প্রথম রান্না

বাসায় আম্মু রান্না করেন। ছোট বেলা থেকে আম্মুর রান্না দেখেই বড় হয়েছি! এখন সেগুলো খুবই কাজে লাগে। কিন্তু আমি আম্মুর বাসায় থাকতে,  রান্না ঘরের টুক টাক কাজ ছাড়া কোন রান্না করার অনুমতি পেতাম না  আম্মুর কাছে।  কারন আমরা সামান্য এক কাপ চা বানাতে রান্না ঘরের  বারটা বাজিয়ে ফেলতাম, দেখে মনে হবে ঝড় বয়ে গেছে! তাই আম্মু বিরক্ত হয়ে রান্না ঘরের ডিপার্টমেন্টে আমাদের প্রবেশ নিষেধ করে দিয়েছিল !

তাই রান্নাঘরে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট চলত যখন আম্মু বাসায় থাকতনা! সেই সুযোগ আমরা খুব কম পেতাম!
প্রায় পনের বছর আগের কথা। আম্মু নানু বাড়ি গিয়েছিল। সব রান্না করা আছে। আমাদের কাজ শুধু গরম করে খাব। একদিন মাথায় চিন্তা আসল কিছু একটা বানাই! বই ঘেটে ঘুটে একটা রেসিপি বের করলাম।

রেসিপির নাম – সব্জির সুপ!
বের হলাম বাজারে সবজি কিনতে! কি কি সবজি লাগবে বললাম দোকানে। কিন্তু কতটূকু লাগবে তা আর বলতে পারিনা! হিসাব টাও ঠিক বুঝিনা! মহা চিন্তায় পরে গেলাম! কি বলব চিন্তা করে করে শেষ! এক সময় অনেক বাজার করেছি যখন ছোট ছিলাম। কিন্তু বড় হবার পর সেটা করতে হয়নি। আর তার সাথে সাথে সব ভুলে গেছি! শেষে লোকটা বলল, ঠিক আছে আফা… আমি সব মিলাইয়া দেই! আমি ভাবলাম তাই ভাল! 🙂

বাজারের ঝামেলা থেকে বাসায় এসে রেসিপি নিয়ে বসলাম! এখন রেসিপিতে দেখি এমন কিছু আইটেম আছে যা আমি জানি না! আমি অনেক ভেবে টেবে সে সব আইটেম পরিবর্তন করে তার কাছা কাছি আইটেম খুজে বের করলাম!

যেমনঃ লেখা আছে, কর্ণফ্লাওয়ার! আমি তখন চিনতাম না এটা কি! যেহেতু জানি না, ঐ আইটেম বাদ দিলাম রেসিপি থেকে। আবার ছিল টেষ্টিং সল্ট… এইটাও বাদ দিলাম, কারন জানিনা এটা কি! ভাবলাম লবন দিলেই হবে! আর ছিল সয়া সস… সেটা বাদ দিয়ে টমেটো সস! ছিল ভিনেগার… আমি বাদ দিলাম … গোলাপ জলের বদলে দিলাম কেওরা জল!

তারপর বসলাম সবজি কাটতে! কিন্তু রেসিপিতে কিছু বলা নাই কিভাবে কাটতে হবে! অনেক চিন্তা ভাবনা করে কুচি কুচি কিউব করে কাটলাম! সেখানে আবার আইটেম ছিল লাল শাক! লালশাক সিদ্ধ করে দিতে হবে। সেটা সিদ্ধ করতে গিয়ে গেল পাতিলের নিচে লেগে! আমি কখনই লবন আন্দাজ করতে পারিনা… তাই লবন দিয়ে দিলাম বেশী!

এর পর পানি তে কাটা সবজি দিয়ে সিদ্ধ করলাম! তার সাথে লাল শাক দিয়ে দিলাম… যেভাবে যা করতে বলা আছে, করলাম… শুধু মাঝে মাঝে কিছু আইটেম চেঞ্জ হল! এই যা!  আর সব ঠিক! এরপর চামচ দিয়ে নাড়াচ্ছি আর নাড়াচ্ছি! আমি সুপ খেয়েছি! তাই আমি অপেক্ষা করছিলাম কখন ঠিক তেমনটাই হবে সুপ!

কিন্তু জাল দিতে দিতে পানি শুকায় গেল কিন্তু সেটা কিছুতেই আর সুপের মত দেখতে মনে হলো না! উলটা লাল শাকের রঙ দিয়ে সব সবজি লাল হয়ে গেছে!  শেষে মেজাজ খারাপ করে পাতিল নামালাম!

আব্বুকে দিলাম খেতে! আব্বু ১ চামচ খেয়ে আর খেতে পারে না
এবার নিজে একটু বাটিতে নিলাম! নিজে খেতে গিয়ে বুঝলাম…….

থাক আর বললাম না! আমার ৪ ঘন্টার পরিশ্রম জলে গেল! আমি নিশ্চিত ঐ রান্না টা যদি কাউকে খাওয়াতে পারতাম সে জীবনে আমার রান্না খেতে সাহস পাবেনা! খিক খিক!

এই আমার প্রথম রান্না। এর পর আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেছি! আন্টিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম আমার কি কি ভুল হয়েছিল সেদিন! কিন্তু ভয়ে আর রান্না করার সাহস পাই নাই অনেক দিন! আর বইয়ের রেসিপি দিয়ে রান্না করার ইচ্ছাটা একে বারেই চলে গিয়েছিল!

বাবুনি সুপ্তি সম্পর্কে

আমার ক্লান্ত মন ....
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে স্মৃতিচারণ, হাবিজাবি-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

10 Responses to প্রথম রান্না

  1. নিশম বলেছেনঃ

    আমি রান্না-বান্না করতে ভালো পাই 🙂 মাঝে মাঝেই টুকটাক ইধার উধার করে কিছু বানাই ! চিকেন ফ্রাই বানালাম একদিন, মন ভরলোনা। ওটাতো সব্বাই পারে, করলাম কি, একটু খানি মাখন, একটু কর্ণফ্লাওয়ার মেশানো পানি, অল্প খানি ময়দা, একটু সয়াসস আর অনেক গুলা টমেটো সস আর চিনি দিয়ে মিশিয়ে জ্বাল দিলাম চুলায়, দেখি ৫-৬ মিনিট পরে কেমন একটা গাড় সাদা-গোলাপী টাইপের কি তৈরী হলো। এরপর ওগুলা চিকেন ফ্রাই এর উপরে দিয়ে দিলাম। আম্মু খেয়ে তো পুরাই তব্দা, ভাবছে আমি বুঝি কোনো ইটালিয়ান রেসিপি বানিয়ে ফেলেছি 😛

    তবে আমি চা বেশ ভালো বানাই, সমস্যা হলো চুলায় চা বসানোর পরে আর কিছু মনে থাকেনা। বাড়িঘর অন্ধকার হবার পরে বুঝি, চুলায় চা ছিলো, ততোক্ষনে পাতিল পুরাই কয়লা ! এর জন্য বিশাল বকা খাওয়া লাগে, পরে জেট, হুইল দিয়ে ঘষে ঘষে সেগুলান উঠানো লাগে 🙁

    • বাবুনি সুপ্তি বলেছেনঃ

      আহারে বেচারা 😛 আমার এখনো পাতিল পুরে ভুলে যাবার কারনে। আমি চুলায় রান্না বসিয়ে অপেক্ষা করতে পারি না চুলার পাশে আর যার জন্য আমাকে প্রায়ই কালো পাতিল দেখতে হয় 🙁
      এমন ভয়ঙ্কর স্মৃতি যেমন আছে, তেমনই ভাল স্মৃতিও আছে। 🙂
      মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই ভাল রান্না হয়েছে কিভাবে জানি আর সবাই খুব পছন্দ ও করেছে।
      আর আমি খেয়াল করেছি, এখন আমার মনের উঠা নামার সাথে আমার রান্না নির্ভর করে। মন ভাল থাকলে রান্না খুবই ভাল হয়। কিন্তু যদি কখনো কোন কারনে মন খুবই খারাপ থাকে আমার রান্না ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। 🙁

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    হাহা আপু! এখন তো অবস্থা ভালো? 😛
    টেস্ট করে দেখতে চাই!

    রান্নাটা জীবনে শেখা হলো না!

  3. সামিরা বলেছেনঃ

    আপুর সাথে টেলিপ্যাথি হয়েছে আমার! :love: আমি নিজেও আমার রন্ধন বিপর্যয় নিয়ে কিছু লিখবো ভাবছিলাম ইদানিং। 😛
    আমার লেখা অবশ্য প্রথম রান্না নিয়ে হবে না। কারণ প্রথম রান্না এখনো করিই নি! জীবনে প্রথম চা বানালাম (মানে বানানোর চেষ্টা করলাম আর কি!) তিন-চারদিন আগে। সেটা চা হয়েছে কিনা এখনো জানি না। 🙁 এগুলি নিয়েই লিখতে চেয়েছিলাম।
    আপনার এই লেখাটা আগে পড়েছিলাম বোধ হয় সামুতে। 😀 খুব মজা পেয়েছি! :babymonkey:

    • সামিরা বলেছেনঃ

      ওহ্‌ আমার আম্মুও একই রকম, সব গুবলেট করে ফেলি দেখে রান্নাঘরেই ঢুকতে দিতে চায় না। 😳

      • বাবুনি সুপ্তি বলেছেনঃ

        লিখে ফেল আপু। এসব অনেক দিন পর পড়লে মন ভাল হয়ে যাবে। 🙂
        এক সময় আমার একটা প্ল্যান ছিল, আমার সব স্মৃতি লিখে রাখব। যখন বুড়ি হয়ে যাব, সব ভুলে যাব এই সব লেখা পড়ে সব মনে হবে 🙂 😀

  4. জনৈক বলেছেনঃ

    রান্না করতে পারিনা! 😳

জনৈক শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।