ভাষাহীন কথকের যত কথা

**

ওর ডাকনাম সাঞ্জু। ফেসবুকে প্রোফাইলে নাম সানজানা লিমি। প্রথম যেদিন ওকে দেখেছিলাম নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠেছিলাম, “বিধি, ডাগর ও আঁখি যদি দিয়েছিলে হায়, সে কি আমারো ’পরে ভুলে পড়িবে না…” বেশ সাদাসিধা একটা মেয়ে। হালকা গড়নের ছোট্ট একটা দেহ; মুখের পানে তাকালে চোখদুটোই সবার আগে চোখে পড়ে। না জানি কত রহস্য, কত না বলা গল্প লুকিয়ে ঐ চোখে- প্রতিমুহূর্তের চাহনিতে, প্রতিটি পলক ফেলাতে। উৎসুক মনে অনায়াসে আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দিয়ে যায়- কিছু বুঝে ওঠার আগেই।

কোনো এক রোদ পড়ে আসা বিকেলে ওর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল। আসলে দেখা হয়েছিল না বলে দেখেছিলাম বলাই ভালো, কেননা আজো জানা হয় নি আদৌ সে আমাকে দেখেছে কিনা। আমি ও আমার বন্ধুরা তখন নিজেদের ‘ফ্রেশার’ জীবনের দিনগুলো পেরিয়ে সদ্যপ্রাপ্ত সিনিয়রিটিকে উপভোগ করছি। আর ক’দিন পরেই নতুন টার্ম শুরু হবে। নতুন ব্যাচের উৎসাহী বালক-বালিকারা মাঝে-মধ্যেই ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসে। আর আমরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করি বিগত বছরে খেয়ে আসা র‍্যাগগুলো উশুল করে। ওরা বেশ দলেবলে এসেছিল। কারো হাতে কেক, কারো হাতে গিটার; অনেকের হাতে গিফট-বক্স। আমার বন্ধুরা যথারীতি ছেলেগুলাকে ডেকে নিলো। শুধু আমার মন তখন আর র‍্যাগে নেই। সে যে তারও আগেই অচেনা অষ্টাদশীর ডাগর চোখে বাঁধা পড়ে গেছে।

গত তিন-চার বছরে অসংখ্যবার ওকে দেখেছি। ডিপার্টমেন্টের করিডোরে-সিঁড়িতে, ক্যাম্পাসে-ক্যাফেতে কিংবা লাইব্রেরীর উল্টোদিকের টেবিলটাতে। এখন আমি চোখ বুঝলেও তাই অনায়াসেই মনের ক্যানভাসে এঁকে ফেলতে পারি ও ডাগর চোখদুটো। বনলতা সেনের পাখির নীড়ের মত চোখের চেয়ে অসংখ্যবারের দেখা এই চোখগুলোই তাই আমার অনেক বেশী প্রিয়, অনেক বেশী কাম্য।

ওর সাথে কোনদিন কথা বলা হয় নি। কারো কাছে মুখ ফুটে জানতেও চাই নি ওর খবরতাই কিছুদিন আগে অব্দি ওর নামটাও জানা ছিল না। তারপর এইতো সেদিন, করিডোরে যাবার সময় ওর এক বান্ধরীর ডাকে যখন  ঘুরে তাকালো, জানলাম ওর নাম সাঞ্জু। তারও পরে, ফেস্টিভ্যালের গ্রুপে সদস্যের তালিকা খুঁজে খুঁজে বের করলাম সানজানা লিমিকে। নাহ, ওকে ফ্রেণ্ড-রিকোয়েস্ট পাঠাই নি, পাঠাবোও না হয়তো। যাকে হৃদয়েই ঠাঁই দিয়ে রেখেছি বহুদিন আগে থেকে, তাকে এই নব্য আধুনিকতার বন্ধুত্বে নাই বা বাঁধলাম।

“আচ্ছা, ও কি জানে না যে, শাড়িতে ওকে কতটা সুন্দর দেখায়? কি জানি, জানে না হয়তো। ওকে এত এত দেখেছি, কই, আমিও তো জানতাম না যে, শাড়িতে ও এতটা সুন্দর হয়ে উঠে; কপালের টিপ আর কাজলের ছোঁয়া ওর ডাগর নয়নকে এমনি করে পূর্ণতায় ভরে দেয়”  ওকে প্রথমবার শাড়িতে দেখার পর আমার প্রতিক্রিয়া অনেকটা এরকমই ছিল। অডিটরিয়ামের নীচতলায় আমার ঠিক সামনেই বসেছিল ও আর ওর বন্ধুরা। সবার মধ্যমণি হয়ে হাসিতে-গল্পে অন্ধকার অডিটরিয়ামেও যেন আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যাচ্ছিল। আর তাতে স্টেজের সাজানো নাটক ফেলে আমি বিমূঢ় দর্শক হয়েছিলাম কোনো এক বাস্তব নাট্যের।

**

কলম থেমে যায় ওর। ডায়েরীর পাতায় অনেকক্ষণ ধরে অপলক চেয়ে থাকে। একসময় চোখগুলো ভিজে আসে। কিন্তু ও মোছার চেষ্টা করে না। কান্নার ধারাটা ধীরে ধীরে গাল বেয়ে নামতে থাকে। ফোটায় ফোটায় পড়তে থাকে ডায়েরীটাতে। পাতাগুলো ভিজে যেতে থাকে। ওর এখন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। অনুভূতির যাতনাতে যদি অনুভব ধুয়ে যায়, তো যাক না…

রিমন ছেলেটা ভীষণ অদ্ভূত আর প্রচণ্ড অভিমানী। একই সাথে অনেক মেধাবীও। ছোটবেলাতে থেকেই অনেক বেশী আদর পেয়ে পেয়ে বড় হয়েছে। মা-বাবার কাছে কখনো কিছু চাইতে হয়নি ওর। সবসময় চাওয়ার আগেই পেয়ে গেছে। এরকম ছেলেমেয়েদের অনেকসময়ই বখে যেতে দেখা গেলেও ও ছিল উল্টো। স্কুল-কলেজ সব জায়গাতেই ভালো রেজাল্ট করেছে। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্সও পেয়েছে। আর এখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে, কদিন পরেই পাশ করে বেরোবে।

ওর শুধু একটাই সমস্যা ছিলো। ও কখনো কিছু চাইতে শেখে নি। কারণ, হয় ও কোনো জিনিস চাওয়ার আগেই পেয়ে গেছে, নয়তো পাওয়ার মত অনেক জিনিসের প্রয়োজনীয়তাই ও কোনোদিন অনুভব করে নি।

সাঞ্জুকে ও প্রথম দেখেছিলো সেকেণ্ডইয়ারের ক্লাস শুরুর ক’দিন আগে। তারপর অনেকবার দেখলেও কখনো মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে নি। ভালো লাগাটাকে সবসময় নিজের ভেতরেই চেপে রেখেছে, ভাষায় প্রকাশ করতে পারে নি। বন্ধু কিংবা অন্য কারো কাছেও কোনোদিন শেয়ার পর্যন্ত করেনি। শুধু নিজের ভেতর ছটফট করেছে আর ডায়েরীর পাতা ভরিয়েছে। কিছু কিছু অনুভূতি, ভালোবাসা-ভালোলাগা মনে হয় শুধু গুমড়ে মরার জন্যেই…

**

পু্রানো আমলের দেয়াল ঘড়িটাতে রাত বারোটার ঘন্টা বেজে উঠে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েও আবার বসে পড়ে। ডায়েরীর পৃষ্ঠাগুলোতে আবারো ফিরে তাকায়। তারপর ডিজাইন প্যাড’টা টেনে নিয়ে লিখতে থাকে, “বিধি, ডাগর ও আঁখি যদি দিয়েছিলে হায়, সেকি আমারো ’পরে ভুলে পড়িবে না…”

**

আজ খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে ও। অনেকদিন পর বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। তারপর এসেই ভার্সিটি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নেয়। যদিও ভার্সিটির বাস ধরার তাড়া নেই ওর। তবু সকালের নাস্তা সেরে একটু হনদন্ত হয়েই বেরিয়ে পড়ে। আজ ওদের শেষ ক্লাস।

**

সারাটা দিন অনেক ব্যস্ততায় কাটে ওর। দুপুর গড়ানো ক্লাস-পার্টিতে বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি, কৌতুক, মাস্তি আর মাঝেমাঝে বিদায়বেলার মনখারাপ করা আবহ। আজ কোনো ল্যাব ছিলো না। তবু বাড়ি না গিয়ে ক্যাফেতেই বন্ধুদের সাথে দুপুরের খাবার সারে। অনেকদিন পর রোদ পরে আসা একটা বিকেলে ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দেয়া। র‍্যাগকর্ণারের দোতলা থেকে ওর চোখ চলে যায়। কয়েকটা মেয়ে হেঁটে আসছে। পা চালিয়ে তাদের কাছে এগিয়ে যায় ও। (চলবে)

বাংলামায়ের ছেলে সম্পর্কে

বাইশবছরের তরুণযুবা, যে স্বপ্ন দেখে আকাশছোঁয়ার, পথ চলে অফুরান আত্মবিশ্বাসে। ভীষণ ভালোবাসে এই দেশটাকে, চেষ্টা করে রাজনীতি সচেতন থাকার। ভালাবাসে লেখালেখি করতে। কখনো কখনো মুখভর্তি দাঁড়ি-গোঁফে হেঁটে ফিরে চাঁদনী রাতে কিংবা ভরদুপুরে, পিচঢালা রাস্তায় কিংবা গেঁয়ো মেঠোপথে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পাশাপাশি জড়িত আছে বেশকিছু দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাথে। এইতো---
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প, সাহিত্য-এ এবং ট্যাগ হয়েছে স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

11 Responses to ভাষাহীন কথকের যত কথা

  1. অনাবিল বলেছেনঃ

    গল্পের শেষটা কেমন হবে জানি না…… কিছু মনে করবেন না, একটা কথা বলি– কোন একজন কে শুধু মাত্র দেখে কিভাবে ভালো লাগা সম্ভব এটা আমার মাথাতে কিছুতেই আসে না। এসব নিয়ে গল্প-নাটক-কবিতা খুব ই অদ্ভুত লাগে।

    একটা মানুষ বাহ্যিকভাবে দেখতে প্রচলিত অর্থে সুন্দর হতে পারে, কিন্তু তাকে না জানলে সে ভালো মানুষ কি না এটা কিভাবে বুঝা যাবে?? দেখতে সুন্দর না হয় একদিন দুইদিন ভালো, কিন্তু মানুষ ভালো না হলে কি কাউকে সত্যি ভালো লাগবে কখনো???

    • স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

      এটা নিয়ে একটা কথা বলি।

      ছেলেদের ভালোলাগায় বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের প্রতি একটা আকর্ষনের ব্যাপারটার গুরুত্ব অনেক সময় অনেক প্রাধান্য পায়।
      বিবর্তনের ধারাতেই মনে হয় এমন হয়েছে। :thinking:

      • বাংলামায়ের ছেলে বলেছেনঃ

        @অনাবিল

        কথায় আছে, মেয়েদের মন নাকি স্বয়ং বিধাতাও বুঝতে পারেন না। তাই মন বুঝে পছন্দ করতে গেলে মনে হয় না এ জগতে কারো কখনো প্রেম হতো।

        আর একটা মানুষ যখন আরেকটা মানুষকে দেখে তখন শুধু চেহারাটাই দেখতে পায়। আচার-ব্যবহার, ধ্যান-ধারণার ব্যাপারটা চেনা-জানা’র সাথে ধীরে ধীরে হয়। আর তাই ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশন’ ব্যাপারটা মূলত বাহ্যিক সৌন্দর্যকেন্দ্রিকই।

        আর বিবর্তন সংক্রান্ত ব্যাপারটা তো স্বপ্ন বিলাস ভাই বলেছেনই…

  2. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    ভালো লাগছে।

    পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম। 🙂

  3. জ্ঞানচোর বলেছেনঃ

    ভাল লাগলো। তবে গল্পের গভীরে যাবার আগেই ছেলে মানুষের এই রকম কান্নাকাটি কেমন জানি কেমন জানি মনে হচ্ছে।

    আচ্ছা, বেশী টেনশন না করে পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকি।

  4. সামিরা বলেছেনঃ

    “বিধি, ডাগর ও আঁখি যদি দিয়েছিলে হায়, সেকি আমারো ’পরে ভুলে পড়িবে না…” – সুন্দর সুন্দর!

    • বাংলামায়ের ছেলে বলেছেনঃ

      ধন্যবাদ, সামিরা।

      আসলেই সুন্দর সুন্দর………

      গল্পটা কল্প-বাস্তব হলেও চোখগুলো পুরাই বাস্তব………………

  5. shumon বলেছেনঃ

    সুন্দর অনুভূতি …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।