রূপকথা জীবনে তবু রয়ে যায়…(২): ড্রয়ার ভর্তি গুপ্তধন!

যদি এখন বৃষ্টি আসে কখনো, আর যদি সময় হয় সবসময়কার নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে – বৃষ্টির ছাঁট এসে দরকারি কাগজ ভিজে যাচ্ছে কিনা সেটা দেখা বাদ দিয়ে কিংবা কাপড়ে কাদা লেগে বরবাদ হচ্ছে কিনা সেই দুশ্চিন্তা থেকে বেরিয়ে বৃষ্টি দেখার, তাহলে আমার মাঝে মাঝে অনেক অনেক বছর আগেকার কথা মনে পড়ে যায়। বৃষ্টি আসলে তখন বারান্দায় গামলা নিয়ে (আর সাথে লেগোসেট) খেলা হত ‘মিনাদের বাড়িতে বন্যা’! আমাদের লেগোসেটে কতগুলো মানুষ ছিল কীভাবে যেন, তার একজন মেয়ে – সে-ই হত মিনা। গামলার পানিতে লেগোসেট ভেসে যেত – মানে হচ্ছে বন্যার পানিতে মিনাদের বাড়িঘর ভেঙে যাচ্ছে।

অনেকদিন পরে যখন ধুলোমাখা টেবিল গোছাতে ইচ্ছে করে আমার, অথবা তারও অনেক অনেক দিন পরে টেবিলের ড্রয়ারটা – তখন চমকে উঠে দেখি ছোটবেলার গুপ্তধন এখনো লুকোনো আছে কিছু কিছু। যখন একদম ছোট্ট (কিন্তু তখনকার নিজের কাছে অনেক বড়), প্রাইমারির গণ্ডি পার হই নি – তখন স্কুলমহলে ক্রেজ ছিল পাঁচ টাকা দামের ছোট ছোট লেখার প্যাডের, মনে আছে নিশ্চয়? সেগুলোর প্রতি পাতায় কার্টুনের কিংবা অন্য কোন প্রিয় কিছুর হালকা ছাপ, তার ওপর লিখতে হত। যদিও মহামূল্যবান পাতাগুলোতে আমি কিছু লিখি নি, যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সেগুলো জমাতাম আমরা – তারপর একদিন হল কী, স্কুলের পাশের বইয়ের দোকানের ভাইয়ার কাছে গিয়ে বললাম, তার দোকানের সবগুলো প্যাড থেকে একটা করে পাতা চাই আমার।

সেই শ’খানেক বিনামূল্যে পাওয়া স্মৃতির টুকরো এখনো আছে – সেদিন দেখি। সেই সঙ্কোচহীন আমাকে আর খুঁজে পাই না তো!

এক বাক্স মোমরঙ – অনেক বড়বেলার অবশ্য! কার কাছে যেন শুনলাম মোমরঙ আর ইস্ত্রি দিয়ে কেমন করে কাপড়ে নকশা করা যায়, শুনেই দৌড়ে গিয়ে কিনে আনলাম – শেষমেশ আর হয় নি। একবার চেষ্টা করেই ব্যর্থ আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম।

ফুচকা এত মজার খাবার – আমাদের ইউনিভার্সিটিতে আসলে সে কথা মনে হবে না আপনার। আমার এখন মাঝে মাঝে জীবনের প্রথম ফুচকা খাওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। বোনের মুখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনে মহাউৎসাহে একবার ঐ বস্তু খেতে গেলাম। ফুচকার মালিক জিজ্ঞেস করলো – চটপটিসহ ফুচকা চাই কিনা আমার। ফোর কি ফাইভে পড়ি বোধহয় তখন, চটপটির ওপরে ফুচকা ভেঙে ছিটিয়ে দেয় সেটা জানি – জানালাম যে, না, শুধু ফুচকাই চাই। তারপরের ঘটনা আর না বলি? আট আনা দিয়ে আমি ফুচকার খোসাটা কিনে খেয়েছিলাম সেদিন – আমার প্রথম ‘অমৃত’-আস্বাদন।

বুদ্ধির ঢেঁকি নতুন নতুন হই নি – বুঝতেই পারছেন।

আমার নিজেকে এত বেশি বড় মনে হত সবসময় – এখনো হয়! বড় মানে মহান ভাববেন না আবার, বড় মানে হচ্ছে বুড়ো। সমবয়সীদের চাইতে। মনে হত ওদের কত আগে জন্মেছি আমি।

এই জন্যই মনে হয় নতুন কিছু ভাল লাগে না আমার। পুরনো জীবন কাটাতে ইচ্ছে করে; পুরনো গান ভাল লাগে; পুরনো বই ছুঁয়ে যায়। নতুন কেমন বিশ্রী লাগে, কেমন স্থূল লাগে আমার কাছে। আমরা কি দিনকে দিন স্থূল হয়ে যাচ্ছি – আমাদের রুচি? নাকি কেবল আমার কাছেই মনে হয়?

বহুদিন আগে ‘সেবা প্রকাশনী’র কাটছাঁট-করা বইতে সিডনি কারটনের প্রেমের গল্প পড়ে যেমন হাপুস নয়নে কেঁদেছিলাম, এই এত এত বড় হয়ে যখন আর আমাকে কাটছাঁট-করা বই পড়তে হয় না – তখনো আগের দশগুণ মোটা বইতে কোন এক মিঃ রচেস্টারের আশ্চর্য আবেগের কথা পড়ে চোখের পানি যখন দশগুণ তীব্র হয়ে ফিরে আসে, তখন সেই পুরনো আমার আর এই নতুন আমার মধ্যে কোথায় যেন মিল খুঁজে পাই। কত অন্যরকম মিল!

আগে শুধু মোহমুগ্ধ হতাম। তারপর অবধারিতভাবেই মোহভঙ্গ হত। এখন বড় (বুড়ো) হয়ে আবিষ্কার করলাম, সুতো যাতে কেটে না যায় তার জন্য উপায় হল মোহিত না হওয়া। তাহলে আর মোহ ভঙ্গও হবে না! আমি লক্ষী মেয়ের মত সেই নিয়ম মেনে চলি।

ছোটবেলায় একটা কথা এত বেশি মনে হত! আম্মু-খালামনিরা যখন বসে গল্প করতো, আর পরের দিন আমার পাহাড়-সমান হোমওয়ার্ক – তখন হিংসুটে চোখে তাকিয়ে মনে হত বড়রা কত আরামে থাকে, বড়দের কত মজা, আর যত অবিচার সব এই আমাদের প্রতি। হাসি পায় ভাবলে।

তবে একটা কথা ঠিক অবশ্য, সেই নিশ্চিন্ত নির্ভাবনার জীবনটা আর কখনো যদি শেষ না হত – তার কি কোন অর্থ থাকতো তেমন? নিষ্পাপ জীবন হত না হয়, কিন্তু লাভ-ক্ষতির দিকটা দেখতে গেলে অমনটা থাকা-না থাকায় সেরকম তফাত কি আছে আদৌ? বড়বেলার এই নষ্ট সময়, নষ্ট ভাবনা, নষ্ট জীবন – যেমনই হোক, একে অর্থ দেওয়াটা ইচ্ছের দূরত্ব মাত্র।

একবার কোন একভাবে একটা খাতার আগমন ঘটলো আমাদের বাসায়। খাতাটা অচেনা কোন এক ভাল ছাত্রের, আর নিঃসন্দেহেই সে ছিল ভাল আর্টিস্ট। পড়াশোনার খাতা সেটা – তাতে এত রঙ ছিল, এত মনন ছিল, কাউকে না দেখিয়ে কীভাবে বোঝাবো জানি না। মুগ্ধ ভক্তের মত এখনো যত্ন করে রাখা আছে ওটা বাসায়। খাতার প্রথম পাতায় একটা কলমে আঁকা ছবি ছিল। তার মাঝে একটা কবিতা ছিল। কবিতাটা আমার তখনকার মনে অনেক দাগ কেটেছিল, জানেন? মনে হয়েছিল এটা তো আমার কবিতা, আমার কথা বলছে!

“আমার মন ডানা মেলেছে

তোমাদের মনের অগম্য তীরের পানে;

মনোরথ চলে

ধুলো ওড়ে

ঝড় ওঠে,

তবু সে চলার নাই বিরাম।”

ঠিকই তো, বিরাম নেই। রূপকথার নদী এখনো বয়েই চলছে নিরন্তর।

রূপকথা জীবনে তবু রয়ে যায়…(১)

সামিরা সম্পর্কে

পীচ-গলা তরলে আটকে পা, দুঃস্বপ্ন অন্ধ দুই চোখে/ অসতর্ক হৃদয় পোষ মানে মিথ্যে বলার আফসোসে.../// প্রকাশিত লেখার কপিরাইট সংশ্লিষ্ট লেখক সংরক্ষণ করেন এবং লেখকের অনুমতি ছাড়া লেখা আংশিক বা পূর্ণভাবে কোন মিডিয়ায় পুন:প্রকাশ করা যাবে না।
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে স্মৃতিচারণ, হাবিজাবি-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , , , , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

25 Responses to রূপকথা জীবনে তবু রয়ে যায়…(২): ড্রয়ার ভর্তি গুপ্তধন!

  1. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    সময় বদলায়, ভাবনা বদলায়……স্মৃতি রয়ে যায়!

  2. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    “দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়”..
    আশ্চর্য অসহায়ত্ব প্লাস স্বাধীনতার গল্প। হাস্যকর কিন্তু সুগভীর যুক্তির গল্প। আপনার মতো প্রত্যেকের জীবনের কিছু অতি সাধারণ কিন্তু অতি আকাংখিত প্রাপ্তির গল্প।

    অদ্ভুত সখ ছিল কলমের ‘শিস’ জমানো। আর পেপার কাটিং, খেলোয়াড়দের।
    জীবনের প্রথম নিজের কিনে আইসক্রিম খাওয়া সেই ক্লাস ওয়ান। অর্ধেক খেতে খেতেই, স্টিক থেকে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল সেই দুই টাকার মালাই। কষ্টে বুকটা ফেটে গিয়েছিল। 😳

    পাড়ার মাঠে হাত ঘুরিয়ে মারা টেনিস বলে প্রথম চার। এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। 8)

    ক্লাস সেভেনে মামার লাইব্রেরী থেকে চুরি করা ‘শেষের কবিতা’ । মামা এর মলাটের ভেতরের পাতায় কার যেন চিঠি লুকিয়ে রেখেছিলেন এর আগে। :love: ভেবেছিলাম নিশ্চয় অতিব মজার (!!!) কোন বই হবে হয়তো। কিন্তু, পড়তে গিয়ে নিজের কাছে নিজে নাস্তানাবুদ হওয়া।(ভাষার কাঠিন্য তখনো রপ্ত হয়নি একটুও) :brokenheart:

    সুযোগ পেয়ে নিজের স্মৃতি ঝেড়ে দিলাম। :beshikhushi:

  3. মিজানুর রহমান পলাশ বলেছেনঃ

    আমার আবার উলটো- সব সময় নিজেকে অন্যদের চেয়ে কমবয়েসী মনে হয়। এর একটা কারন অবশ্য আছে- বলেছিলাম ও একদিন। তবে আমার পুরাতন জিনিস গুলো আসলেই টানে।
    অনেক দিন পর পুরাতন কোন বন্ধুর সাথে দেখা হলে যে আনন্দ পাই- সেটা অপার্থিব।
    লেখাটা ভাল লাগলো। যদিও বয়সের সাথে মিলছে না- আরেকটু বুড়া মানুষের লেখা এগুলো- আমার মনে হয়।

    • সামিরা বলেছেনঃ

      কমবয়েসী মনে হয় – কেন? আমি শুনি নি মনে হয় কারণটা।

      আমি তো বুড়া মানুষই – বলেছি না লেখায়? আমি নিজেই বয়সের সাথে মিলি না। 😛

  4. শামসীর বলেছেনঃ

    এই সকাল বেলা এখন ফুচকা কই পাবো 🙁

  5. শারমিন বলেছেনঃ

    আমার ছেলেবেলার বেশিরভাগ মজার স্মৃতি হচ্ছে স্কুল নিয়ে। ভীষণ দুষ্ট ছিলাম আমি।আর দাদা বাড়ির সেই পিকনিক,সবাই মিলে একসাথে নাটক করা আরও কত কিছু। :crying:
    আমি কিন্তু এখনও অনেক দুষ্ট 😛

  6. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    এই সিরিজটা আমার দারুণ প্রিয়!

    তবে প্রথম ২ প্যারার স্বাদ একটু বেশিই!

    এই রকম শব্দের পর শব্দের সিঁড়িতে… স্মৃতির অলিতে গলিতে হারিয়ে যাই!

  7. রাইয়্যান বলেছেনঃ

    “. . .তারপর একদিন হল কী, স্কুলের পাশের বইয়ের দোকানের ভাইয়ার কাছে গিয়ে বললাম, তার দোকানের সবগুলো প্যাড থেকে একটা করে পাতা চাই আমার।” কী কিউট!! :love:

    “আট আনা দিয়ে আমি ফুচকার খোসাটা কিনে খেয়েছিলাম সেদিন – আমার প্রথম ‘অমৃত’-আস্বাদন।” কন কী!!!! 😯 😯

  8. মাশুদুল হক বলেছেনঃ

    ছোটবেলার স্মৃতি কেন যেন আমার ধোঁয়াটে।
    সবুজ রঙের আইসক্রিম এর কথা মনে পড়ে, এত এত খেতাম যে ডেন্টিস্ট এর কাছে সেই ছোটবেলাতেই নিয়মিত যেতে হত, কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল-আইসক্রিম বন্ধ! কিন্তু স্কুল শেষ হবার পর কে আর মনে রাখে ওইসব।
    আমার খেলনা ছিল না, ব্যাট-বল এগুলাও বেশ পরে আমার অধিকার ভুক্ত হয়।
    রঙিন পাথর আর হাবিজাবি জিনিসের বিশাল কালেকশন ছিল।

    নিজের স্মৃতি কিভাবে যেন বের হয়ে গেল লেখাটা পড়তে পড়তে। আরো লিখেন, পড়ার পর যদি আরো কিছু স্মৃতি বেড়োয় তাহলে আমিও নাহয় একটা পোষ্ট ছেড়ে দেব 8) 😛

    • সামিরা বলেছেনঃ

      আমাদের সবার স্মৃতিতেই মনে হয় অদৃশ্য কোন যোগসূত্র আছে, একজনেরটা শুনে আরেকজনেরটা মনে পড়ে যায়। এই যেমন আপনারটা জেনে আমার কমলা রঙের ডিঙ্গা আইসক্রিমের কথা মনে পড়ে গেল! :babymonkey:
      ওহ্‌ আমারও হাবিজাবি অনেক কিছু ছিল। বলবো দেখি সামনে! 🙂

  9. ইঁদুর বলেছেনঃ

    স্মৃতিচারন লেখা পড়তে ভাল লাগে-নিজের স্মৃতি মনে পড়ে কিছু কিছু তবে লিখতে পারি না। চলুক সিরিজ।

  10. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    ভালোবাসা ভালোবাসা ভালোবাসা। :beshikhushi:

    মোমরঙ আর ইস্ত্রি দিয়ে কীভাবে করে রে? আমি জানতামই না এটা! আমাকে একটু বল তো। আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। 🙂

    সেই কার্টুন আঁকা প্যাডগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। আমার কাছেও এখনও আছে সেগুলো। কিছুই লিখি নি ওগুলোতে। লিখে পাতা নষ্ট করতে ইচ্ছেই হয় নি কোনোদিন!

    • সামিরা বলেছেনঃ

      :love:
      মোমরং দিয়ে একটা কাপড়ে ডিজাইন করে, তারপর আসলে যেই কাপড়ের যেই জায়গায় বসাতে চায় সেখানে ডিজাইন করা কাপড়টা উপুড় করে রেখে, তার ওপরে ইস্ত্রি করতে হয়। তাহলে পার্মানেন্টলি বসে যায়। মানে বসে যাওয়ার কথা আর কি, আমার বসে নাই। 😛

      • ফিনিক্স বলেছেনঃ

        এখন পর্যন্ত এইসব কাজের যেটুকু অভিজ্ঞতা আছে, তাতে মনে হচ্ছে এমন করে বসার তো কথা না!
        মোমরঙ তো পারমানেন্ট কোন রঙ না। 😳

বোহেমিয়ান শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।