ঈদে/উৎসবে শিশুকে কোন প্রশ্নটা করবেন না?

২০১০ সন থেকে আমার এই লেখাটা প্রতি বছর দুবার (প্রতি ঈদে) শেয়ার দিয়ে থাকি। খুব বড় লেখা নয়। অল্প সময় লাগবে পড়তে।


বড় হয়ে গেছি। আর তাই ঈদ আর আগের মতো লাগেনা। কিন্তু যখন ছোট ছোট শিশুদের ঈদের আনন্দে মাতামাতি করতে দেখি মনটা জুড়ায় যায়। কি সুন্দর পোশাক, সুন্দর সাজু গুজু, নতুন জুতা, ফিতা, আবার চোখে রংএর চশমা, নানা সাজে সাজে শিশুরা। কিন্তু এই সুন্দর মনের শিশুকে আমরা বড়রা নষ্ট করি। ঈদে/উৎসবে বা ঈদের আগেই আমরা সবাই শিশুদেরকে একটা common প্রশ্ন করি। আমার মতে সেটা একদমই করা উচিত নয়।

‘সুনাতা, এবার ঈদে তুমি কয় সেট জামা কিনেছো?’
‘সুনাতা, কে কে তোমাকে কয়টা করে জামা দিয়েছে?’
‘সুনাতা, তুমি কি শুধু জামা-ই কিনেছো? জুতা কিননি?’
ইত্যাদি ইত্যাদি…

আমার এই ধরনের লেখায় অনেকেই আমাকে আঁতেল বলবেন হয়তো, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি কোন শিশুকে এই ধরনের প্রশ্ন করি না, করাটা পছন্দও করি না। আমার মনে হয়, এই ধরনের প্রশ্ন (আমি ঈদকে কেন্দ্র করে বললেও আসলে বিভিন্ন সময়েই আমারা এই ধরনের কথা বলি) একটা শিশুকে ভোগ্য করে তোলে। তাকে এই শিক্ষা দেয় যে তার অনেক সেট জামা পাবার উচিত ছিলো। আর তাই বড় হবার সাথে সাথে যেন এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে সেই প্রস্তুতি মনে মনে শিশুটি পালন করতে থাকে। আর তাই শিশু হতে যখন কিশোর-কিশোরী হয়, তখন মা-বাবাকে চাপ দেয় অধিক সেট ঈদ পোশাকের জন্য। ‘নানু কি দিয়েছে? দাদু কি দিয়েছে? মামা-খালা কি দিয়েছে? চাচা-চাচী কি দিয়েছে? মা-বাবা কি দিয়েছে?’ এই ধরনের প্রশ্ন করে একটা শিশুকে বুঝিয়ে দেই যে ওদের সবার কাছ থেকেই কিছু একটা পাওয়া ওর অবশ্যই উচিত ছিলো। আর এই ধরনের প্রতিযোগিতায় যখন একটা শিশু বড় হতে থাকে তখন যে মা-বাবারা পারেনা তার সন্তানকে সন্তুষ্ট করতে, তারা অনেক কষ্ট পায়। আশা করি পাঠক বুঝতে পেরেছেন আমার কথা।

আমি শুধু সমস্যা নিয়ে কথা বলা পছন্দ করিনা। সাথে বলতে চাই সমাধান কি হতে পারে। আমি অনেকটা এইভাবে একটা শিশুর সাথে কথা বলে থাকি:
আমি: সুনাতা, তোমাকে এই পোষাকে খুবি সুন্দর লাগছে! এটা কি তোমার পছন্দের dress?
সুনাতা: হা, আমার পছন্দের!
আমি: (তার কয়টা পোশাক সেদিকে না গিয়ে) তো, তুমি ঈদে কেমন করে মজা করলে?
সুনাতা: অনেক কিছু খেয়েছি। খালা-মনির বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। খালা-মনি আমাকে একটা পিংকুশ জামা দিয়েছেন।
আমি: (খালা-মনি দিয়েছে সেটা অবশ্যই ভালো কথা কিন্তু আমি জানতে চাইনা আর কে কে কি দিয়েছে। শুধু ‘তাই’ বলে ঐ বিষয়টা শেষ করি) তাই।
আমি আবার বলি: কি কি খেলা করেছো?
(এভাবে চলতে পারে কথাবার্তা)

যদি কোনভাবে এমনি-এমনি সুনাতা বলেই দেয় যে, সে ৫ সেট জামা পেয়েছে তবে simply সেটাকে ignore করি। এভাবে প্রকাশ করিনা, “ও! তাই! পাঁ—চ সে—ট! তো কে কে কি দিলো সুনাতা?” বরং আমি ওর সাথে একটু অন্যভাবে কথা বলে প্রসঙ্গ পাল্টাই। যেমন:
সুনাতা: আমি ৫ সেট ড্রেস পেয়েছি!
আমি: আমি ছোট বেলায় ঈদে কি করতাম জানো?
সুনাতা: কি করতেন?
আমি: অনেকের সাথে দেখা করতে যেতাম, বন্ধুদের সাথে খেলা করতাম, আর যখন বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে যেতাম সেমাই খেতাম, এভাবে খুব্বি মজা করতাম।
সুনাতা: আপনি নতুন নতুন জামা পরতেন না।
আমি: পরতাম, তবে বন্ধুদের সাথে খেলা করেই আমরা বেশি মজা পেতাম। (এই কথাটা বলেও আমি আবারো পোশাকের উপর বা এর পরিমাণের উপর গুরুত্ব দেই না)

পরিশেষে বলি, আমি জানি আমরা সবাই আমাদের সন্তানকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আর তাই সকল শ্রেণীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা সম্পন্ন মা-বাবারাই তার সন্তানকে উৎসবে অবশ্যই উপহার দেয়। সেটা ঠিকও আছে। সন্তানকে দিয়ে আসলে আমরাই খুশি হই, আনন্দ পাই। কিন্তু আমি মনে করি একটা শিশুকে শুধুই ‘কয় সেট জামা পেয়েছো?’ এই ধরনের প্রশ্ন করে তাকে ভোগবাদী করে তোলার সুড়সুড়ি দেয়া অনেক বড় অন্যায়। প্রতিটি শিশুই সুন্দর, আসুন তাদেরকে সুন্দরই থাকতে দেই। আমাদের আচরণ বা শুধুই একটা কথার দ্বারা তাকে নষ্ট না করি।

সর্ব শেষ কথা। যদি কোনভাবে বুঝেই যান যে ঐ শিশুটির পোশাক নতুন নয় ভুলেও তার পোশাক নিয়ে বেশি কথা বলবেন না। ‘তোমার ড্রেসটা-তো নতুন মনে হচ্ছেনা’ – এই ধরনের প্রশ্ন-তো করবেনই না বরং তখনও বলুন যে তাকে সুন্দর লাগছে। 🙂

সোর্স: http://wp.me/p1aEoY-15


যদি এই লেখার বক্তব্য ভালো লেগে থাকে এবং যদি প্যারেন্টিং বিষয়ে আরো আলোচনা করতে চান তবে Facebook Group-এ যোগ দিন। এই গ্রুপে আমরা প্রধানত বাংলায় আমাদের সন্তানদের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকি।


আর যদি হাতে একটু সময় থাকে ২-৪-৫-১০ মিনিটের কিছু ছোট ছোট video clip দেখবার তবে অবসরে চা/কফি খেতে খেতে আমার YouTube Channel-টি ভিজিট করতে পারেন। আমার বিশ্বাস এই Channel টির অধিকাংশ video clip আপনার পছন্দ হবে।

এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে চিন্তাভাবনা, সচেতনতা-এ এবং ট্যাগ হয়েছে , স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

11 Responses to ঈদে/উৎসবে শিশুকে কোন প্রশ্নটা করবেন না?

  1. ফিনিক্স বলেছেনঃ

    অসাধারণ পোস্ট ভাইয়া।
    শিশুদের সাথে এইরকম ব্যবহার আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আরও সহনশীল আর প্রজ্ঞাময় করে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। 🙂

    আপনার এই ধরণের কাজগুলো খুব প্রশংসনীয়।
    এইরকম ভালো কাজে সবসময় সাথে আছি ভাইয়া। 🙂

  2. বোহেমিয়ান বলেছেনঃ

    দুর্দান্ত! আসলেই! এইভাবে ভাবি নাই। যদিও ভাবা উচিৎ ছিল

  3. বৈরাগী বলেছেনঃ

    চমৎকার পোস্ট 🙂
    আমাদের সকলের উচিৎ এই বার্তা সকলের কাছে পৌছিয়ে দেয়া 🙂
    চোখ খুলে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ 🙂

  4. নিলয় বলেছেনঃ

    চমৎকার পোস্ট- এইভাবে আমাদের ভুলগুলো কেউ ধরিয়ে দিলে খুব ভালো লাগে।

    • সামিরা বলেছেনঃ

      “এইভাবে আমাদের ভুলগুলো কেউ ধরিয়ে দিলে খুব ভালো লাগে।” – আমারও! 🙂 অনেক ভাল একটা লেখা শিবলী ভাইয়া।

  5. স্বপ্ন বিলাস বলেছেনঃ

    বেশ ভালো কিছু কথা বলেছেন। নিশ্চয়ই মনে রাখার চেষ্টা করবো এই কথাগুলো……

  6. অল্প কথায় কী অসাধারণ করে সত্যিটা তুলে ধরলেন, আসলেই এভাবে ভাবি নি কখনো ভাইয়া, একটু ভেবে কথা বললেই কিন্তু হয়ে যায়, চেষ্টা করবো, পণ্যের প্রতি এই অযাচিত টানটা যেন আশেপাশের শিশুর মধ্যেই আমি না ঢোকাই……

  7. তুহিন বলেছেনঃ

    খুবই ভালো একটা পোস্ট।আর ভাই আপনাকে আতেল বলবে কেন,ভালো একটা বিষয় নিয়ে লেখছেন,সবার কাছ থেকে প্রশংসা পাবেন,এটাই স্বাভাবিক।আর যারা বলবে তারা সারাজীবন ভোগবাদী ই থাকবে।চালিয়ে জান……

  8. শিবলী বলেছেনঃ

    সকলকে আলাদা করে রেসপন্স করলাম না। সকলকে ধন্যবাদ। আসলেই আমরা যদি একটু সচেতন হই তবে শুধু এই বিষয়টিই নয় বরং আরো নানা বিষয়ে অনেক কিছু অর্জন করতে পারবো আমরা। 🙂

  9. অনাবিল বলেছেনঃ

    অসাধারণ একটা লিখা।
    ইনশাল্লাহ, এভাবেই অভ্যাস করবো আর সবাইকে উৎসাহিত করবো……

  10. শুকপাখি বলেছেনঃ

    দারুণ লেগেছে ভাইয়া

সামিরা শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।