“প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে!”

একটু অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাই আপনাদের।  মনে আছে “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা” কবিতাটির কথা? পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে পড়েছিলাম বোধহয়।

বাদশাহ  আলমগীর দিল্লীর শাহানশাহ। একদিন দেখলেন তাঁর পুত্র  শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে আর শিক্ষক নিজ হাতে পা পরিস্কার করছেন! বাদশাহ দেখে ফেলায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন শিক্ষক। পরক্ষণেই ভাবেন,-

“যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।” –  না, তাঁকে এটি বলতে হয়নি। বরং বাদশাহ নিজেই  ক্ষুব্ধ হলেন পুত্রের প্রতি! –

“নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।” 


যাহোক, অনেক পুরনো ব্যপার এসব।

এখন আমরা সভ্যতার চুড়ায় প্রায় পৌঁছে গেছি কিনা, তাই এসব কবিতা আর কবিতার পেছনের আবেগ নিতান্তই সেকেলে! 🙁

স্কুলের প্রথম দিনটি আমার জন্য সুখকর ছিলনা, আমি ছিলাম একটু ভীতু আর অনেকখানি বোকা । শিক্ষকদের বেশ ভয় পেতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে এই শিক্ষকরাই হয়ে উঠলেন আমার সবচেয়ে আপন! কাউকে মায়ের মত মনে হত, কাউকে বাবার মত! তাঁরা আমাকে নতুন এক জগতের সন্ধান দিলেন- যেখানে শুধু আলো আর আলো!! :beshikhushi:

হাত তুলুন তো, যারা ছোটবেলায়  “এইম ইন লাইফ”/ “বড় হয়ে যা হতে চাই” -ধরণের রচনাগুলোতে  লিখতেন শিক্ষকতা করার কথা! আমি দেখতে পাচ্ছিনা, কিন্তু জানি অনেকেই হাত তুলেছেন। যখন আর কোন পেশা সম্পর্কে ধারনাও ছিলনা, তখন আমাদের সামনে মূর্তিমান আদর্শ  হিসেবে আমরা শিক্ষকদেরই পেয়েছি।

ফিরে আসি বাস্তবতায়।

আমরা এখন টাকার বিনিময়ে শিক্ষা নেই, স্কুল-কলেজ- ভার্সিটির গণ্ডি পার হয়ে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হই, ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ হই, নিয়ন্ত্রণ করি আইন- শৃঙ্খলা। আর অভুক্ত থাকেন সেইসব শিক্ষকেরা, যারা আমাদের সাফল্যের কারিগর! এত ব্যস্ততার  ভিড়ে সেই ছোটবেলার স্কুলের শিক্ষকদের কি আর মনে থাকে?

স্বপ্ন দেখাতেন এই শিক্ষকেরা, আর এখন আমরাই তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারন হচ্ছি! যেই শিক্ষকেরা একসময় আমাদের শিখিয়েছিলেন জীবে দয়া কর, বলেছিলেন কখনও রাস্তার একটি কুকুরকেও আঘাত করোনা; আজকে আমরা তাদেরই গায়ে হাত তুলি,গরম পানি ঢেলে দেই! 🙁

বারবার সরকার পরিবর্তন  হলেও  প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আজ পর্যন্ত হয়নি। সে পরিবর্তন যদি হতো তাহলে  বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকেরা নিজেদের চাকরি সরকারিকরণের দাবিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁদের দুরবস্থার প্রতিবাদে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতির কথা বলতেন না!

বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের দাবী জন্যই মূলত সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার শিক্ষক গত সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হন। নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার তা পালনে  ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবী করেছেন, ‘জাতীয় বেসরকারী প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদ’ এর  সভাপতি মো: সামছুল আলম।  তাদের দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপি দেয়ার জন্য তারা সচিবালয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শাহবাগেই পুলিশ তাদের আটকে দেয়। নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে।

আন্দোলন করতে আসা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক মারা গেছেন। তাঁর নাম আজিজুর রহমান। মুক্তিযোদ্ধা এই শিক্ষককে বুধবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।

একবার ভেবে দেখুন তো, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কি পেলেন তিনি স্বাধীন এই দেশের কাছ থেকে? ন্যায্য একটি দাবিতে অংশ নিয়ে প্রাণ হারালেন- এই কি ছিল তাঁর প্রাপ্য ? লড়াই করে  যে ভূখণ্ড ছিনিয়ে এনেছিলেন আমাদের জন্য, কখনও কি ভেবেছিলেন সেদেশের মাটিতে, সেই দেশের মানুষই তাঁর মৃত্যুর কারণ হবে? না, ভাবেননি তিনি। 🙁

কি মনে হচ্ছে কথাগুলো পড়ে? -”গেছে দেশটা রসাতলে, কিচ্ছু হবেনা এইদেশের” -তাইনা?

দোষ কাকে দিচ্ছেন? সরকারকে? তাহলে মনে করিয়ে দিতে হয় আমরাই সরকারকে ক্ষমতা দেই! ন্যাড়া একবার বেলতলায় গেলেও আমরা বারবারই যাই!! :wallbash:

আর দেশটা কি শুধু সরকারের? আপনি ,আমি এই দেশের আলো- বাতাস পাচ্ছিনা? তাহলে দেশ পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু সরকারের কেন হবে? আজ যদি আমরা সবাই নিজ নিজ পেশা থেকে সরে দাঁড়াই আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকি দেশ  চলবে? চলবে না। এথেকেই বুঝুন দেশের চালিকাশক্তি আসলে কারা। আমরা? নাকি সরকার? অবশ্যই আমরা।

অনেকেই ভাবি দেশকে বদলে ফেলবো, আমূল এক পরিবর্তন নিয়ে আসবো। সত্যি বলতে কি, এই দেশটাতে সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য কোন “সুপার হিরো”র প্রয়োজন নেই! যে দেশের আনাচে কানাচে অন্যায় আর অবিচার, সে দেশকে বদলে ফেলা হয়ত সহজ না। কিন্তু আমি, আপনি, আমরা প্রত্যেকে যদি কেবল নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই, নিজের কাজে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার প্রতিফলন দেখাই আর নীতিনির্ধারকের পদ কাউকে দেয়ার ব্যপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলেই শুধু এটি সম্ভব।

হয়ত এমন একদিন আসবে  যেদিন আমরা চোখের সামনে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত হতে দেখবোনা, ন্যায্য বেতনের অভাবে তাঁদের রাজপথে নামতে হবেনা ,হারাতে হবেনা প্রাণ। কোনও শিক্ষককে বলতে হবেনা-

“যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।”  :dhisya:

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে অনুপ্রেরণা, ইতিবাচক, উদ্যোগ, চিন্তাভাবনা, বিবিধ, সচেতনতা-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

18 Responses to “প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে!”

  1. সামিরা বলেছেনঃ

    অসাধারণ হয়েছে লেখা আপু! প্রতিটা বাক্যে সহমত।
    সেদিন এত কষ্ট হয়েছিল খবরটা – ছবিটা দেখে!

  2. খবরের কাগজে ছবিটা দেখার পর আসলে কাকে দোষ দিবো বুঝতে পারছিলাম না, পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে ছিলাম, সারাজীবনের একটা বোধ, শিক্ষকতার পেশার সম্মান, সব অঙ্কের হিসেবের মতো গোলমাল হয়ে যাচ্ছিলো, এতো খারাপ খবরের ভিড়ে কেন জানি আর মন বসে না কিছুতে……

    একদমই না…

    তবু শেষের প্যারাটার প্রতিটা কথা বিশ্বাস করি, আসলেই…শুধু নিজের কাজটুকু…

    • কানিজ আফরোজ তন্বী বলেছেনঃ

      হুম…… ছবিটা দেখে আমারও অনেক খারাপ লেগেছে। আমার বড় বোন বেসরকারি স্কুলের একজন শিক্ষক। আপু বললেন, “তুমি তো ব্লগ লিখো, এটা নিয়ে কিছু লিখো” । :thinking:
      মানুষ এত হিংস্র হয়ে যাচ্ছে কেন ভাইয়া? 🙁

  3. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    দারুণ একটা লেখা। দারুণ!

    • কানিজ আফরোজ তন্বী বলেছেনঃ

      হুমম… কিন্তু অনেক কষ্ট লাগছিলো লিখার সময়, আমার বড় আপিও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক। বারবার ওর কথা মনে হচ্ছিল। 🙁
      ধন্যবাদ ভাইয়া।

  4. রাইয়্যান বলেছেনঃ

    একদিন দেশ বদলাবেই।।

  5. সাথী বলেছেনঃ

    দারুণ একটা লেখা ,

    “যে দেশের আনাচে কানাচে অন্যায় আর অবিচার, সে দেশকে বদলে ফেলা হয়ত সহজ না। কিন্তু আমি, আপনি, আমরা প্রত্যেকে যদি কেবল নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই, নিজের কাজে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার প্রতিফলন দেখাই আর নীতিনির্ধারকের পদ কাউকে দেয়ার ব্যপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলেই শুধু এটি সম্ভব ……… ” চেষ্টা করবো সাধ্য মত …..

  6. তুহিন বলেছেনঃ

    তন্বী, লেখাটা খুব ভাল হয়েছে……

  7. সাইফ বলেছেনঃ

    This is called tyrannical fascism. “They will face complete annihilation who try to create anarchy(?!?) whoever else they are and whatever their demand either right or wrong” type attitude.

  8. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    শিক্ষকদের আন্দোলনে এভাবে বাধা দান করতে হলো কেন আর কেন তাদেরকে এভাবে মারধোর করা হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না!
    মাঝে মাঝে মনে হয়, এই দেশে শুধু রাজনীতিবিদ আর ধনীদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বাকি সবাই তুচ্ছ, ক্ষুদ্র, ঘৃণ্য!

    লেখার প্রতিটি কথায় সহমত প্রকাশ করছি।

সাথী শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।