ্ট পেয়েছেন তিনিই বেশি, কষ্ট সহ্য করেছেন- আদরে ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেন নি।

 

তখন খুব খারাপ লাগতো অসুস্থ হলে- একা একা রুমে পড়ে থাকা- পাশে কেউ নেই, মাথায় পানি দিতে দিতে কেউ বকছে না কেন রোদে ছিলাম সে কথা বলে। বাড়িতে অসুখ মানে উৎসব- মায়ের হাতে বাড়তি আদর ভালোবাসা পাওয়া, মাকে সারাক্ষণ কাছাকাছি পাওয়া। তাই এখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে যত না কষ্ট হতো শরীরে তার চেয়ে অনেক বেশি হতো মনে।

 

নটরডেমে যাবার পথে মাওয়া যাবার বাসগুলোর কাউন্টার। ওগুলোতে চড়েই আমার বাড়িতে যেতে হয়। কলেজে যাবার পথে বা ফিরে আসার সময় দেখতাম কত মানুষ বাসে করে চলে যাচ্ছে, আমি ভাবতাম তারা সবাই বুঝি মায়ের কাছে যাচ্ছে। আমি তাদের হিংসা করতাম। ভাবতাম যেদিন কলেজ থেকে আমার মুক্তি মিলবে তখন আর ফুফুর বাসায় ফিরবো না, কলেজে থেকে বেরিয়ে বাসে করে সোজা বাড়ি চলে যাবো- মায়ের কাছে যাবো।

 

আমাদের মত যারা ডালে ডালে মানুষ- যারা স্রোতে ভেসে ভেসে চলি- আজ এখানে, কাল ওখানে- জীবন আমাদের কাছে এক প্রতি পাতায় দুঃখ-উপন্যাস। দুঃখ আমাদের স্বাভাবিক প্রাপ্তি, সকল দুঃখ মেনে নিলেও যখন মনে হয় মা কাছে নেই- সে দুঃখ অমোচনীয়। মাকে কাছে না পাবার ব্যথা ভুলতে পারি না- ভোলা যায় না।মাঝে মাঝে ভাবতে চেষ্টা করি মা না থাকলে আমার জীবন কিভাবে চলবে? ভেবে কোন কিনারা পাই না। ছোট বেলায় মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখতাম- মা মারা গেছে- ঘুম ভেঙ্গে গেলে মাকে জড়িয়ে ধরে রাখতাম- মা পরম আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। দুঃস্বপ্ন এখনো দেখি- শুধু মাথায় আর মা হাত বুলায় না।

 

আজ মা দিবসে মাকে দেখতে পাবো না- ফোনে হয়তো কথা হবে। মাকে বলবো- মা কেমন আছো, মা বলবে ভাল আছি বাবা। কিন্তু আমি জানি মা ভাল নেই-মা এখন অসুস্থ, বয়সের ভারে ক্লান্ত।

আমার মা ভাল থাকুক- সাথে ভাল থাকুক অন্য সবার মায়েরা। মায়েদের জন্যে দোয়া রইলো।

 

-মিজানুর রহমান পলাশ

মিজানুর রহমান পলাশ সম্পর্কে

এখানে রাত্রি নামে, উড়ে যায় সাদা বক/ জোনাক পোকায় চড়ে স্বপ্ন আলো/ দেখেনা সে মালতী লতা, পলাশ ফুলের শোভা/ কিশোরীর কালো চোখ, আধার কালো !/
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে বিবিধ-এ এবং ট্যাগ হয়েছে স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

4 Responses to মধুর আমার মায়ের হাসি,চাদের মুখে ঝরে-মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে।

  1. জনৈক বলেছেনঃ

    বিজ্ঞাপনটা দারুণ ছিলো…

    • মিজানুর রহমান পলাশ বলেছেনঃ

      আমার দেখা অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন- আর চঞ্চলের অভিনয়টাও ছিল অনেক স্বতস্ফূর্ত। এটা বোধহয় ওর প্রথম কাজ ছিলো।

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    দারুণ লেখা। ছুঁয়ে গেলো।
    আমাদের মা’ রা ভালো থাকুন

  3. সামিরা বলেছেনঃ

    “আমাদের মত যারা ডালে ডালে মানুষ- যারা স্রোতে ভেসে ভেসে চলি- আজ এখানে, কাল ওখানে- জীবন আমাদের কাছে এক প্রতি পাতায় দুঃখ-উপন্যাস। দুঃখ আমাদের স্বাভাবিক প্রাপ্তি, সকল দুঃখ মেনে নিলেও যখন মনে হয় মা কাছে নেই- সে দুঃখ অমোচনীয়।” 🙁
    আমরা যারা এখনো পর্যন্ত মায়ের কাছাকাছি থাকতে পারছি তাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কিন্তু মনেই তো থাকে না!

মিজানুর রহমান পলাশ শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।