সেই বাড়িটা

কোন এক সময়ে, অনেক দূরের একটি ছোট্ট শহরে ছিল কয়েক ঘর লোকের বাস । তারা থাকতো খুব সুন্দর সুন্দর দোতলা বাড়িতে । এতই সুন্দর লাগতো বাড়িগুলোকে যে দূর দূরান্তের শহর থেকে মানুষ আসতো তাদেরকে দেখতে । তাদের মাঝে শহরের এক কোণায় ছোট একটা একতলা বাড়ি ছিল । সেই বাড়িতে থাকতো অনেক লক্ষ্মী একটা মেয়ে । সে রোজ সকালে কাজে চলে যেত, আর ফিরতো একদম রাতে ।

সেই বাড়িটার আশে পাশে আরো কয়েকটা বাড়ি ছিল । বাড়িগুলোর নিজেদের মাঝে আবার তাদের সৌন্দর্য্য নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা ছিল । তো, ছোট নতুন বাড়িটাকে অন্য বাড়িগুলো আবার খুউব হিংসে করত । এটা নিয়ে তারা নিজেদের ভেতরে মাঝে মাঝেই বেশ আলোচনা, সমালোচনা করত।

–“দেখ, দেখ, ওর বারান্দার সামনের লনটা দেখ, কেমন বিবর্ণ হয়ে থাকে, অথচ মালি নিয়মিতই যত্ম নেয় বলে মনে হয় ।”

–“আরে, ব্যাপারটা হয়ত একারণে ঘটে যে,  শহরের যত ভবঘুরেগুলো আছে, তারা যে ওর বারান্দায় বসে বিশ্রাম নেয়, সেই কারণে ।”

–“হুম, তা না হয় বুঝলাম । মেয়েটার মনে তো আবার বড্ড মায়া । কিন্তু যাই হোক, ওর লনটা কিন্তু আমাদেরগুলোর মত একদম সুন্দর না ।  আর মায়ায় কী হয়, যদি সৌন্দর্য্যই না থাকে ?”

–“ঠিক, ঠিক । একদম ঠিক ।”

–“কিন্তু দেখ না, ওর বাগানের গাছের ফুলগুলো ফুটতে না ফুটতেই কেমন উধাও হয়ে যায় ।”

–“আরে, ব্যাপারটা হয়ত একারণে ঘটে যে, শহরের যত বাচ্চাগুলো আছে, সবাই ওর বাগানে খেলতে যায়, আর ফুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে যায় তখন, সেই কারণে ।”

–“হুম, তা না হয় বুঝলাম । মেয়েটার মনে তো আবার বড্ড মায়া । কিন্তু যাই হোক, ওর বাগানটা কিন্তু আমাদেরগুলোর মত একদম সুন্দর না । আর মায়ায় কী হয়, যদি সৌন্দর্য্যই না থাকে ?”

–“ঠিক, ঠিক । একদম ঠিক ।”

–“কিন্তু জানিস, শুনেছি ওর ঘরগুলোতে নাকি অনেক অনেক ধূলোবালি জমে থাকে, প্রায়ই ।”

–“আরে, ব্যাপারটা হয়ত একারণে ঘটে যে, মেয়েটা ওর জানালাগুলোকে খুলে রাখে সবসময় । রোজ বাগানের গাছগুলোর সাথে আর গাছের পাখিগুলোর সাথে ওর কথা না বললেই নয়, সেই কারণে ।”

–“হুম, তা না হয় বুঝলাম । মেয়েটার মনে তো আবার গাছ আর পাখিদের জন্য বড্ড ভালবাসা । । কিন্তু যাই হোক, ওর ঘরগুলো কিন্তু আমাদের  গুলোর মত একদম পরিস্কার না । আর ভালবাসায় কী হয়, যদি সৌন্দর্য্যই না থাকে ?”

–“ঠিক, ঠিক । একদম ঠিক ।”

এভাবেই চলত দিন । রোজ রোজ অন্য বাড়িগুলো ছোট্ট সুন্দর বাড়িটার দোষ খুঁজে বের করত এভাবে । আর নিজেদের সৌন্দর্য্য নিয়ে নিজেদের মাঝেই ভীষণ অহংকার করতে থাকতো । ছোট বাড়িটা আবার সবই শুনতে পেত । কিন্তু সে একটুও কষ্ট পেতনা । কারণ সে জানতো, মনের সৌন্দর্য্যই হল আসল সৌন্দর্য্য । আর তার মনের সৌন্দর্য্যই তো মেয়েটার মনে এত মায়ার উৎস, তাইনা ? আর বড় বাড়িগুলোর মনের অহংকারই কিনা ওদের বাড়ির লোকগুলোর মনেও প্রতিফলিত হয় । তাইত ওদের মনে মেয়েটার মত একটুও মায়া নেই । অনেক অহংকারী আর লোভী ওরা । এভাবেই ওরা নিজেরা ওদের মালিকদের মনকে প্রভাবিত করতে পারতো । তবে, এই ব্যাপারটা শুধু ছোট বাড়িটাই বুঝতে পারতো । অন্যরা পারতোনা ।

একদিন হলো কি, দূরের এক বড় শহর থেকে এক ধনী লোক এল ওদের শহরটাকে দেখতে । তার জায়গাটা খুব পছন্দ হয়ে গেল । সে নাকি এখানে এক বিশাল কারখানা খুলবে । সেই কারণে শহরের সবগুলো বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে । তো, এই খবর ছড়িয়ে গেল পুরো শহরে । শহরের সবগুলো বাড়ির মালিকেরা এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে লাগল । তবে কেউই কিন্তু দুঃখ পেলনা । ওদের এতদিনের পুরনো বাড়িগুলো ছেড়ে চলে যাবে এটা ভাবতে ওদের একটুও খারাপ লাগছিল না । বরং তারা সবাই ভাবছিল বাড়িগুলোকে বিক্রি করে তারা কে কার চেয়ে বেশী লাভ করতে পারবে, আর বড় শহরে গিয়ে কত সুন্দর বাড়ি কিনতে পারবে । কিন্তু সেই ছোট বাড়িটার মেয়েটার কথা তো আলাদা । ও কিন্তু খুবই কষ্ট পাচ্ছিল মনে মনে । এতদিনের বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে, এটা ভাবতেই কান্না পাচ্ছিল ওর ।

বাড়িগুলোর কথা আর কী বলব ! তাদের অহংকারের দিন শেষ হয়ে এল বলে ! তারা তখন সারাদিন একদম মনমরা হয়ে থাকতো, আর নিজেদের মাঝে স্মৃতিচারণ করতে থাকতো । ছোট বাড়িটার কথা কারও মনেই পড়ত না । ছোট বাড়িটার কিন্তু ঠিকই ওদের কথা মনে হত । খুব কথা বলতে ইচ্ছে হত ওদের সাথে । কিন্তু কী আর করা ! ওর সাথে তো আর কেউ কথা বলেনা । তাই ও একা একাই স্মৃতিচারণ করতো ।

একদিন সেই ধনী লোকটা এল ছোট বাড়িটার মালিকের সাথে বাড়ি কেনার ব্যাপারে কথা বলতে । সেখান থেকে ছোট বাড়িটা জানতে পারল, তাকে নাকি ভাঙ্গা হবেনা । কারণ সে তো শহরের একদম কোনার একটা ছোট্ট বাড়ি । সেই বাড়িটাতে থাকবে লোকটা মাঝে মাঝে । একথা জানার পর থেকে ছোট বাড়িটার মনের খুশি আর ধরেই না ! সে যখন খুব খুশি হয়ে এই কথাটা অন্য বাড়িগুলোকে বলতে লাগল, তখন হঠাৎ বুঝতে পারল যে, কথাটা শুনে অন্য বাড়িগুলো তো খুশি হলই না, বরং তাদের মন আরো খারাপ হয়ে গেল । এটা দেখে ছোট বাড়িটার মনটাও খারাপ হয়ে গেল । তাকে একদম একা একা থাকতে হবে, এটাও সে আগে ভেবে দেখেনি ।

তাই সে মনে মনে বুদ্ধি করতে লাগলো । যদিও বাড়িগুলো বিক্রি হয়ে গেছে, তারপরেও ওদেরকে ভাঙ্গা তো এখনো শুরু হয়নি । কীভাবে বাড়িগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়া যায় । বাড়িটা কিন্তু জানতো যে, সে চাইলেই বাড়ির মানুষের মনকে প্রভাবিত করতে পারে । তাই একদিন যখন আবার সেই ধনী লোকটা মেয়েটার সাথে কথা বলতে এল, তখন সে লোকটাকে এমনভাবে প্রভাবিত করে ফেললো, যে লোকটারও তখন বাড়িগুলোর জন্য অনেক মায়া লাগতে লাগলো । সে তখন ভেবে দেখলো, এই সুন্দর বাড়িগুলোকে না ভেঙে তারচেয়ে শহরের পাশেই অন্য একটা খোলা জায়গায় কারখানাটা করা যাক । আর বাড়িগুলো থাকলে বরং তার সুবিধাই হবে । কারখানার শ্রমিকদের জন্য আলাদা করে বাড়ি বানাতে হবে না ।

যেই ভাবা সেই কাজ । বাড়ি ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেল । এই নতুন খবর পাওয়া মাত্র ছোট বাড়িটা মনের আনন্দে সবাইকে চিৎকার করে জানিয়ে দিল । তার একদম মনেই থাকলো না যে, অন্য বাড়িগুলো তাকে সারাদিন কীভাবে কষ্ট দিত । তবে কিনা একটা অদ্ভূত ব্যাপার হল । ছোট বাড়িটার কাছ থেকে খবরটা পাওয়ার পর বড় বাড়িগুলো মনের আনন্দে আর খুশিতে অহংকার করতে একদম ভুলে গেল । তারা তখন সত্যি সত্যি অনেক ভাল হয়ে গেল ।

তারপর এভাবে অনেক দিন চলে গেল । বাড়িগুলো এখন আর আগের মত অহংকার করেনা । তারাও মনের সৌন্দর্যের কথাই তখন বেশী ভাবে । আর ছোট বাড়িটার সাথে তাদের বেশ ভাব হয়ে গেল । যদিও তারা তখনো জানতোনা যে, এই ঘটনার পেছনে পুরো অবদানই আসলে ছোট বাড়িটার ! কিন্তু তাতে কী বা আসে যায় ?

অবশ্য তারা আগের মত অহংকার করার কিছু পেতনা চাইলেও । কারণ তাদের মনের মায়া থেকে তাদের মালিকেরাও তো প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিল । আর তাই তাদের বাগানের ফুলগুলোও প্রায়ই উধাও হয়ে যেত, আর লনগুলোও নষ্ট হয়ে যেত, আর ঘরগুলোও ধূলোবালিতে একদম ভরে থাকতো । প্রায়ই ।

মুনীরা মারদিয়া সম্পর্কে

একজন ঘুমকুমারী ।
এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে গল্প-এ। স্থায়ী লিংক বুকমার্ক করুন।

10 Responses to সেই বাড়িটা

  1. সিরফল বলেছেনঃ

    মনে হচ্ছিল আমি অনেক ছোট্ট, আর কেউ অনে—-ক মজা করে গল্প শুনাচ্ছে।
    “………আর তাই তাদের বাগানের ফুলগুলোও প্রায়ই উধাও হয়ে যেত, আর লনগুলোও নষ্ট হয়ে যেত, আর ঘরগুলোও ধূলোবালিতে একদম ভরে থাকতো । প্রায়ই । ” শেষ টায় মন ভরে গেল। : )

    • সুবর্ণরেখা বলেছেনঃ

      “মনে হচ্ছিল আমি অনেক ছোট্ট, আর কেউ অনে—-ক মজা করে গল্প শুনাচ্ছে।”
      আসলে আমি যখন গল্পটা লিখি, তখন এটা চিন্তা করেই লিখেছিলাম । আমার বাচ্চাদেরকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প শুনাতে খুউব ভালো লাগে যদিও এই গল্পটা বাচ্চারা পড়বেনা । :p
      আপনার গল্পটা ভালো লেগেছে জেনে খুব খুশি লাগছে ।
      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ । 🙂

  2. বৈরাগী বলেছেনঃ

    ভালো লেগেছে। 🙂
    :welcome:
    বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না-” এক বুড়ি আরেক বুড়ির নানীশাশুড়ি।” আমার অবস্থা ঐরকম। 😛 নিজে সরবে নতুন আবার আরেক জনকে স্বাগতম জানাই…… :dhisya:

    • সুবর্ণরেখা বলেছেনঃ

      অনেক ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য । 🙂

      বাংলা প্রবাদ যদি থাকতেই পারে এই বিষয়ে তাহলে তো স্বাগতম ও জানানো যেতে পারে নতুন হলেও, তাইনা ? 😛

      আপনাকেও স্বাগতম, যেহেতু আপনিও নতুন ! 😀

  3. শারমিন বলেছেনঃ

    :welcome:
    ভালো লেগেছে 🙂

  4. সামিরা বলেছেনঃ

    আরে ভাল লিখছিস তো! 😀 এইটা দারুণ একটা ছোটদের গল্প হইছে।

    পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল কোন অনুবাদ পড়তেছি। 😛 আর গল্পের মধ্যে ইমো না দেওয়াই ভাল মনে হয়।

    :welcome:
    😀 😀

    • সুবর্ণরেখা বলেছেনঃ

      তাই ? হুম, কিন্তু একজন ছোট মানুষ গল্পটা পড়ে বলছে, তার নাকি কথা বলা বাড়ির গল্প ভালো লাগেনা । 😛

      যাই হোক, তোর চিন্তাশীল মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ । 😛 😀

  5. চমৎকার লেগেছে আপু!! ছোট মানুষের জন্য নাকি?? আমি তো মনে হয় বড়ো! তাও ভীষণ ভালো লাগলো!!!
    :welcome:

    আর নিয়মিত লেখা পড়ার প্রত্যাশায়! :happy:

  6. সামিরা বলেছেনঃ

    ঐ আর লিখিস না ক্যান!

সুবর্ণরেখা শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।